দুর্নীতিবাজদেরও এমপি হওয়ার খায়েস: এ কোন রাজনৈতিক সংস্কৃতি?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

বাংলাদেশের রাজনীতির অবস্থা আজ এমন এক সঙ্কটপথে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সবচেয়ে বড় বিতর্ক আর নীতি-আদর্শের নয়—বরং যোগ্যতা, চরিত্র এবং নৈতিকতার প্রশ্নে।

সময়ের সাথে সাথে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন এক অস্বাভাবিক ট্রেন্ড দৃশ্যমান হয়েছে যা শুধু উদ্বেগজনকই নয়, ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ পরিণতির ইঙ্গিতবাহী।

রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে সেই শ্রেণি—অশিক্ষিত, অদক্ষ, বেকার, আধাপড়া এবং সামাজিকভাবে অযোগ্য মানুষ—যারা রাজনীতিকে দেখছে তাদের জীবনে দ্রুত সফলতা, প্রভাব, অর্থ এবং পরিচিতি পাওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ হিসেবে।

একসময় রাজনীতি ছিল ত্যাগের স্থান—আদর্শ, সংগ্রাম, নৈতিকতা, সাহস ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার ক্ষেত্র। কিন্তু আজ রাজনীতি হয়ে গেছে অনেকের চোখে ‘চাকরি’, ‘ইনকামের জায়গা’, ‘ক্ষমতার শর্টকাট’ এবং ‘ব্যক্তিগত স্বার্থের কারখানা’।
ফলে প্রশ্ন ওঠে—এরা এমপি হতে চায় কেন? জনগণের সেবা করতে, নাকি নিজেদের ভাগ্য গড়তে?

আমাদের দেশে ব্যবসা করতে পুঁজি লাগে, চাকরি পেতে লাগে ডিগ্রি, কর্মজীবনে এগোতে লাগে দক্ষতা। কিন্তু রাজনীতিতে প্রবেশের জন্য কোনো বাধ্যতামূলক যোগ্যতা নেই।

দলে কারো সাথে সম্পর্ক থাকলেই নেতা হওয়া যায়, স্লোগান দিলেই নেতা, পোস্টার লাগালেই নেতা, তেলবাজি করলেই নেতা, নীতি ভ্রষ্ট মহিলা হলে তো রাতারাতি বড় পদধারী নেতা আর দুই-চারজন অনুসারী থাকলেই এলাকায় ‘স্যার’ সম্বোধন পাওয়া যায়। এ যেন যোগ্যতার সর্বনিম্ন মাপকাঠির এক বিশ্ববিদ্যালয়।

সমাজে যাদের কোনো পরিচয় নেই, যাদের কথা শুনে না পরিবার বা সমাজ—তারাই রাজনীতিতে এসে অস্বাভাবিক ক্ষমতা পেয়ে যায়।

আজ রাজনীতিতে ঢুকলেই সহজ পরিচিতি, সহজ সম্মান, সহজ সুযোগ আসে—এবং এই ‘সহজে পাওয়ার সংস্কৃতি’ই টেনে আনছে অসংখ্য অযোগ্য মানুষকে।

আজ রাজনীতি যে শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানোর পথ, তা নয়—এটি অনেকের কাছে আয়-রোজগারের বিশাল ক্ষেত্র।

আগে রাজনীতিবিদরা নিজেদের আয়ের টাকা খরচ করতেন রাজনীতিতে। আজ রাজনীতি করে আয় করা—এটাই মূলধারা।

সরকারে বা দলে কোনো অবস্থান পেলে ব্যবসা, কন্ট্রাক্ট, নিয়োগ, সুযোগ—সব কিছুই হাতের মুঠোয়।
এই সুবিধা পাওয়ার জন্যই যারা রাজনীতি সম্পর্কে ধারণা রাখে না, তারাও এমপি হতে চায়।

দলগুলো আজ মেধাবী বা শিক্ষিতদের নয়, বরং
চাটুকার, আজ্ঞাবহ, স্লোগানবাজ, শক্তিশালী, পেশীবাজ এবং ‘দলবাজ’ হিসেবে ব্যবহৃত মানুষদের প্রাধান্য দিচ্ছে। ফলে দলে জায়গা হারাচ্ছেন শিক্ষিত, শান্ত, নীতিবান কর্মীরা।

এভাবেই রাজনীতির মাঠ হয়ে উঠেছে এক ‘ওপেন ভ্যাকেন্সি’, যেখানে স্থান পাচ্ছেন যোগ্যতাহীন মানুষরা।

যাদের জ্ঞান নেই আইন, অর্থনীতি, সমাজ, উন্নয়ন, প্রশাসন—তারা কীভাবে দেশের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে?
ফলে নেতৃত্ব হয়ে যাচ্ছে দুর্বল, অক্ষম এবং দিশাহীন।

আজকের রাজনীতি আর জনসেবার জায়গা নয়—এটি লাভের, সুবিধার, সুযোগের, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা। এক দল ক্ষমতায় গেলেই অন্য দলের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উড়ে আসে—বাড়ি-গাড়ি-ব্যবসা বেড়ে গেছে, বিদেশে সম্পদ জমেছে, পরিবারে বিলাসিতা বেড়েছে। এরা কি সত্যিই জনগণের প্রতিনিধি, না জনগণের সম্পদের ভোক্তা?

এই ভয়ঙ্কর প্রবণতার কারণে শিক্ষিত, নীতিবান, দায়িত্বশীল মানুষ রাজনীতি থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছেন। কারণ তারা মনে করেন—এই পরিবেশ তাদের জন্য নয়। রাজনীতি আজ তাদের চোখে ‘গন্ধময় জঞ্জালের ডাস্টবিন’, যেখানে তারা নিজেকে কলুষিত করতে চান না। ফলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাচ্ছে অযোগ্য, বেকার, আধাপড়া মানুষের দল—
আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গোটা দেশ।

পার্লামেন্ট হলো রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্র। সেখানে আইন পাস হয়, নীতি নির্ধারিত হয়, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ঠিক হয়। কিন্তু সেখানে যদি বসে থাকে এমন মানুষ, যারা আইনই বোঝে না,
অর্থনীতি বোঝে না,
প্রশাসন বোঝে না,
বাজেট বোঝে না—

বোঝে শুধু চাটুকারিতা, নারী আর অর্থ

তাহলে দেশ কীভাবে এগোবে?

যোগ্যতার অভাব যারা ভেতরে ভেতরে জানে—
তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেই নিজেদের টিকিয়ে রাখতে চায়।

এরা প্রভাব খাটায়, ভয়ভীতি দেখায়, তদবির করে, নিয়োগ বাণিজ্য করে, দখলদারি করে, দলে চাপ সৃষ্টি করে। এদের কাছে জনগণ ভোটার নয়—ব্যবহারযোগ্য সম্পদ।

অযোগ্য নেতারা সাধারণত দুই শ্রেণির—অর্ধশিক্ষিত পেশীবাজ এবং টাকা দিয়ে পদ-পদবি কিনে নেওয়া ব্যবসায়ী।

দুই ধরনের নেতাই দুর্নীতির ভিত্তি শক্ত করে। রাষ্ট্রযন্ত্রে প্রবেশ করে তারা শুধু নিজেদের জন্য ‘নিরাপদ ব্যবসার ছায়া’ বানায়। ফল—দুর্নীতিবাজদেরও এমপি হওয়ার খায়েস দমে না।

কারণ জনগণের বড় অংশ মনে করে— এমনিই চলছে, এমনিই চলবে। একদিকে রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন হয়নি, অন্যদিকে জনগণের চোখে রাজনীতিবিদ মানেই এখন ক্ষমতাবান,ধনী প্রভাবশালী এবং অন্যায় করলে শাস্তি নেই—এমন ধারণা।

এভাবে মানুষ যাদের ভয় পায়, তাদেরই নেতা বানিয়ে ফেলে। এ যেন এক দুষ্টচক্র।

দেশ পরিচালনা করতে যেমন নৈতিকতা লাগে, তেমনি লাগে শিক্ষা, যুক্তিবোধ ও অভিজ্ঞতা। নেতাদের জন্য অন্তত ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা, নৈতিক যাচাই ও আর্থিক স্বচ্ছতা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

চাটুকার কখনোই রাষ্ট্র গড়তে পারে না। দলগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে— তারা ক্ষমতায় যেতে চায়, নাকি দেশ গড়তে চায়।

রাজনীতিকে ব্যবসায়িক মডেল থেকে বের করে আনতে হবে। নির্বাচনী ব্যয় সীমিত করা, রাজনৈতিক অর্থায়ন স্বচ্ছ করা প্রয়োজন।

জনগণ যদি অযোগ্য মানুষকে ভোট দেন, তবে তার দায় কেবল রাজনীতির নয়—সমাজেরও।
ভোটের মূল্য বুঝতে হবে, যোগ্য প্রতিনিধিকে নির্বাচন করতে হবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আজ যেদিকে দাঁড়িয়েছে, তা গভীর সঙ্কেত দেয়। রাজনীতিতে যতদিন অযোগ্য অর্ধশিক্ষিত বেকার স্লোগানবাজ চাটুকার এবং ক্ষমতালোভী মানুষের আধিপত্য থাকবে— ততদিন এই দেশে মেধাবী, ত্যাগী, উদার, নীতিবান নেতৃত্ব জন্ম নেবে না।

রাজনীতি যদি সত্যিই জনসেবার জায়গা হতো, তাহলে এমপি হওয়ার খায়েস এত বেশি থাকত না।
এটার কারণ মানবসেবা নয়— সুবিধা, ক্ষমতা, আয় আর দুর্নীতির সুযোগ।

আজ রাজনীতি ব্যবসায়িক রূপ নিয়েছে— যেখানে আগে নেতা নিজের টাকা খরচ করতেন, এখন রাজনীতি করে টাকা কামানোই মুখ্য বিষয়। আর সেই লোভের কারণেই দুর্নীতিবাজরাও এমপি হতে চায়।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য জরুরি—রাজনীতিকে শুদ্ধ করা, যোগ্যতাহীনদের রাজনীতিতে প্রবেশ কমানো, এবং মেধাবী মানুষের জন্য নিরাপদ, সম্মানজনক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা।

নইলে আগামী প্রজন্মের কাছে আমরা এমনই এক রাজনীতি রেখে যাব— যেখানে যোগ্য নয়, অযোগ্যরাই নেতৃত্ব দেবে।

শিক্ষাবার্তা /এ/২৪/১১/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়

 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading