অভ্যস্ততার আগেই বাধ্যবাধকতা—এনবিআরের পদক্ষেপে করদাতাদের হতাশা

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

শেখ আবদুল জব্বার শরীফ, ফয়সাল বাটারফ্লাই স্কুলের  একজন স্কুলশিক্ষক। প্রতি বছরই অক্টোবর মাসে তিনি নিকটস্থ আয়কর আইনজীবীর অফিসে যান রিটার্ন দাখিল করতে। গত বছরও সবকিছু ঠিকঠাক হয়েছিল— হাতে ফাইল, কাগজপত্র, হিসাবের খাতা। কিন্তু এ বছর আইনজীবী তাকে জানালেন, “সবকিছু অনলাইনে জমা দিতে হবে, অফলাইন আর নয়।”

শিক্ষক শরীফ বিভ্রান্ত। মোবাইলে ইন্টারনেট খুলতেই সার্ভার ডাউন, লগইন কোড আসে না, পিডিএফ ফাইল আপলোড হয় না। ঘন্টার পর ঘন্টা চেষ্টার পরও কাজ শেষ হয় না। শেষে ক্লান্ত শরীফ  বলেন,“আমি কর দিতে চাই, কিন্তু সিস্টেমটাই যেন করের চেয়ে কঠিন!”শরীফ একা নন— হাজারো করদাতা আজ একই সমস্যায় পড়ছেন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বাংলাদেশের অর্থনীতির রক্তস্রোত হিসেবে কাজ করে। রাজস্ব আহরণ, কর সংস্কার ও ডিজিটালাইজেশন— এই তিনটি স্তম্ভের ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের উন্নয়ন কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এনবিআরের নেওয়া একটি পদক্ষেপ— ব্যক্তি করদাতাদের জন্য অনলাইন রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা— প্রশংসার পাশাপাশি তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, এটি যেন “অভ্যস্ততার আগেই বাধ্যবাধকতা” চাপিয়ে দেওয়ার এক চেষ্টার নামান্তর।

ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণার পর থেকে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার জীবনের বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত হয়েছে। কর ব্যবস্থাপনাও এর বাইরে নয়। অনলাইন রিটার্ন দাখিল প্রথা একদিকে যেমন সময় সাশ্রয়ী ও স্বচ্ছতার প্রতীক, অন্যদিকে এটি একটি জটিল কারিগরি প্রক্রিয়া, যেখানে করদাতার পাশাপাশি কর পরামর্শক বা আইনজীবীদেরও প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রয়োজন।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশের অধিকাংশ করদাতা ও কর আইনজীবী কি এ বিষয়ে প্রস্তুত?
বাস্তবতা হলো, দেশের করদাতাদের একটি বড় অংশ এখনো ডিজিটাল রিটার্ন ব্যবস্থার সঙ্গে পর্যাপ্তভাবে পরিচিত নয়। অনেকের কাছে অনলাইন ফাইলিংয়ের প্রক্রিয়া একেবারেই নতুন। ইন্টারনেট সংযোগের দুর্বলতা, সার্ভারের ধীরগতি, এবং পর্যাপ্ত কারিগরি সহায়তা না থাকায় এ উদ্যোগটি এখন অনেকের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং অভিশাপের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এনবিআরের বিশেষ আদেশ নং-০১/২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছর থেকে সব ব্যক্তি করদাতাকে অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য দুর্নীতি হ্রাস, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং কর প্রশাসনকে আধুনিকীকরণ করা—যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

তবে বাস্তব সমস্যাগুলো উপেক্ষা করে বাধ্যতামূলক করা এই উদ্যোগকে অনেকেই অযৌক্তিক বলছেন। কারণ—
*দেশের অনলাইন সার্ভার এখনও পর্যাপ্তভাবে স্থিতিশীল নয়।
*গ্রামীণ অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত ও অনির্ভরযোগ্য।
*অনেক কর আইনজীবীর অনলাইন দাখিল সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই।
*করদাতাদের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতা তুলনামূলকভাবে কম।

অতএব, অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা একধরনের “প্রযুক্তিগত বৈষম্য” তৈরি করছে, যেখানে শহরের করদাতারা তুলনামূলক সুবিধাভোগী, অথচ প্রান্তিক বা মধ্যবিত্ত করদাতারা জটিলতায় পড়ে হতাশ হচ্ছেন।

অনেক করদাতা ও কর আইনজীবীর অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, অনলাইনে একটি রিটার্ন দাখিল করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লেগে যায়। কখনো ফাইল আপলোড হয় না, কখনো সিস্টেম লগইন নেয় না, আবার কখনো নথি সংরক্ষণে ত্রুটি দেখা দেয়। এ অবস্থায় নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে রিটার্ন দাখিল করা অনেকের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, যাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা কম, তাদের জন্য এটি মানসিক চাপের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক বয়স্ক করদাতা বা প্রবাসফেরত নাগরিক, যারা আগে স্থানীয় আইনজীবীর মাধ্যমে সহজে অফলাইনে রিটার্ন দাখিল করতেন, তারা এখন বিভ্রান্ত ও নিরুপায়।

অভ্যস্ততা অর্জনের আগেই বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দিলে তা প্রযুক্তিগত নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। করদাতারা তাদের কর প্রদানকে আর দায়িত্ব হিসেবে নয়, বোঝা হিসেবে দেখতে শুরু করেন। এতে কর প্রদানের আগ্রহ কমে যায়-যা দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আহরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

একজন করদাতা রাষ্ট্রের উন্নয়নের অংশীদার। তাই তাকে সহযোগিতা করা কর প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে করদাতারা যে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন তা হল:

*সার্ভার সমস্যা

*সহায়তা কেন্দ্রের অপর্যাপ্ততা

*হেল্পলাইন বা নির্দেশিকা বুঝতে অসুবিধা

*রিটার্ন ফর্মে টেকনিক্যাল ত্রুটি

*কর জমা ও ভাউচার যাচাইয়ে বিলম্ব।

এর ফলে করদাতাদের মনে একধরনের অবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে। তারা ভাবছেন, “এনবিআর কর সংগ্রহ সহজ করার বদলে জটিল করেছে।”

একই সঙ্গে অনেক আইনজীবী অভিযোগ করছেন—এই নতুন ব্যবস্থার কারণে তাদের পেশাগত কাজের ধারাবাহিকতায় ব্যাঘাত ঘটছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে অফলাইন রিটার্নে দক্ষ ছিলেন, তারা এখন প্রশিক্ষণ ছাড়া নতুন সিস্টেমে কাজ করতে গিয়ে হতাশ হচ্ছেন। ফলে রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়ায় অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।

যে কোনো নীতিমালা কার্যকর করার আগে প্রয়োজন হয় জনপ্রস্তুতি ও পরিকাঠামো উন্নয়ন। অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তটি নেওয়ার আগে এনবিআর যদি পর্যাপ্ত সময় নিয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করত— যেমন প্রথম বছর ঐচ্ছিক, দ্বিতীয় বছর উৎসাহমূলক, তৃতীয় বছর বাধ্যতামূলক— তাহলে এটি গ্রহণযোগ্য ও টেকসই হতো।

কিন্তু আকস্মিকভাবে ঘোষিত আদেশের কারণে এখন করদাতারা সময়ের আগেই প্রযুক্তিগত এক বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় এটি একধরনের “নীতি বাস্তবায়নের ত্রুটি”, যেখানে উদ্দেশ্য ভালো হলেও প্রক্রিয়া দুর্বল।

যদি করদাতারা ভোগান্তিতে পড়েন, তাহলে কর প্রদান স্বতঃস্ফূর্ততা হারায়। আর স্বতঃস্ফূর্ততা হারালে কর আহরণ কমে যায়— যা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন (প্রায় ৮–৯%)। এখানে করদাতাদের বিশ্বাস অর্জন করাই মূল চ্যালেঞ্জ। অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামূলক করার ফলে যদি সেই বিশ্বাসে চিড় ধরে, তবে রাজস্ব বোর্ডের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।

একজন করদাতা যদি সার্ভার সমস্যায় পড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা চেষ্টা করেও রিটার্ন দিতে না পারেন, তবে পরবর্তী বছর তিনি হয়তো কর ফাঁকি দেওয়ার চিন্তা করবেন। এটা রাজস্ব ব্যবস্থার জন্য ভয়াবহ সংকেত।

অনেক উন্নয়নশীল দেশ যেমন ভারত, মালয়েশিয়া বা ফিলিপাইনে অনলাইন রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়া চালুর আগে বছরখানেক প্রশিক্ষণ, প্রচার ও পরীক্ষামূলক ধাপ পালন করা হয়েছে।

ভারতে করদাতাদের জন্য “ইনকাম ট্যাক্স পোর্টাল” চালুর আগে কয়েক দফা ট্রায়াল রান, ওয়েবিনার, হেল্পলাইন, ভিডিও গাইড এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। ফলে জনগণ প্রস্তুত হয়ে ওঠে।

কিন্তু বাংলাদেশে সেই প্রস্তুতির সময় না দিয়েই হঠাৎ বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় করদাতারা অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়েছেন। এটি নীতিগতভাবে একধরনের “অভ্যস্ততার আগেই প্রয়োগ”, যা প্রশাসনিক অদক্ষতার দৃষ্টান্ত হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

এনবিআর যদি সত্যিই ডিজিটাল কর সংস্কার চায়, তাহলে প্রথম শর্ত হলো মানুষকে প্রস্তুত করা।

প্রশিক্ষণ ছাড়া প্রযুক্তি চাপিয়ে দেওয়া কখনোই ফলপ্রসূ হয় না। দেশের প্রায় ৬০% করদাতা মধ্যবয়সী বা তার বেশি; তাদের অনেকে কম্পিউটার-স্মার্টফোন ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না।

তাই প্রতিটি জেলায় করদাতা ও আইনজীবীদের জন্য বিনামূল্যের প্রশিক্ষণ কর্মশালা, ওয়েবিনার ও সচেতনতা কার্যক্রম চালু করা জরুরি।

একইসঙ্গে “কর সহায়তা কেন্দ্র” গুলোতে পর্যাপ্ত জনবল ও প্রযুক্তিগত পরামর্শদাতা নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন, যাতে করদাতারা তাৎক্ষণিক সহায়তা পান।

বর্তমান অবস্থায় নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করলে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হতে পারে:-

*দুই থেকে তিন বছর অনলাইন ও অফলাইন উভয় পদ্ধতি চালু রাখা — যাতে জনগণ সময় নিয়ে অভ্যস্ত হতে পারে।
*সার্ভার সিস্টেমের সক্ষমতা বৃদ্ধি — বিশেষত পিক টাইমে সিস্টেম যাতে ক্র্যাশ না করে।
* করদাতাদের জন্য হেল্পডেস্ক ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন।
*অনলাইন রিটার্নে উৎসাহমূলক কর রিবেট — যাতে করদাতারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনলাইন ব্যবস্থায় আগ্রহী হন।
*নীতিনির্ধারণে আইনজীবী ও কর পরামর্শকদের অন্তর্ভুক্ত করা — যাতে বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নীতি তৈরি হয়।

এনবিআরের অনলাইন রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও মানবিক সক্ষমতা এখনো সেই স্তরে পৌঁছায়নি।
এ উদ্যোগটি কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তরের সূচনা হলেও তা যদি জনগণের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে উদ্দেশ্য সফল হবে না।

অতএব, অভ্যস্ততার আগেই বাধ্যবাধকতা আরোপ না করে অভ্যাস তৈরির সুযোগ দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জনগণ যখন বুঝে, শিখে ও আত্মস্থ করে পরিবর্তন গ্রহণ করে— তখনই প্রকৃত ডিজিটাল অগ্রগতি ঘটে।

আজকের দাবি অনলাইন নয়, সহজ-স্বচ্ছ-মানবিক কর ব্যবস্থা।তখনই করদাতারা আগ্রহী হবেন, রাজস্ব বাড়বে, আর অর্থনীতির চাকা ঘুরবে নিরবচ্ছিন্নভাবে।

লেখা: শিক্ষক ও গবেষক।

শিক্ষাবার্তা /এ/২৬/১০/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.