মেধার স্বীকৃতি না ভাগ্যের খেলা: সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে লটারি প্রথা বাতিলের যৌক্তিকতা

।। রাসেল আহমেদ।।

বাংলাদেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়ায় ২০২১ সাল থেকে চালু হয়েছে লটারি পদ্ধতি। করোনা মহামারির কারণে স্বশরীরে ভর্তি পরীক্ষার আপদকালীন বিকল্প হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু এরপর থেকে অজানা কারণে কর্তৃপক্ষ ভর্তি পরীক্ষা না নিয়ে ঐ লাটারিকেই স্থায়ী রুপদান করেছে। অথচ, সরকারি ম্যাটসে ঐ সময় রেজাল্টের ভিত্তিতে ভর্তি নিলেও এখন তারা পরীক্ষা পদ্ধতিতে ফিরে এসেছে। একটা আপদকালীন ব্যাবস্থা স্থায়ী হতে পারে না। কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় এটা প্রমাণ করেছে, এই লটারি পদ্ধতি বাস্তবে যেমন মেধার মূল্যায়নকে অগ্রাহ্য করছে, তেমনি শিক্ষার গুণগত মান ও সামাজিক ভারসাম্যকেও ব্যাহত করছে। তাই সময় এসেছে এই লটারি প্রথাকে বাতিল করে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত আসন নিশ্চিত করার সুযোগ দেওয়ার।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১,০৮,৭১৬টি আসনের বিপরীতে আবেদন পড়েছিল ৬,৩৫,০৭২টি। অর্থাৎ প্রতি আসনের জন্য প্রায় ৬ জন শিক্ষার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার একমাত্র উপায় ছিল ভাগ্যে পরীক্ষা তথা লটারিতে নাম ওঠা। (সূত্র: নিউ এজ, ডিসেম্বর ২০২৪)

লটারির মৌলিক সমস্যা হলো এর মাধ্যেমে কোনো শিক্ষার্থী তার মেধা, যোগ্যতা বা পরিশ্রম দিয়ে সুযোগ অর্জন করতে পারে না। এটি এমন এক প্রক্রিয়া যেখানে “শিক্ষার্থী যত যোগ্য, ভর্তি তত অনিশ্চিত”। এর ফলে শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মেধার স্বীকৃতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এমনিতেই দেশের নামকরা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে নিম্নবিত্ত বা প্রান্তিক এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। অনেক সময় দেখা যায়, একই এলাকার দুই ভাইবোনের একজন লটারিতে সুযোগ পায়, অন্যজন পায় না। এতে পারিবারিক ও মানসিক হতাশা তৈরি হয়। ফলে সমাজে সমতা নয়, বরং অবিচার ও অনিশ্চয়তার সংস্কৃতি গড়ে উঠছে।

লটারি প্রথার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে শিক্ষার মানের দিক থেকে। বিদ্যালয় কোনো নির্বাচনী মানদণ্ডে শিক্ষার্থী বাছাই করতে না পারায় শ্রেণিকক্ষে মেধার বৈচিত্র্য বাড়ছে। এতে শিক্ষকরা পাঠদান পরিকল্পনা করতে হিমশিম খান। কারণ, একই ক্লাসে অত্যন্ত মেধাবী ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীকে একসাথে সমানভাবে শেখানো কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ে বিদ্যালয়ের সার্বিক ফলাফল ও শিক্ষার মানের ওপর। যার ভুক্তভোগী হচ্ছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সবাই।

তদুপরি, লটারি প্রথা শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একজন পরিশ্রমী শিক্ষার্থী যদি দেখে, তার পরিশ্রমের বিনিময়ে কোনো ফল আসছে না। বরং তার পাশে বসে থাকা কম মনোযোগী সহপাঠী ভাগ্যের জোরে ভালো বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। তাহলে সে শিক্ষাজীবনের প্রতি আস্থা হারাতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি জাতির মেধাবিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।

অন্যদিকে, দুর্নীতি রোধের জন্য লটারি পদ্ধতির যৌক্তিকতা থাকলেও, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতি দিয়ে দুর্নীতিমুক্ত ভর্তি প্রক্রিয়া গড়া সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, প্রাথমিকভাবে অনলাইন আবেদন যাচাই করে মেধাভিত্তিক পয়েন্ট সিস্টেম, স্কুলভিত্তিক কোটা (যেমন স্থানীয় এলাকার অগ্রাধিকার), এবং পাবলিক স্কোরিং সিস্টেম চালু করা যেতে পারে। এতে ভর্তি প্রক্রিয়া যেমন স্বচ্ছ থাকবে, তেমনি শিক্ষার্থীর যোগ্যতাও যথাযথভাবে মূল্যায়িত হবে।

মূল কথা হলো, শিক্ষা হলো একটি দেশের মানবসম্পদ বিকাশের মূল ভিত্তি। সেখানে “ভাগ্যের খেলা” দিয়ে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা শুধু যুক্তির পরিপন্থীই নয়, শিক্ষার্থীদের “মানবাধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন” লটারির মাধ্যমে ভর্তি করা মানে হলো পরিশ্রমী ও যোগ্য শিক্ষার্থীকে অবমূল্যায়ন করা, যা শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।

অতএব, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত লটারি প্রথা পুনর্বিবেচনা করা এবং মেধাভিত্তিক, স্বচ্ছ ও ন্যায্য ভর্তি ব্যবস্থা প্রবর্তন করা। ভর্তি প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তি, ন্যায্য মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে দুর্নীতি যেমন কমবে, তেমনি শিক্ষার মানও বাড়বে। কারণ, শিক্ষা ব্যবস্থায় ভাগ্য নয়, মেধাই হওয়া উচিত আসল মানদণ্ড।

লেখা:রাসেল আহমেদ, শিক্ষক ও চিন্তক।

শিক্ষাবার্তা /এ/২৩/১০/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.