।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
বাংলাদেশে শিক্ষা খাত নিয়ে যতই উন্নয়নের গল্প বলা হোক না কেন, বাস্তব চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার, দূরশিক্ষণ, উন্মুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা—সবই আমাদের শিক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। কিন্তু এসব অর্জনের মাঝেই যদি শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে সেই অগ্রগতি কতটুকু অর্থবহ? সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার ডিএন ডিগ্রি কলেজে অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) বিএ ও বিএসএস শেষ বর্ষের পরীক্ষায় প্রকাশ্যে নকল এবং শিক্ষক কর্তৃক সহায়তার যে অভিযোগ উঠে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য লজ্জাজনক।
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় মূলত সেইসব শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ তৈরি করে, যারা বয়স, চাকরি, পারিবারিক সীমাবদ্ধতা বা অন্য কোনো কারণে নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে পারে না। একজন চাকরিজীবী, গৃহিণী বা দূরবর্তী গ্রামের ছাত্রছাত্রী—যে কেউ চাইলে বাউবিতে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে। এ ব্যবস্থার প্রধান শক্তি হলো সবার জন্য শিক্ষা। কিন্তু দুঃখজনক হলো, যখন এই ব্যবস্থার মূলে থাকা পরীক্ষাগুলোতেই শৃঙ্খলার অভাব দেখা যায়, তখন পুরো কাঠামোটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
সাংবাদিকদের চোখে ধরা পড়েছে, পরীক্ষার্থীরা অবাধে বই খুলে উত্তর লিখছে, কেউ ছেঁড়া পাতা রেখে লিখছে, কেউ পুরো বই খুলে রেখেছে। আর আশ্চর্যের বিষয়, দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা তা না শুধু সহ্য করছেন, বরং অনেক ক্ষেত্রেই নিজেরাই সহায়তা করছেন। এ যেন “নকলমুক্ত পরীক্ষা কেন্দ্র” লেখা সাইনবোর্ডের নিচে প্রকাশ্য নকল উৎসব।
এমন দৃশ্য শুধু ঠাকুরগাঁও নয়, দেশের অনেক পরীক্ষাকেন্দ্রে হরহামেশাই ঘটে থাকে। পার্থক্য শুধু এতটুকুই—সব সময় তা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পায় না।
এখানে প্রশ্ন জাগে—যাঁরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার দায়িত্ব নিয়েছেন, সেই শিক্ষকরা কেন নিজেরাই নকলকে প্রশ্রয় দেন? কয়েকটি কারণ বিশ্লেষণ করা যায়—সংবাদে উঠে এসেছে, পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে পরীক্ষকরা নকলের সুযোগ দিয়েছেন। একজন পরীক্ষার্থী নাকি ১৮০০–২০০০ টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন। এ যেন সনদের ব্যবসা।
অনেক শিক্ষক মনে করেন, বাউবির শিক্ষার্থীরা মূলত জীবনে ব্যর্থ বা সীমাবদ্ধতার কারণে এখানে এসেছে। তাই তাদেরকে “সহজে পাশ করিয়ে দেওয়া” নাকি মানবিকতা। অথচ এটা মানবিকতা নয়, প্রতারণা।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে ট্যাগ অফিসার থাকা বাধ্যতামূলক হলেও কেন্দ্রে কাউকে পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ দায়সারা মনোভাব সব জায়গাতেই।
একজন পরীক্ষার্থীর ভাষ্যে উঠে এসেছে, শিক্ষকরা টাকা নিয়েছেন এবং বিনিময়ে নকলের সুবিধা দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো—এভাবে পাশ করে পাওয়া সনদ কি কোনো কাজে আসবে? হয়তো চাকরিতে প্রাথমিকভাবে কাজে লাগতে পারে, কিন্তু জ্ঞানহীন সনদধারী শেষ পর্যন্ত নিজের অক্ষমতাই প্রকাশ করবে।
শিক্ষার্থীরা যখন দেখে টাকা দিয়ে নকল করা যায়, তখন তারা আর পড়াশোনার কষ্ট করতে চায় না। এর ফলে তারা শুধু পরীক্ষায় নয়, পুরো জীবনে শর্টকাট পথ বেছে নিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
শিক্ষা একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। অথচ এই মেরুদণ্ড বারবার ভেঙে পড়ছে আমাদের অবহেলা ও দুর্নীতির কারণে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে এসিল্যান্ড পাঠানোর কথা বললেও, বাস্তবে তাৎক্ষণিক কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। জেলা প্রশাসনও দায়সারা মন্তব্য করেছে।
এখানে প্রশ্ন হলো—শুধু ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে দুই-একজন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? নাকি গোটা সিস্টেমটাকেই সংস্কার করতে হবে?
বাংলাদেশে অনেক সময় শিক্ষার মানের চেয়ে সনদকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। চাকরি পেতে হলে ডিগ্রি দরকার—এমন মানসিকতা আমাদের সমাজে গেঁথে গেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি পাওয়ার জন্য যেকোনো শর্টকাট অবলম্বন করে, আর কিছু অসাধু শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা এই সুযোগকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম বানিয়ে নেন।
এভাবে চলতে থাকলে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি সনদ বিতরণের কারখানায় পরিণত হবে। অথচ এর আসল লক্ষ্য ছিল “শিক্ষা সবার জন্য সহজলভ্য করা।”
একটি জাতি তখনই টিকে থাকতে পারে, যখন তার শিক্ষিত প্রজন্ম প্রকৃত অর্থে জ্ঞানী ও দক্ষ হয়। নকল করে পাশ করা শিক্ষার্থীরা—
চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না।
কর্মক্ষেত্রে অযোগ্যতার পরিচয় দেয়।
নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
ফলে সমাজে অদক্ষ সনদধারীর সংখ্যা বাড়ে, আর দক্ষতার ঘাটতি মেটাতে বিদেশি বিশেষজ্ঞের উপর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়।
শিক্ষক পেশা সমাজের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পেশা। একজন শিক্ষক যদি নকলের সুযোগ তৈরি করেন, তবে তিনি শুধু নিজের মর্যাদা নষ্ট করেন না, পুরো সমাজকেই ধ্বংস করেন। শিক্ষার্থীরা তখন শেখে—শর্টকাট পথই সফলতার পথ। এর ফলে দুর্নীতি, ঘুষ, প্রতারণা আরও গভীরভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়।
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি— প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রে কার্যকরভাবে প্রশাসনিক কর্মকর্তার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু নামমাত্র নয়, বাস্তবে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা নকলের সুযোগ দিলে তাদের বিরুদ্ধে কড়া শাস্তি—বরখাস্ত, চাকরি থেকে অব্যাহতি কিংবা আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
শুধু লিখিত পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে অনলাইন পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, মৌখিক পরীক্ষা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।
শিক্ষার্থীদের বোঝাতে হবে—শর্টকাট নয়, জ্ঞান অর্জনই আসল সাফল্য। এজন্য কাউন্সেলিং, সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।
শুধু ডিগ্রিকে গুরুত্ব না দিয়ে দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। চাকরিতে নিয়োগের সময় জ্ঞান ও দক্ষতার মূল্যায়ন করা জরুরি।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিধিতে আছে পরীক্ষায় নকল করা বা নকল করানো সরাসরি শৃঙ্খলাভঙ্গ।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরীক্ষা নীতি ও প্রবিধান রয়েছে। সেখানে স্পষ্ট বলা আছে—পরীক্ষায় নকল করলে পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা যাবে, এমনকি ভবিষ্যৎ পরীক্ষা থেকেও নিষিদ্ধ করা যাবে।
যদি প্রমাণিত হয় যে শিক্ষকরা টাকা নিয়ে পরীক্ষার্থীদের নকলের সুযোগ দিয়েছেন, তবে এটি ঘুষ গ্রহণ ও দুর্নীতি হিসেবে গণ্য হবে।
দুদক আইনের ২৭ ধারা অনুযায়ী ঘুষ গ্রহণ, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে।
ধারা ৪২০: প্রতারণা ও প্রতারণার মাধ্যমে সম্পদ লাভ → পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নকলের সুযোগ দেওয়াকে প্রতারণা ধরা যাবে। এর জন্য সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে।
ধারা ১৬৬: সরকারি কর্মচারীর ক্ষমতার অপব্যবহার → পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা শিক্ষক বা প্রশাসনিক কর্মকর্তা যদি দায়িত্ব পালন না করে উল্টো নকলের সুযোগ দেন, তবে এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
ধারা ৪৬৮ ও ৪৭১: জালিয়াতি ও ভুয়া নথি ব্যবহার → নকল করে উত্তরপত্র জমা দেওয়া আইনের চোখে জালিয়াতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
যেসব শিক্ষক বা কর্মকর্তা এ কাজে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে—চাকরিচ্যুতি, স্থায়ী বহিষ্কার বা বিভাগীয় শাস্তি।
তাই এখনই প্রয়োজন কঠোর পদক্ষেপ, সৎ মনোভাব এবং জবাবদিহিতা। শিক্ষা হতে হবে প্রকৃত শিক্ষা—যা মানুষকে জ্ঞানী করবে, নৈতিক করবে, দক্ষ করবে। অন্যথায়, “উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় উন্মুক্ত নকল” কেবল শিক্ষার মানকেই নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যৎকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
শিক্ষাবার্তা /এ/০১/১০/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
