ভুল শিক্ষকের খেসারত শিক্ষার্থীর

দেশের প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন নয় বরং পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়। পুনর্নিরীক্ষণের পর অনেকের ফল পরিবর্তন হতেও দেখা যায়। কেউ ফেল থেকে পাস করে, কেউ কোনো কোনো বিষয়ে জিপিএ ৫ও পায়। কিন্তু ভুলটা কার? এর উত্তরে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরীক্ষকের অবহেলার কারণেই পরীক্ষার্থীদের প্রাপ্ত নম্বর যোগ হয় না। তারাই অপটিক্যাল মার্ক রিকগনিশন (ওএমআর) শিটে নম্বর তুলতে ভুল করেন।

কিন্তু পরীক্ষকের এই ভুলের কারণে বছরের পর বছর খেসারত দিতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। প্রতিটি বিষয় পুনর্নিরীক্ষণের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া হয় ১২৫ টাকা। আর ফল প্রকাশের পর ফেল করেছে জেনে আবেগের বশে অনেকে আত্মহত্যাও করে বসে। তবে শিক্ষা বোর্ডগুলোর এই খাত থেকে বড় ধরনের ব্যবসা হয় বলেও সংশ্লিষ্ট অনেকে মন্তব্য করেছেন। ফল প্রকাশ ও পুনর্নিরীক্ষণ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের আরও সচেতন হতে হবে, এমনকি ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করার আহ্বান করেছেন পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। শিক্ষাবিদরা বলছেন, ‘চলমান ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা না নিয়ে ক্লাসেই অন্তত ৬০ নম্বরের মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা উচিত, যা জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০-এ বলা হয়েছে। তাহলে এই সমস্যার সমাধান তো হবেই, আর শিক্ষার মানও নিশ্চিত হবে।’

গত ৩১ ডিসেম্বর প্রকাশিত জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের জন্য শিক্ষা বোর্ডগুলোতে ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৩টি আবেদন জমা পড়েছে। এই আবেদন থেকে বোর্ডগুলো আয় করেছে ১ কোটি ৬৮ লাখ ৭৬ হাজার ৬২৫ টাকা। অথচ পুনর্নিরীক্ষণে মূলত উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন করা হয় না, বরং প্রাপ্ত নম্বর গণনা ও নম্বর যোগ করতে ভুল হয়েছে কি না সেটাই দেখা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিয়াউল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণে উত্তরপত্রে সব প্রশ্নের সঠিকভাবে নম্বর দেওয়া হয়েছে কি না, প্রাপ্ত নম্বর গণনা ঠিক হয়েছে কি না, প্রাপ্ত নম্বর ওএমআর শিটে তোলা হয়েছে কি না এবং প্রাপ্ত নম্বর অনুযায়ী ওএমআর শিটে বৃত্ত ভরাট সঠিকভাবে করা হয়েছে কি না তা দেখা হয়। তবে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ণ করা হয় না।’ শিক্ষা বোর্ডে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এইচএসসি, এসএসসি ও জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষায় প্রতি বিষয়ের জন্য পরীক্ষার্থীকে গুনতে হয় ১২৫ টাকা। অন্যদিকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর জানিয়েছে, পিইসি পরীক্ষায় উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষায় প্রতি বিষয়ের জন্য পরীক্ষার্থীদের গুনতে হয় ১৮০ টাকা। পুনঃনিরীক্ষার আবেদন গ্রহণের পর প্রধান পরীক্ষকদের বোর্ড ও অধিদপ্তর থেকে উত্তরপত্রের কোড নম্বরসহ তালিকা চিঠি দিয়ে নতুন করে ওই উত্তরপত্রগুলোর নম্বর যাচাই-বাছাই করার জন্য বলা হয়।

প্রতিটি উত্তরপত্র পুনরায় দেখার জন্য ওই পরীক্ষক ৪০-৫০ টাকা, উত্তরপত্র আনা-নেওয়ার জন্য ৩০-৪০ টাকা এবং বাকি টাকা বোর্ডের খরচ দেখানো হয়। দেশের শিক্ষা বোর্ডগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা-২০১৯ এর পুনঃনিরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ঢাকা বোর্ডসহ ১০ বোর্ডে চার হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়। এর মধ্যে নতুন করে জিপিএ ৫ পায় প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী। ২০১৮ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার পুনঃনিরীক্ষণে সারা দেশের প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়। ২০১৭ সালে শুধু ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে জেএসসি পরীক্ষার পুনঃনিরীক্ষণে ১ হাজার ৫৭৮ জনের ফল পরিবর্তন হয়। এর মধ্যে নতুন করে জিপিএ ৫ পায় ৪০৬ জন এবং ফেল থেকে পাস করে ২৩৮ জন। এভাবে প্রতি বছরই প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষার পুনঃনিরীক্ষায় বিশাল সংখ্যক পরীক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হতে দেখা যায়।

এ বিষয়ে কয়েকজন অভিভাবক দেশ রূপান্তরকে অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রথমবার পরীক্ষকরা যদি সচেতনভাবে উত্তরপত্রের নম্বর ওএমআর শিটে তুলতেন তাহলে তো অভিভাবক ও পরীক্ষার্থীদের এই সমস্যায় পড়তে হতো না। প্রথমবার ফল প্রকাশের পর অনেক পরীক্ষার্থী তার আশানুরূপ ফল পায়নি জানার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, এমনকি আবেগের বশে কেউ কেউ আত্মহত্যাও করে। এই সংকট থেকে বের হতে পরীক্ষকদের আরও সচেতন হতে হবে।’ সর্বশেষ, গত ৩১ ডিসেম্বর জেএসসি ও জেডিসি এবং পিইসি-ইবতেদায়ির পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এই ফল প্রকাশের পরদিন থেকে গত ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে পুনঃনিরীক্ষার আবেদন গ্রহণ করে বোর্ডগুলো। বোর্ড থেকে জানানো হয়েছে, পুনঃনিরীক্ষণ শেষে এই পরীক্ষার ফল শিগগির প্রকাশ করা হবে।

এদিকে শিক্ষা বোর্ডগুলোর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেএসসি-জেডিসিতে সারা দেশ থেকে মোট ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৩টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বোর্ডে ৫৪ হাজার ৬৮২টি, রাজশাহী বোর্ডে ৭ হাজার ৮৬৫টি, চট্টগ্রাম বোর্ডে ১৪ হাজার ৫৮৭টি, কুমিল্লা বোর্ডে ১২ হাজার ৫৯০টি, সিলেট বোর্ডে ৪ হাজার ২৬০টি, দিনাজপুর বোর্ডে ১০ হাজার ১১১টি বরিশাল বোর্ডে ৪ হাজার ২৬০টি, ময়মনসিংহ বোর্ডে ৭ হাজার ৭৪০টি, যশোর বোর্ডে ৮ হাজার ৮৭৩টি এবং মাদ্রাসা বোর্ডে ১০ হাজার ৪৫টি আবেদন জমা পড়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উত্তরপত্র মূল্যায়নই ঠিকমতো হয় কি না তা নিয়েই আমার প্রশ্ন রয়েছে। তার ওপর পরীক্ষকরা যদি আরও সচেতন হতেন তাহলে এই সমস্যা থাকত না। কিন্তু তারা সচেতন হবেনই বা কীভাবে; তাদের ওপর প্রচুর চাপ থাকে, প্রচুর খাতা তাদের দেখতে হয়। এই চাপ যেমন কমানো উচিত তেমনি তাদেরও আরও সচেতন হওয়া উচিত। কারণ, তাদের ওপরই একজন শিক্ষার্থীর গোটা শিক্ষাজীবন নির্ভর করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবে এই সমস্যা থাকবে না তখন, যখন জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। কারণ, জাতীয় শিক্ষানীতিতে ক্লাসেই মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে। আমাদের দেশে তা তো হচ্ছে না। যদি ক্লাসেই ৫০-৬০ নম্বর মূল্যায়ন করা হয়, বাকি নম্বরের পরীক্ষা নেওয়া হয়, তাহলে এই সমস্যার সমাধান হবে।’ অন্যদিকে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাই হয়ে পড়েছে বাণিজ্যিক। পুনঃনিরীক্ষার নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ আদায় করা হয়।’ সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মতো তিনিও জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এর আলোকে ধারাবাহিক মূল্যায়ন বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।সুত্র দেশরুপান্তর


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.