।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। এ মেরুদণ্ডকে দৃঢ় করার অন্যতম হাতিয়ার আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা। দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারের আয়োজিত ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (আইসিটি) প্রশিক্ষণ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে প্রকৃত আইসিটি শিক্ষকদের পরিবর্তে আত্মীয়–স্বজনকে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ করে দেওয়ার হাতিয়ার বানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি অর্থও হরিলুটের শিকার হচ্ছে।
কোরিয়ার এই প্রশিক্ষণে মূল লক্ষ্য ছিল আইসিটি বিষয়ের শিক্ষকদের আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ডিজিটাল টুলস ও তথ্যপ্রযুক্তির নতুন ধারা সম্পর্কে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া। এসব জ্ঞান পরে তারা দেশে ফিরে অন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেবেন।
কিন্তু বাস্তবে প্রার্থী তালিকা প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় দেখা যায়, ১৯ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে কেবল একজন আইসিটি বিষয়ের শিক্ষক মনোনীত হয়েছেন। বাকিরা বাংলা, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, জীববিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা কিংবা পদার্থবিজ্ঞানের মতো বিষয়ের শিক্ষক। এর মধ্যে একজন পরিচালকের স্ত্রী, আরেকজন তার শ্যালিকা, আরও কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সুপারিশে নির্বাচিত। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্যকে পাশ কাটিয়ে এটিকে আত্মীয়প্রীতির আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জাগে: যখন এ প্রশিক্ষণ বিশেষভাবে আইসিটি বিষয়ক, তখন অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের মনোনয়ন দেওয়ার যুক্তি কী? এর একমাত্র উত্তর হলো—আত্মীয়প্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার।
এই প্রশিক্ষণে বিদেশ ভ্রমণ, আবাসন, ভাতা—সব মিলিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়। যেহেতু প্রশিক্ষণটি আইসিটি–কেন্দ্রিক, তাই অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা কেবল তখনই দাঁড়ায় যখন প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা দেশে ফিরে জ্ঞান বিতরণ করবেন। কিন্তু যখন বাংলা বা ইতিহাসের শিক্ষকরা এ প্রশিক্ষণ নেন, তখন তার ফল ভোগ করবে না শিক্ষা ব্যবস্থা। বরং সরকারি টাকা ‘ফ্যামিলি ট্যুরিজমে’ খরচ হয়ে যাবে।
এটিকে অনেক শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা ‘পারিবারিক ট্যুর’ আখ্যা দিয়েছেন। বাস্তবে এটি এক ধরনের প্রমোদযাত্রা, যার সঙ্গে শিক্ষা কিংবা প্রযুক্তি উন্নয়নের কোনো সম্পর্ক নেই।
দক্ষিণ কোরিয়ার এ প্রোগ্রামে নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা এবং মাউশির দুইজন কর্মকর্তার যাওয়ার কথা। কিন্তু এবার অংশ নিচ্ছেন তিনজন কর্মকর্তা। আবার শিক্ষকদের ক্ষেত্রে কেবল আইসিটি বিষয়ক শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা থাকলেও তা মানা হয়নি।
অর্থাৎ, প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত নিয়মকে তোয়াক্কা না করে প্রভাবশালী মহল নিজেদের স্বার্থে তা ভেঙে দিয়েছে। এতে কেবল নৈতিক অবক্ষয় নয়, প্রশাসনিক জবাবদিহিতার অভাবও ফুটে উঠেছে।
স্বজনপ্রীতির বিপদ:
প্রকৃত আইসিটি শিক্ষকরা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তারা আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাবে পিছিয়ে পড়ছেন। যাদের পাঠানো হচ্ছে, তারা দেশে ফিরে কোনো কার্যকর জ্ঞান বিতরণ করতে পারবেন না। সরকারি কোষাগারের অর্থ ভ্রমণে অপচয় হচ্ছে। প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে স্বজনপ্রীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে। যোগ্য শিক্ষকরা সুযোগ না পেয়ে হতাশ হচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে কর্মস্পৃহা কমিয়ে দেবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন দাবি করেছেন, এটি নাকি আইসিটি প্রশিক্ষণ নয়, বরং এক ধরনের কালচারাল এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম। এই যুক্তি পুরোপুরি ভ্রান্ত। মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে প্রশিক্ষণটি মূলত আইসিটি বিষয়ক এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সংক্রান্ত আধুনিক প্রযুক্তি শেখানো হয়। কেবল বিতর্ক এড়াতে কাগজপত্রে ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ‘কালচারাল এক্সচেঞ্জ’ আড়াল তৈরি করে মূলত আত্মীয়–স্বজনকে বিদেশ পাঠানোর ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছে।
যদি এভাবে নিয়ম ভেঙে আত্মীয়প্রীতির মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচন অব্যাহত থাকে, তাহলে যে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে শিক্ষা ব্যবস্থায় তা হলো—আইসিটি খাতে দক্ষ শিক্ষক তৈরি হবে না। আধুনিক প্রযুক্তি শিক্ষার প্রসার থমকে যাবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতামূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির ওপর বিদেশি অংশীদারদের আস্থা নষ্ট হবে। শিক্ষা খাতে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা আরও গভীর হবে।
শিক্ষাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে – প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচনে কেবল যোগ্য আইসিটি শিক্ষকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আবেদন ও বাছাই প্রক্রিয়াকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আনা উচিত, যাতে স্বজনপ্রীতির সুযোগ না থাকে। যেসব কর্মকর্তা স্বজনপ্রীতি করেছেন, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বাধীন নিরীক্ষা চালানো প্রয়োজন। এই ধরনের হরিলুট প্রকাশ্যে আনা ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করা জরুরি।
এই বিষয়ে নেট দুনিয়ায় আড়োলন সৃস্টি হয়। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষক কর্মচারী ঐক্য জোটের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো: সেলিম ভুঁইয়া বলেন, “আইসিটি প্রশিক্ষণের নামে যা হয়েছে, তা সরাসরি হরিলুট ও স্বজনপ্রীতির উৎসব। ১৯ জনের দলে মাত্র একজন আইসিটি শিক্ষক, বাকিরা অন্য বিষয়ের শিক্ষক কিংবা পরিচালকের স্ত্রী-শ্যালিকা—এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটি আসলে আইসিটি প্রশিক্ষণ নয়, বরং সরকারি টাকায় প্রমোদযাত্রা।
এ ধরনের অনিয়ম কেবল দুর্নীতি নয়, শিক্ষার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। আইসিটি শিক্ষকদের বাদ দিয়ে ইতিহাস বা বাংলা বিভাগের শিক্ষকদের বিদেশে পাঠানো মানে জাতির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া। শিক্ষা ব্যবস্থাকে যারা স্বজনপ্রীতির বলি বানাচ্ছেন, তারা জাতির শত্রু।
আমরা দাবি করছি—এই অসততার মহোৎসবের নেপথ্যের দুর্নীতিবাজ শিশির গংদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেকোনো বিদেশ প্রশিক্ষণে যোগ্য আইসিটি শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষা হলো জাতির মেরুদণ্ড। যদি এই মেরুদণ্ড দুর্নীতি ও আত্মীয়প্রীতিতে ভেঙে দেওয়া হয়, তবে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন এক ভয়াবহ প্রহসন হয়ে দাঁড়াবে।”
দক্ষিণ কোরিয়ার আইসিটি প্রশিক্ষণ বাংলাদেশের শিক্ষা উন্নয়নের জন্য ছিল এক বিরল সুযোগ। কিন্তু সেটি আত্মীয়–স্বজনের বিদেশ ভ্রমণের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। আইসিটি শিক্ষকরা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, আর সরকারি অর্থ গিয়েছে প্রমোদযাত্রায়। এটি কেবল অর্থের হরিলুট নয়, বরং শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি এক বিরাট বিশ্বাসঘাতকতা। শিক্ষা হলো ভবিষ্যতের বিনিয়োগ। সেখানে যদি স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনা রাজত্ব করে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা কেবল ধ্বংসস্তূপই উপহার দেব। এখন সময় এসেছে শিক্ষা প্রশাসনকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নৈতিকতার পথে ফিরিয়ে আনার। নইলে এমন প্রশিক্ষণ শুধু হরিলুটের নতুন কাহিনি হয়েই থেকে যাবে।
লেখা: যুগ্ম-মহাসচিব
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটি।
শিক্ষাবার্তা /এ/০৩/০৯/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল