।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘ম্যানেজিং কমিটি’ বা পরিচালনা পর্ষদ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্কুলের নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক কাজ, শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়নসহ নানা বিষয়ে এই কমিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। এতদিন এই কমিটিতে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতি ছিল।
তবে সাম্প্রতিক এক প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এখন থেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা আর স্কুলের পরিচালনা কমিটিতে থাকতে পারবেন না। এই সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে দেশজুড়ে চলছে তর্ক-বিতর্ক। আমরা বিগত দিনে রাজনৈতিক প্রভাবের বাস্তব চিত্র পর্যালোচনা করলে যা দেখি:-
বাংলাদেশের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পর্ষদ বা ম্যানেজিং কমিটি গঠনে স্থানীয় রাজনীতির প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি বাস্তবতা। যদিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি কিংবা জাতীয় স্বার্থে পরিচালিত হওয়ার কথা, বাস্তবে তা অনেক সময় রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের বলয়ের অংশে পরিণত হয়।
প্রধান শিক্ষকের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাপে পছন্দের ব্যক্তিকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে হয়। এতে মেধাবী প্রার্থীরা বাদ পড়ে যান এবং দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিদ্যালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দ, ভবন নির্মাণ, টেন্ডার কিংবা বইয়ের সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা তাঁদের অনুসারীদের সম্পৃক্ততা লক্ষ্য করা যায়। এতে প্রতিষ্ঠান হয় দুর্নীতির শিকার।
স্কুল কমিটিতে সরকারী কর্মকর্তাদের কর্তৃত্ববাদী ভূমিকা:
রাজনৈতিক নেতাদের মতোই, অনেক ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তারাও স্কুল পরিচালনা কমিটিতে এমন একক ও কর্তৃত্ববাদী ভূমিকা পালন করেন, যা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে। বিশেষ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কিংবা জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি—তাঁরা অনেক সময় নিয়মের বাইরে গিয়ে প্রধান শিক্ষক বা কমিটির অন্য সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করেন
কমিটিতে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনার আগেই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়। প্রধান শিক্ষক বা শিক্ষক প্রতিনিধি মত দিলেও তাতে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে।
বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে, কোথাও কোথাও ইউএনও বা শিক্ষা কর্মকর্তার সুপারিশ ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ বা বদলি কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এতে যোগ্যতার চেয়ে প্রভাবশালীদের ইচ্ছা প্রাধান্য পায়
প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষকরা অনেক সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভয়ে মুখ খুলতে পারেন না। তাঁরা মনে করেন, সরাসরি বিরোধিতা করলে শাস্তিমূলক বদলি বা অভিযোগের মুখে পড়তে হতে পারে।
সরকারি কর্মকর্তারা যখন কমিটিতে থেকেও কোনো কাজের জবাবদিহি করেন না, তখন সেটা শুধু কর্তৃত্ব নয়, বরং প্রশাসনিক দুর্ব্যবস্থারও উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। দুর্নীতি বা অনিয়ম হলে তা ঢাকা পড়ে যায়।
স্কুল কমিটিতে যাঁদের থাকা উচিত:
কমিটিতে এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাঁরা শিক্ষার প্রতি আন্তরিক ও সচেতন। শুধু পদ-পদবি নয়, বাস্তবে যাঁরা শিক্ষার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেন, তাঁদের জায়গা দিতে হবে।
শিক্ষার্থীদের বাস্তব চাহিদা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও মানসিক কল্যাণ বোঝার জন্য অভিভাবকদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাঁরা যেন রাজনৈতিক পরিচয় নয়, যোগ্যতা ও আগ্রহ অনুযায়ী নির্বাচিত হন।
যাঁরা এলাকায় সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত, এবং জনকল্যাণে কাজ করেন—তাঁদের কমিটিতে রাখা গেলে প্রতিষ্ঠানটি পাবলিক ট্রাস্ট ফিরে পাবে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, শিক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি বা শিক্ষাবিদদের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলে তারা শিক্ষানীতির বাস্তব দিকগুলো ঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারবেন।
বর্তমান যুগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল রূপান্তর, বাজেট ও ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার দরকার। তাই কমিটিতে এমন সদস্য রাখা দরকার, যিনি আইটি, অ্যাকাউন্টিং বা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে দক্ষ।
নারীর অংশগ্রহণ শিক্ষা ও সচেতনতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। তাই নারী অভিভাবক বা নারী শিক্ষানুরাগীদের অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করা উচিত।
স্কুল পরিচালনা কমিটি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের ভিত্তি। এ কমিটিতে কারা থাকবেন, সেটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎ গঠনের কৌশল নির্ধারণের বিষয়। কাজেই এখানে ব্যক্তি পরিচয় নয়, যোগ্যতা, সততা ও শিক্ষানুরাগ হওয়া উচিত মূল বিবেচ্য।
একজন রাজনৈতিক নেতা হতে পারেন, যদি তিনি ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করতে পারেন। তিনি সরকারি কর্মকর্তা হতে পারেন, যদি তিনি কর্তৃত্ব নয়, বরং অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্বে বিশ্বাস করেন। আবার তিনি একজন সাধারণ অভিভাবক বা শিক্ষানুরাগীও হতে পারেন, যদি তাঁর অন্তরে শিক্ষার প্রতি নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ থাকে।
সর্বোপরি, স্কুল কমিটিতে এমন মানুষদেরই জায়গা দেওয়া উচিত—যাঁরা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীন কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। ব্যক্তি নয়, দৃষ্টিভঙ্গিই হোক যোগ্যতার মানদণ্ড।
রাজনীতিবিদের ছায়া সরানো শিক্ষকদের মুক্তির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এটি পুরো সমাধান নয়। প্রকৃত মুক্তি তখনই আসবে যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামো স্বচ্ছ, দক্ষ ও শিক্ষানুরাগী নেতৃত্বে পরিচালিত হবে। শিক্ষকরা স্বাধীনভাবে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারবে, দুর্নীতি ও অন্যায় হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকবে। তাই রাজনীতিমুক্ত কমিটি গঠন শুধু শুরু; এরপর যথাযথ মনিটরিং, জবাবদিহি ও শিক্ষকের মর্যাদা নিশ্চিত করাই হবে সফল শিক্ষাব্যবস্থার মূল চাবিকাঠি।
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও সাফল্য নির্ভর করে একটি সুদক্ষ এবং দায়িত্বশীল স্কুল কমিটির উপর। কমিটির সদস্য হিসেবে এমন যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচন করা উচিত যারা শিক্ষার প্রতি আন্তরিক, দূরদর্শী এবং প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নতির জন্য নিবেদিত। তিনি রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা বা শিক্ষানুরাগী যেই হোন না কেন, তাঁর প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সৃজনশীল ও নিরাপদ শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তোলা। স্বচ্ছতা, সততা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে কমিটির সদস্যরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সমাজের একটি আদর্শ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করবে।
লেখা: প্রধান সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা।
শিক্ষাবার্তা /এ/১৯/০৭/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
