এইমাত্র পাওয়া

ভুয়া নিয়োগে সয়লাব এলজিইডি

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শহরের সীমানা পর্যন্ত উন্নয়ন কর্মকা-ের দায়িত্বে। কিন্তু এ সংস্থাটির নিয়োগ প্রক্রিয়া অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। কারও চাকরির জন্য কোনো রকম নিয়োগ পরীক্ষার দরকার হয় না। প্রকল্পে অস্থায়ী চাকরি দিয়ে পরবর্তী সময়ে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর। এটি করতে গিয়ে এতটাই অনিয়ম হয়েছে যে, কৃষি বা অন্য বিষয়ে লেখাপড়া করা ব্যক্তিও এখন এলজিইডির সিভিল ইঞ্জিনিয়ার তথা সরকারের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা। এমন অসম্ভবকে সম্ভব করতে আত্মীয় হলে তো কথাই নেই। আর অর্থের জোর বা রাজনৈতিক প্রভাব থাকলেও একই কায়দায় চাকরি মেলে এলজিইডিতে।

Pause

Unmute
Remaining Time -10:12

Close PlayerUnibots.com
এর বিপরীতে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে যথাযথ নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বিপাকে। বর্তমানে কর্মকর্তাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। মামলার ফলে পদোন্নতি নেই। অযোগ্যদের পুনর্বাসনে সংস্থার কার্যক্রমে স্থবিরতা চলছে। এমন বাস্তবতায় উঠে এসেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটিতেও।

এ বিষয়ে জানতে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী আবদুর রশীদ মিয়ার সঙ্গে কয়েক দফা চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। তদন্ত কমিটির সদস্য ও এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, বিষয়টি অনেক জটিল। এ নিয়ে চার থেকে পাঁচটি মিটিং হয়েছে। নানা বিষয় উঠে এসেছে তদন্তে। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

জানা গেছে, কৃষিতে বিএসসি পাস করে ২০১১ সালে মুহাম্মদ নুরুন্নবী যোগ দেন এলজিইডিতে (জন্ম-১.১.১৯৬৮)। তিনি চাকরি পান সংস্থার সহকারী প্রকৌশলী (পুর) হিসেবে। একইভাবে আব্দুল মালেক ম-ল (জন্ম-১৮.৭.১৯৬৩), শিখা ব্যানার্জী (জন্ম-১.১.১৯৭০), আল আমিন সরকার (জন্ম-২০.১০.১৯৭০), কেএম রেজাউল করিম (জন্ম-১০.১.১৯৭৩) সহকারী প্রকৌশলী হয়েছেন পুরকৌশলে পড়াশোনা না করে। তাদের ব্যাপারে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- এলজিইডির নিয়োগ বিধিমালা, ২০০৯ অনুযায়ী সহকারী প্রকৌশলী (পুর) পদের জন্য পুরকৌশলে ¯œাতক ডিগ্রি দরকার। কিন্তু ২০১১ সালের ২৫ আগস্টের প্রজ্ঞাপনে নিয়মিত হওয়া ১০৯ জনের মধ্যে এই ৫ জনের সেই শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না।

সূত্রমতে, এলজিইডিতে চাকরির বড় যোগ্যতা আত্মীয়তার বন্ধন। নতুবা রাজনৈতিক প্রভাব বা টাকার জোর। মাহমুদুল আলম নামের সহকারী প্রকৌশলী এলজিইডিতে চাকরি পেয়েছেন তার বড় ভাই প্রকল্প পরিচালক নাজমুল আলমের মাধ্যমে। তাদের বাড়ি টাঙ্গাইলে। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আমিনুল ইসলামের সুবাদে তার স্ত্রী ফাতেমা সুলতানা শান্তা চাকরি পেয়েছিলেন এলজিইডিতে। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মঞ্জুর আলীর সহায়তায় তার স্ত্রী আয়েশা নূরীর চাকরি হয় সহকারী প্রকৌশলী পদে। খন্দকার মাহমুদুল আশরাফের চাকরি হয়েছে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শহীদুল হাসান প্রামাণিকের প্রভাবে। একই জোরে পরবর্তীতে চাকরি পান সালেহ হাসান প্রামাণিক। সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এনামুল হকের কল্যাণে তার ভায়রা শাহ মো. ওবায়দুর রহমান এলজিইডির প্রকৌশলী। আবার সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আলি আখতার হোসেনের ভাগ্নি জামাই হওয়ায় মো. হারুন অর রশিদ এখন এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী।

এ রকম অসংখ্য ব্যক্তি এলজিইডিতে দাপটের সঙ্গে চাকরি করছেন আত্মীয়তার জোরে। আর যাদের আত্মীয় নেই তারা রাজনৈতিক প্রভাব বা অর্থকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন। এভাবে অযোগ্যদের পুনর্বাসন করা হলেও তাদের দাপটে কোণঠাসা যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিয়োগপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা। অন্যদিকে প্রকল্পের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্তরা চান জ্যেষ্ঠতার স্বীকৃতি। শুধু তাই নয়, তারা এখন বৈধদের নিয়োগ বাতিলের জন্য তদবির করে যাচ্ছেন। তাদের যুক্তি- বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে যারা চাকরিতে এসেছেন তারা অবৈধ। কারণ দীর্ঘদিন বিজ্ঞপ্তির অভাবে নাকি বাকিরা নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। মানে নকলের ভিড়ে আসলরা চাপে আছেন। যদিও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে সব ধরা পড়ে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধিমালা অনুযায়ী, প্রকল্পের কোনো কর্মচারীকে ভূতাপেক্ষ তারিখ থেকে নিয়মিতকরণের সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জ্যেষ্ঠতার বিষয়টি জড়িত থাকায় ভূতাপেক্ষ তারিখ থেকে জ্যেষ্ঠতা গণনারও সুযোগ নেই।

জানা গেছে, এলজিইডিতে ২৫৭ জন প্রকৌশলীর চাকরি উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর, চাকরি নিয়মিতকরণ ও পদোন্নতিতে নানা অনিয়ম হয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে পাশ কাটানো হয়েছে সব বিধিবিধান। আইনগত সুযোগ না থাকলেও দেওয়া হয়েছে পদোন্নতি। এসব প্রকৌশলীর নিয়োগ-পদোন্নতি নিয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠিত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বিষয়গুলো উঠে এসেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহবুব-উল-আলম, স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. ওয়াহেদুর রহমান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ শামীম সোহেল, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. রায়হান আখতার, এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব এলিশ শরমিন তদন্ত কমিটির দায়িত্বে ছিলেন। আট পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে কীভাবে এলজিইডিতে নিয়োগের নামে অনিয়ম হয়েছে। জ্যেষ্ঠতা নিয়ে সমস্যার সূত্রপাত, যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ না মানার নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে- উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ২০১০ সালে ১৩১ জন, ২০১১ সালে ১০৯ জন এবং ২০১৩ সালে ১৭ জনকে এলজিইডির রাজস্ব খাতভুক্ত সহকারী প্রকৌশলী (পুর) পদে স্থানান্তর করা হয়।

তদন্তে দেখা গেছে, রাজস্ব খাতে স্থানান্তরে অর্থ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মতি গ্রহণের আবশ্যকতা থাকলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) সুপারিশ বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই ২৫৭ জন প্রকৌশলীর ক্ষেত্রে পিএসসিরও সুপারিশ নেওয়া হয়নি। নির্ধারিত প্রক্রিয়া ও বিধি অনুসরণ না করেই এই প্রকৌশলীদের রাজস্ব খাতে পদায়ন ও নিয়মিত করা হয়। কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভূতাপেক্ষ তারিখে নিয়মিত করার সুযোগ না থাকায় সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে এই প্রকৌশলীদের নিয়মিতকরণের আদেশ জারির বিধিগত প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জ্যেষ্ঠতা তালিকায় অবস্থান নির্ধারণ না করে ২৫৭ জন প্রকৌশলীকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এতে ২০০৮ সালের পরে পিএসসির মাধ্যমে এলজিইডিতে নিয়োগ পাওয়া সহকারী প্রকৌশলীরা প্রাপ্য পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নিয়মিতকরণ বিধিমালা অনুযায়ী, উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে নিয়মিত করতে হলে চাকরির ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। ২৫৭ জন প্রকৌশলীকে রাজস্ব খাতভুক্ত করার প্রজ্ঞাপনে দেখা যায়, তাদের মধ্যে ৩৬ জনের চাকরির ধারাবাহিকতা ছিল না। অর্থাৎ তারা সে সময় কর্মরত ছিলেন না।

প্রতিবদনে আরও বলা হয়েছে- প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলীদের চাকরি রাজস্ব খাতে নিয়মিতকরণের জন্য পরামর্শ চাওয়া হয় পিএসসির কাছে। ২০১০ সালে চারটি পৃথক চিঠিতে মতামত চাওয়া হয়। এর জবাবে ওই বছর ৫ সেপ্টেম্বর পিএসসি বলেছিল, মামলার রায়ের আলোকে প্রথমে তাদের রাজস্ব খাতের পদে ‘অ্যাবজর্ব’ করতে হবে। এরপর তাদের চাকরি নিয়মিতরণের জন্য অ্যাবজর্ব তথা রাজস্ব খাতের পদে পদায়নের আদেশসহ প্রস্তাব কমিশনে পাঠানোর কথা। কিন্তু তা না করে নিয়মবহির্ভূতভাবে তাদের রাজস্ব খাতে পদায়ন ও নিয়মিতকরণ করে।

কমিটি জানিয়েছে- চাকরি নিয়মিতকরণ ও জ্যেষ্ঠতা গণনার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের বিধিমালা অনুসরণ করা হয়নি। নিয়মিতকরণ যথাযথভাবে না হওয়ায় তাদের জ্যেষ্ঠতা গণনারও সুযোগ নেই। এমনকি তাদের সপ্তম গ্রেডে সিলেকশন গ্রেড দেওয়া ও ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়ার আইনগত সুযোগ ছিল না। তাদের যে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, সেটি আইনসম্মত হয়নি।

 

শিক্ষাবার্তা /এ/০৯/০৭/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading