কুড়িগ্রামঃ তিন বছর ধরে অটিস্টিক মেয়েকে স্থানীয় স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য সংগ্রাম চলিয়ে যান রিক্তা আক্তার বানু। ক্রমাগত প্রত্যাখ্যানের পর একসময় নিজই স্কুল তৈরির সিদ্ধান্ত নেন।
শুরুটা হয়েছিল ২০০৭ সালে, যখন বৃষ্টি মনির লেখাপড়া শুরু করার কথা ছিল। বৃষ্টির বয়স এখন ২৩। সেরিব্রাল পলসিতে ভোগা এই মেয়েকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
রিক্তা বলেন, ২০০৭ সালে আমি যখন প্রথম বৃষ্টি মনিকে ভর্তি করার চেষ্টা করি, তখন আমাকে বলা হয়েছিল, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের সাধারণ বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয় না। কিন্তু বৃষ্টি স্কুলে যাওয়ার জন্য খুব আগ্রহী ছিল। পরের বছর আমি আবার চেষ্টা করি, কিন্তু আবারও আমার চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
এরপর তিনি ঢাকায় গিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গিয়ে জানতে পারেন, প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচজন প্রতিবন্ধী শিশু ভর্তির জন্য কোটা রয়েছে। তিনি আবার স্থানীয় স্কুলে গিয়ে এই কোটা সম্পর্কে জানান।
সরকারি নিয়ম সত্ত্বেও স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতিবন্ধী শিশুদের যত্ন নেওয়ার প্রয়োজনীয় রসদ এবং মানবসম্পদ নেই। রিক্তাকে তার মেয়ের জন্য একজন পরিচারক রাখার জন্য অনুরোধ করা হয়। কিছুদিন বৃষ্টির এক শিক্ষার্থী বন্ধু সাহায্য করলেও ব্যবস্থা টেকসই হয়নি।
২০০৯ সালে রিক্তা বানু নিজের মতো করে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা শুরু করেন। তিনি বলেন, আমি হাল ছাড়তে প্রস্তুত ছিলাম না।
‘আমার স্বামী স্কুলটি তৈরির জন্য পৈতৃক এক টুকরো জমি দান করেছেন। নির্মাণকাজে সাহায্য করার জন্য, আমি আমার বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এক টুকরো জমি বিক্রি করি। সব মিলিয়ে স্কুলটি তৈরি করতে আমার প্রায় ৮ হাজার ডলার খরচ হয়েছে।’
২০১০ সালে কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারীর রিক্তা বানু লার্নিং ডিজঅ্যাবিলিটি স্কুলের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের নিয়ে যাত্রা শুরু করেন।
প্রাথমিকভাবে অটিস্টিক বা শেখার অক্ষমতা রয়েছে – এমন শিশুদের জন্য নির্মিত হলে, সেখানে এখন বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ৩০০ শিক্ষার্থী রয়েছে।
‘আমরা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, খেলাধুলা, গান, সেলাই এবং আরও অনেক কিছু শেখাই। উপরন্তু, আমরা তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, খাবার এবং অন্যান্য সেবাও প্রদান করি। আমরা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা দিচ্ছি।’
রিক্তা বানু বলছিলেন, আমাদের স্কুলটি সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত এবং আমাদের পাঠ্যক্রমটিও কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত। আমাদের স্কুলে মোট ২১ জন শিক্ষক এবং সাপোর্ট স্টাফ কাজ করেন। তাদের বেতনের একটি অংশ সরকার দিয়ে থাকে।
প্রায় ৪৩ লাখ বাংলাদেশি বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বসবাস করছে। তাদের ৫০ শতাংশের বেশি কোনো ধরনের শিক্ষা পায়নি।
২০২১ সালের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে মাত্র ২৩ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করেছে।
রিক্তা বানু তার স্কুলের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। প্রতিষ্ঠানটি চালাতে তার খরচ হয় প্রায় আড়াই হাজার ডলার। সরকারি সহায়তা সীমিত হওয়ায় এই অর্থের বেশিরভাগই আসে তার নিজের সঞ্চয়, শিক্ষকদের অনুদান এবং বাইরের দাতাদের কাছ থেকে।
তিনি বলেন, আমি স্বপ্ন দেখি এমন একটি স্কুল পরিচালনা করার, যেখানে সব প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য আবাসিক ব্যবস্থা থাকবে, যাতে দূর-দূরান্তের শিশুরা এখানে ভর্তি হতে পারে। অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা এসব শিশুকে বাড়িতে লুকিয়ে রাখেন। আমার স্বপ্ন এই শিশুরা এখানে থাকাকালীন শিক্ষা ও জীবন দক্ষতা অর্জন করবে এবং মর্যাদার সাথে জীবিকার ভালো সুযোগ খুঁজে পাবে।
রিক্তা বলেন, আমি আশা করি এই স্কুলের সুনাম সারা দেশে এবং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে আরও অনেকেই প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার সুযোগকে সমর্থন করতে এগিয়ে আসবে। প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রয়োজন সহযোগিতা ও সমর্থন; সহানুভূতি নয়।
বাংলাদেশের বৃহত্তম উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও অভিবাসন বিষয়ক পরিচালক সাফি রহমান খান বলেন, রিক্তার কাজ কেবল প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষাই দেয়নি, বরং সম্প্রদায়ের মধ্যে ধারণাও পরিবর্তন করেছে। বৃহত্তর গ্রহণযোগ্যতা এবং বোঝাপড়াকে উত্সাহিত করেছে। তার স্কুল সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে। স্থানীয় পদ্ধতিগত চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে মোকাবেলা করা যেতে পারে, এটি তার প্রতিফলন।
তিনি বলেন, রিক্তার মতো মানুষদের সমর্থন করে আমরা এমন একটি ভবিষ্যত তৈরি করতে পারি, যেখানে কোনো শিশু পেছনে পড়ে থাকবে না এবং প্রতিটি ব্যক্তি আরও ন্যায়সঙ্গত ও সহানুভূতিশীল সমাজে অবদান রাখতে পারে।
প্রসঙ্গত, রিক্তা আক্তার বানু বিবিসির ২০২৪ সালের ১০০ অনুপ্রেরণাদায়ী নারীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন। তিনি ২০১০ সালে কুড়িগ্রামে ‘রিক্তা আক্তার বানু লার্নিং ডিজঅ্যাবিলিটি স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/০১/০১/২০২৫
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
