নিজস্ব প্রতিবেদক।। অপরিহার্য নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হু হু করে বাড়ছে জরুরি প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম। প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো ওষুধের দাম বাড়ছে। ওষুধের দাম বাড়ার দৌড়ে পেরে উঠছেন না সাধারণ মানুষ।
ভুক্তভোগী রোগী ও তাদের স্বজনরা বলছেন, আর্থিক সংকটে অনেককে দরকারি ওষুধও কাটছাঁট করে কিনতে হচ্ছে। এতে যে রোগের জন্য রোগী ওষুধ নিচ্ছেন সেটিরও কোনো সুফল মিলছে না।
এর মধ্যে গত কয়েক দিনেও অস্ত্রোপচার-পরবর্তী ব্যথানাশক ওষুধ, ভিটামিন, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, চর্ম ও প্রদাহজনিত বেশ কিছু ওষুধের দাম ৬ থেকে ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফার্মেসিতে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
আর দাম বাড়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে ঔষধ প্রশাসন কর্তৃপক্ষ। তবে ফার্মেসি মালিক ও ভোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২০ সালের পর থেকে গত চার বছরে দেশীয় ও আমদানি-নির্ভর প্রায় ৯০ শতাংশ ওষুধের দাম বেড়েছে। আর ব্যবসায়ীরা বিশ্ববাজারে ডলারের সংকট, উৎপাদন ব্যয়, প্যাকেজিং মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয়, কাঁচামাল আমদানি ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির দোহাই দিয়ে বাড়তি দাম চাপিয়ে দিচ্ছে ক্রেতা বা রোগীর ওপর।
কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর এ ক্ষেত্রে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। যদিও ঔষধ শিল্প সমিতির নেতারা বলছেন, ওষুধের দাম বাড়েনি, কিছু কিছু ওষুধের দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওষুধ উৎপাদনে দেশ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। মাত্র ২ শতাংশ ওষুধ আমদানি করতে হয়, সে অবস্থায় দেশীয় উৎপাদিত ওষুধের দামও কেন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ ওষুধের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের সক্ষমতায় ঘাটতি রয়েছে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের। কারণ দাম বাড়লে দরিদ্র, অতিদরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবে। চিকিৎসা বৈষম্য আরও বাড়বে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, দেশে ১১৭টি ওষুধের দাম নির্ধারণ করে থাকে সরকার। অথচ দেশে দেড় হাজারের বেশি এসেনসিয়াল ড্রাগসের (জীবনরক্ষাকারী ওষুধ) ২৭ হাজারেরও বেশি ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদন করা হয়। বাকি ব্র্যান্ডের দাম প্রস্তুতকারী কোম্পানি নির্ধারণ করে।
শুক্রবার সরেজমিন রাজধানীর মিটফোর্ড, বংশাল, নাজিরাবাজার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা এবং শাহবাগের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার একাধিক ফার্মেসি ঘুরে বিভিন্ন ওষুধের দাম বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে ভিটামিনের ঘাটতি পূরণে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের সুপ্রাভিট-জি ট্যাবলেট ১০টির দাম ২১০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩০০ টাকা। দাম বেড়েছে ৪২ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
এসিআই লিমিটেডের ব্যথানাশক ফেবুস ৪০ মিলিগ্রামের ৩০টির প্রতি বক্সের দাম ৩৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৪৫০ টাকা হয়েছে। দাম বেড়েছে ২৫ শতাংশ।
সার্ভিয়ার বাংলাদেশ অপারেশন কোম্পানির হৃদরোগের চিকিৎসায় ভাসটারেল এম আর ৩৫ মিলিগ্রামের ট্যাবলেট ৩০টির দাম ৫৪০ টাকা থেকে বেড়ে ৭২০ টাকা হয়েছে। দাম বেড়েছে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। একই কোম্পানির উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় ন্যাট্রিলিক্স এসআর ১.৫ মিলিগ্রামের এক বক্সের দাম ২৭০ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৩৩০ টাকায়, দাম বেড়েছে ২২ দশমিক ২২ শতাংশ। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসির অ্যালাট্রোল ৬০ এমএলের সিরাপ ৩০ টাকা থেকে ৩৫ টাকা করা হয়েছে। দাম বেড়েছে ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যালস ঘন ঘন প্রস্রাবজনিত সমস্যায় ইউট্রোবিন সলিফেনাসিন সাকসিনেট ৫ মিলি গ্রামের ট্যাবলেট ৩০টির দাম ৪৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম বেড়েছে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এ ছাড়াও পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের এলার্জিজনিত সমস্যায় ব্যবহৃত বিলাস্টিন ২০ মিলিগ্রামের ৩০টির দাম ৪৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৮০ টাকা। দাম বেড়েছে ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
রাজধানীর বংশাল এলাকার বাসিন্দা হামিদুজ্জামান উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তিনি জানান, দুই বছর আগেও ডায়াবেটিস ও অন্যান্য রোগে প্রতি মাসে তার তিন-চার হাজার টাকার ওষুধ খেতে হতো। এখন লাগছে ৬-৭ হাজার। চাল-ডাল কিনতে নাভিশ্বাস ওঠা হামিদুজ্জামান কী করবেন, দিশা পাচ্ছেন না। একই অবস্থা রাজধানীর ছিদ্দিক বাজারের বাসিন্দা সৈকত হোসেনের। প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি ওষুধ কিনতে পারছেন না এবং কাটছাঁট করে ওষুধ খাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
রাজধানীর আনন্দবাজার এলাকার সার্জিক্যাল মেডিসিন ওষুধের দোকানের কর্মচারী হীরা রহমান বলেন, বাজারে চলতি বছরে সবেচেয়ে বেশি বেড়েছে ভিটামিনজাতীয় ট্যাবলেট ও বিভিন্ন ইনজেকশনের দাম। আমাদেরও পরিবারের জন্য ওষুধ কিনতে হয়। সুতরাং, দাম বাড়লে ওষুধ বিক্রিতে আমাদেরও নানা ধরনের কৈফিয়ত দিতে হয় এবং অনেক সময় ঝামেলায় পড়তে হয়।
শাহবাগ বিপণি বিতান মার্কেটের নাজ ফার্মার দোকানি কমল সরকার বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক, গ্যাস্ট্রিক, ভিটামিনসহ অনেক ওষুধেরই দাম বেড়েছে। কোনটা রেখে কোনটার নাম বলব।
প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ওষুধের দাম বাড়ছে। এমনও দেখা গেছে ওষুধের যে মূল্য দেওয়া আছে তার চেয়ে কম দামে বিক্রি করছি।
শাহবাগের বিপণি বিতান এলাকার খান ফার্মেসির দোকানি পরেশ মজুমদার বলেন, শুধু ওষুধ নয়, সবকিছুর দামই তো বাড়ছে। তবে কিছু ওষুধের দাম খুব বেশি বেড়েছে। কিন্তু আমাদের মতো খুচরা বিক্রেতাদের লাভ সীমিত, প্যাকেটের গায়ে যে দাম লেখা থাকে তার চেয়ে বেশি আমরা নিতে পারি না। কোম্পানির যে রেট দেওয়া থাকে আমরা সেই দামেই বিক্রি করি।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট চিকিৎসাবিজ্ঞানী এবং জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী বলেন, বর্তমানে সার্বিক স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়, বরাদ্দ ও পরিকল্পনা একেবারেই অপ্রতুল। আবার ওষুধের দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের ওপর এক ধরনের প্রভাব পড়ে। বাজারে কোম্পানিগুলো মধ্যে দাম বাড়াতে এক ধরনের অনৈতিক প্রতিযোগিতা চলছে।
যদিও ডলার সংকটসহ নানা ধরনের খরচ বাড়ছে। কিন্তু তারপরও ওষুধের দাম যে হারে বেড়েছে তা কতটুকু যৌক্তিত সেই প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের যে ওষুধনীতি রয়েছে তা কার্যকর হয়নি। গুণগত মানসম্মত ওষুধ নিশ্চিত করার কথা থাকলেও তা হয়ে ওঠেনি। তাই দাম নির্ধারণে সবাইকে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। এ জন্য আইন প্রয়োগও লাগবে, মানুষকেও সচেতন হতে হবে এবং সবাইকে একটা সিস্টেমের মধ্যে আনতে হবে। এ জন্য উৎপাদক, নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং ফার্মেসি মালিকদের উদ্যোগী হতে হবে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক মো. আসরাফ হোসেন বলেন, বিগত কয়েক মাসে বেশ কিছু ওষুধের দাম বেড়েছে ৫ থেকে ৭ শতাংশ। দাম বাড়ানো বললে ভুল হবে, আসলে দামটা সমন্বয় করা হয়েছে। আবার একই ওষুধ বিভিন্ন কোম্পানি বিভিন্ন নামে বিক্রি করে। দামেরও পার্থক্য হয়। কোম্পানি দাম বাড়ানোর আবেদন করলে তখন আইনগতভাবেই অনুমতি দেওয়া হয়।
শিক্ষাবার্তা /এ/০৭/১২/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
