সুভাষ বিশ্বাস, নিজস্ব প্রতিবেদক: মোঃ নুরুল ইসলাম, রংপুরের পীরগাছা নটাবাড়ী দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন নৈশ প্রহরী। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিনা বেতনে (নন-এমপিও) পদে স্কুলটিতে দীর্ঘ প্রায় ২৩ বছর কর্মরত ছিলেন। ২০২২ সালে বিদ্যালয়টি থেকে তাকে মারধর করে বের করে দেওয়া হয়। তাকে বের করে দেন পতিত আওয়ামী সরকারের সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সীর একান্ত আস্তাভাজন স্কুলটির প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর কবির সরকার ও তার লোকজন। কারণ হিসেবে তাকে বলা হয় তৎকালীন সময়ে তার নিয়োগ অবৈধ। তাকে বের করে দেওয়ার পর ২০২৩ সালে নৈশ প্রহরী পদে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয় সবুজ মিয়া নামের ব্যক্তিকে এবং এমপিওভুক্ত করানো হয়। ২৩ বছর বিনা বেতনে কর্মরত থাকা নুরুল ইসলাম ধার দেনা করে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছেন, মৌখিকভাবে তবে ফিরতে পারেননি বিদ্যালয়টিতে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে নটাবাড়ী দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে একই সাথে ১২ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ পান। ২০০১ সালে স্কুলটির নিন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে এমপিওভুক্ত হয়। কিন্তু এমপিওভুক্ত হতে পারেননি নুরুল ইসলাম। ১৯৯৫ সালের এমপিও নীতিমালা ও জনবল কাঠামো অনুযায়ী, নিন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নৈশ প্রহরী পদ না থাকায় তার এমপিও হয়নি। তবে চাকরি ছাড়েননি তিনি। এমপিও নীতিমালা সংশোধনী হলে কোন একদিন তার চাকরি নিয়মিত হবার আশায় কাজ করে গেছেন স্বার্থহীনভাবে। সর্বশেষ ২০২১ সালের এমপিও নীতিমালা ও জনবল কাঠামো জারি হলে সেখানে নিন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নৈশ প্রহরী পদ সৃজন হয়। এই নীতিমালা অনুযায়ী, নতুন সৃষ্টি কোন পদে পূর্বে নিয়োগ প্রদান করা হলে তা সমন্বয়ের পর অবশিষ্ট পদে নিয়োগ প্রদান করার বিধি রাখা হয়। সে অনুযায়ী নুরুল ইসলামের এমপিও পাবেন বলে যোগ্য বিবেচিত হয়। কিন্তু ২০১৯ সালে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পাওয়া বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক জাহাঙ্গীর কবির সরকার তাকে এই পদে এমপিও’র ফাইল না পাঠিয়ে কালক্ষেপণ করতে থাকেন এবং নতুন নিয়োগ দেওয়ার পায়তারা করে ২০২২ সালে তাকে মারধর করে বের করে দিয়ে এই পদে নতুন নিয়োগ দেন। এলাকাবাসী ও স্কুলটির কর্মরত শিক্ষকদের অভিযোগ গোপনে এই পদে নিয়োগ দিয়ে অন্তত ১২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন প্রধান শিক্ষক।
শিক্ষাবার্তা’র হাতে নুরুল ইসলামের নিয়োগ পত্র, বিভিন্ন সময়ে করা বিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মচারীদের তথ্য, ২০১৩ সালে থেকে বেনবেইসের হালনাগাদ শিক্ষক-কর্মচারী তথ্য, নিয়োগের সময় প্রদত্ত শিক্ষক-কর্মচারীর তথ্য বিররনীতে এবং প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীরের ২০১৯ সালে স্বাক্ষরিত বিদ্যালয়টির শিক্ষক কর্মচারীদের তথ্য বিবরণীতে নুরুল ইসলাম নৈশ প্রহরী বলে নাম রয়েছে। অথচ এই পদে নতুন নিয়োগ প্রদানের আগে প্রধান শিক্ষকের করা অঙ্গীকারনামায় পূর্বে এই পদে কেউ ছিল বলে উল্লেখ করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অতি গোপনে ২০২১ সালে ১৪ ডিসেম্বর ইং তারিখে প্রধান শিক্ষক তার আপন শ্বশুর মোঃ শামছুল হককে সমাজ সেবক দেখিয়ে সভাপতি করে এবং পরিবারের লোকজনের সমন্বয়ে বিদ্যালয়টির পারিবারিক ম্যানেজিং কমিটি গঠন করে যা এলাকাবাসী এমনকি বিদ্যালয়টির অভিভাবক ও অন্যান্য শিক্ষকরা পর্যন্ত জানতে পারেনি। এই গোপন কমিটির মাধ্যমেই নুরুল ইসলাম পদে পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর সবুজ মিয়াকে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে নিয়োগ প্রদান করা হয়। নিয়োগ পাওয়ার পর এমপিওভুক্ত করানোর ২ মাস পর এই নিয়োগ সম্পর্কে জানতে পারেন বিদ্যালয়টির শিক্ষকরা। এছাড়াও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী পদে আরও ৩ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কাগজপত্র যাচাই করে দেখা যায় যে, এর মধ্যে একজন আবু রাইহান, বিদ্যালয়ের আরেক সহকারী শিক্ষক ও বারবার শিক্ষক প্রতিনিধি হওয়া প্রধান শিক্ষকের ফুফা শশুর মোঃ আব্দুল গনী মিয়ার সন্তান। আয়া পদে নিয়োগ প্রাপ্ত মোছাঃ মাজেদা খাতুন প্রধান শিক্ষকের শ্যালকের সহধর্মিনী। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী ৩ জনই একই পরিবারের সদস্য এবং এই নিয়োগে সভাপতির মেয়ে পিতার নাম পরিবর্তন করে অংশগ্রহণ করেন। ।
প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর বিদ্যালয়টির ৮ জন সহকারী শিক্ষক ও ২ জন কর্মচারী সেপ্টেম্বর মাসে দুই ও ১১ তারিখে দুইটি লিখিত অভিযোগ করেন। লিখিত অভিযোগে বৈধ কর্মচারী নুরুল ইসলামকে বাদ দিয়ে সবুজ মিয়াকে নিয়োগ প্রদান, স্কুল ফান্ডের অর্থ আত্মসাৎ, উপবৃত্তির অর্থ আত্মসাৎ, প্রধান শিক্ষকের অদক্ষতায় এসএসসির ফলাফল বিপর্যয়, গোপনে কমিটি গঠন, শিক্ষকদের নিকট থেকে কম্পিউটার কেনার কথা বলে ১৫ হাজার করে টাকা নেওয়া এবং তা ক্রয় না করা, সরকারি বই বিক্রি করাসহ একাধিক অভিযোগ ও প্রমাণকসহ ইউএনওর বরাবর জমা প্রদান করেন। প্রমাণগুলো শিক্ষাবার্তা’র হাতে রয়েছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইউএনও ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ইং তারিখে প্রধান শিক্ষককে শোকজ করেন এবং ১০ কর্মদিবসের মধ্যে জবাব দাখিল করেন। প্রধান শিক্ষক ২৯ সেপ্টেম্বর জবাব প্রদান করে এবং সেই জবাব মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন এবং সন্তোষজনক না হয়ায় চলতি মাসের তিন তারিখে উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজমুল হক সুমন স্বাক্ষরিত তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। উপজেলা কৃষি অফিসারকে আহ্বায়ক করে এবং উপজেলা সমাজসেবা অফিসার ও সকারী প্রকৌশলী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, পীরগাছাকে সদস্য করা হয়। এই তদন্তের কাজ এখনও শুরু হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদন নিজের পক্ষে নিতে প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন ব্যক্তির নিকট মোটা অংকের অর্থ নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়াও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ সুজা মিয়া প্রধান শিক্ষককে সহযোগিতা করছেন বলে অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মোঃ আমিনুল ইসলাম অভিযোগ করেন।
প্রধান শিক্ষক তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করার জন্য নানাভাবে প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন বলে জানিয়ে বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক সাইফুর রহমান জানান যে, শিক্ষকদের ভয় ভীতি দেখানোসহ এই এলাকার একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তার নিজ অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত একটি মাদ্রাসাকে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখিয়ে এবং সহকারী শিক্ষকদের নাম ভাঙ্গিয়ে বিভিন্ন প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তদন্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন প্রধান শিক্ষক।
এদিকে বঞ্চিত নৈশ প্রহরী নুরুল ইসলাম ৬ অক্টোবর ২০২৪ ইং তারিখে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর অবৈধভাবে সবুজ মিয়াকে নিয়োগ প্রদান করে করা এমপিওভুক্তি বাতিল এবং তাকে এমপিওভুক্তির জন্য লিখিত আবেদন করেছেন। সেই আবেদনের প্রেক্ষিত গত ২১ অক্টোবর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের বেসরকারি মাধ্যমিক শাখার শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ নাজিম উদ্দিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে রংপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এই তদন্তের কার্যক্রম এখনও শুরু করেননি জেলা শিক্ষা অফিস।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর কবির সরকার শিক্ষাবার্তা’কে, তার কোন নিয়োগ ছিলনা। আমি ২০১৯ সালে এই বিদ্যালয়ে যোগ দান করি পূর্বের প্রধান শিক্ষক তার সাথে কি দফারফা করেছে আমি জানিনা, শুনেছিলাম শুধু। নিয়ম মেনেই নৈশ প্রহরী নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ রফিকুল ইসলাম জানান, কাগজগুলো আমি পড়ে বোঝার চেষ্টা করছি এখনো ভালোভাবে দেখা হয়নি আগে দেখে নেই তারপরে জানাবো।
‘উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সৈয়দ সুজা মিঞা মুঠোফোনে কল না ধরায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে রংপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ এনায়েত হোসেন শিক্ষাবার্তা’কে জানান, ডিজি অফিস থেকে তদন্ত দিয়েছে আমরা তদন্ত করব। এখনো চিঠি দেয়া হয়নি।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/২৬/১০/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
