ঢাকাঃ ছেলেমেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করতে চেয়েছিলেন কুরমান শেখ। নিজে পড়াশোনা করতে না পারলেও দুই ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করে এক দিন অনেক বড় হবে সেই স্বপ্ন দেখতেন। এ জন্য তাদের লেখাপড়ায় যখন যা প্রয়োজন, ব্যবস্থা করে দিতেন সব নিজের শ্রম আর ঘামের টাকায়। মুরগির ব্যবসা থেকেই চলত সব খরচ। আর কয়েক বছর পরই স্নাতক শেষ হতো ছেলেমেয়ের।
তবে মাঝপথেই সব থমকে গেছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে সৃষ্ট সহিংসতায় গত ২০ জুলাই ঢাকার সাভারে গুলিতে নিহত হন শারীরিক প্রতিবন্ধী এই ব্যবসায়ী। দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ হন তিনি।
কুরমান শেখ রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের মৃত মেহের শেখের ছেলে। সাভারের স্মরণিকায় স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি। স্ত্রী শিল্পী বেগমের এখন কান্নাই যেন সম্বল। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ছেলেমেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করার স্বপ্ন ছিল মানুষটার। কী চাইল আর কী হয়ে গেল। আমার এখন কী হবে? ছেলেমেয়েকে পড়াশোনা করাব কেমন করে। থাকবই বা কোথায়? সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘মিছিল-মিটিংয়ে গিয়ে মারা গেলে নিজেকে বুঝ দিতে পারতাম। এভাবে কেন মারল আমার স্বামীকে?’
পারিবারিক সূত্র জানায়, ছয় ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন কুরমান শেখ। ২০ বছর আগে জীবিকার তাগিদে ঢাকার সাভারে যান তিনি। সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মুরগির ব্যবসা করতেন। পাশেই তাঁর সহোদর মোতালেব শেখ কাঁচামালের ব্যবসা করেন। ছেলে রমজান শেখ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকপ্রশাসন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। মেয়ে মিতু আক্তার ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। স্বামীর মৃত্যুর পর শিল্পী বেগম দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে কালুখালীর রতনদিয়ায় কুরমান শেখের বড় ভাই সাত্তার শেখের বাড়িতে বসবাস করছেন। সেখানেই কথা হয় শোকাহত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। পরিবারের কেউই শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। কান্না থামছে না কারও। কে কাকে দেবে সান্ত্বনা।
মেয়ে মিতু আক্তার বলেন, ঘটনার দিন দুপুর ১টার কিছু আগে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ পেয়ে বাবাকে ফোন করে তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসতে বলি। হ্যাঁ মা, আমি এখনই আসছি বলেই বাবা ফোন রেখে দেন। কিছুক্ষণ পরই খবর পাই, বাবার গুলি লেগেছে। বাবার মৃত্যুতে পৃথিবীটা শূন্য মনে হচ্ছে। তাঁকে ছাড়া আমরা একটি দিনও কল্পনা করতে পারি না।
ছেলে রমজান শেখ জানান, তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। সাভার থেকে বাসে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করতেন। ঈদের পর আর বিশ্ববিদ্যালয় না খোলায় বাসাতেই ছিলেন। ঘটনার দিন দুপুর দেড়টার দিকে খবর পান, তাঁর বাবার গুলি লেগেছে। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যান। গিয়ে দেখেন বাবার নিথর দেহ পড়ে আছে। তাঁর গলায় ও পায়ে গুলি লেগেছে। শরীরে অসংখ্য ছররা গুলির চিহ্ন। কেউ কেউ বলেন, তাঁর বাবা মারা গেছেন। তবে শরীর তখনও গরম ছিল। এ জন্য তিনি কাছের একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানকার চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানালে এনাম মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা তাঁর বাবাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, গোলাগুলি দেখে তাঁর বাবা দোকান বন্ধ করে বাড়িতে আসছিলেন। অবস্থা খারাপ দেখে একটি বরফকলে আশ্রয় নেন। সেখানে আরও লোক ছিলেন। পুলিশ সেখানে ঢুকে গুলি করে।
কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, বাবা আমাকে কখনও ধমক পর্যন্ত দেননি। আমাকে বলতেন, অনেক বড় হতে হবে।
কুরমান শেখের বড় ভাই সাত্তার শেখ বলেন, কুরমান ছোটবেলায় সাঁকো থেকে পড়ে আহত হন। তার পর থেকে ভালোভাবে হাঁটতে পারেন না। আগের দিন শুক্রবারও সে ফোন করে মা-ভাইদের খোঁজ নিয়েছিল। পড়ে গিয়ে আমাদের বৃদ্ধ মায়ের পা ভেঙে গেছে। অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে। বিধাতার কী নির্মম পরিহাস, যেদিন মাকে অস্ত্রোপচার করিয়ে বাড়ি নিয়ে আসলাম, সেদিনই অ্যাম্বুলেন্সে এলো ভাইয়ের লাশ। তাঁর পরিবারটি গভীর সমুদ্রে পড়েছে। বড় ভাই হিসেবে যতটা পারি সহযোগিতা করব। সমকাল
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/২৯/০৭/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
