নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) নির্দেশনার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নও তার কাজ। এ সপ্তাহে চালু হওয়া নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে এখন বেশ বিভ্রান্তিতে রয়েছেন এ শিক্ষক।
শিক্ষকরা ‘বিষয়টি পুরোপুরি বুঝতে পারছি না। বলা হচ্ছে লিখিত অংশে ৬৫ শতাংশ নম্বর থাকবে। প্রশ্ন দেয়া হয়েছে, সেখানে নম্বর বণ্টন করা নেই। শিক্ষকরা বলেন এখন আমি কোন প্রশ্নের পূর্ণমান কত নির্ধারণ করব এবং মূল্যায়নইবা কীভাবে করব? এখানে আমাদের বলা হয়েছে প্রতিটি প্রশ্ন বা কাজের জন্য তিনটি নির্দেশকে মূল্যায়ন করতে। যেমন কোনো প্রশ্ন বা কাজে পারফরম্যান্স একেবারেই খারাপ হলে সেটিকে ‘চেষ্টা’, যেখানে কিছু সঠিক ও কিছু ভুল সেটিকে ‘আংশিক পারদর্শী’ এবং সম্পূর্ণ সঠিকভাবে কাজ শেষ করতে পারা প্রশ্নের উত্তরকে ‘কার্যকরী’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হবে। ধরা যাক, ষষ্ঠ শ্রেণীর বাংলা বিষয়ের প্রশ্নে এক জায়গায় শিক্ষার্থীদের পাঁচটি যতিচিহ্নের সঠিক ব্যবহার দেখাতে বলা হয়েছে। এখন যে শিক্ষার্থী দুটি যতিচিহ্নের সঠিক ব্যবহার দেখাতে পেরেছে আর যে চারটির সঠিক ব্যবহার দেখাতে পেরেছে; দুজনকেই আমি ‘আংশিক পারদর্শী’ হিসেবে সমানভাবে মূল্যায়ন করব কিনা? এসব ক্ষেত্রে নির্দেশকগুলোর সীমা কতটুকু, সেটি সুস্পষ্ট নয়।’
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে এ প্রশ্ন এখন প্রায় সব শিক্ষকের। বিভ্রান্তিতে আছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরাও।
মূল্যায়ন পদ্ধতির বারবার পরিবর্তন শিক্ষা ব্যবস্থায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির কো-চেয়ারম্যান এবং ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদ বলেন, ‘এ শিক্ষাক্রম যেভাবে তৈরি করা হয়েছে সেটি অত্যন্ত ইতিবাচক এবং এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রকৃতপক্ষেই শিখতে পারবে। তবে মূল্যায়ন পদ্ধতি আরো আগেই চূড়ান্ত করে সেটি নিয়ে কাজ করা উচিত ছিল। অন্যথায় বারবার মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে এবং সংশ্লিষ্টরা নিরুৎসাহিত হন। এ শিক্ষাক্রম সঠিকভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। কারণ শেখানো থেকে মূল্যায়ন সবকিছু শিক্ষকরাই করবেন। তাদেরই যদি প্রশিক্ষণের ঘাটতি ও ধারণার অভাব থাকে তাহলে এর বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং হবে।’
এর আগে মাধ্যমিকে গ্রেডিং সিস্টেমে পরিবর্তনের পূর্বে বলা হয়েছিল এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ওপর এ প্লাস পাওয়ার কিংবা শতভাগ নম্বর পাওয়ার চাপ কমবে। তবে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের চিত্র বলছে প্রকৃতপক্ষে এ চাপ কমেনি। শিক্ষকরা বলছেন, অভিভাবকরা আগে চাইতেন সন্তান এ প্লাস পাক আর এখন চাইছেন সন্তান অনন্য স্কেল লাভ করুক।
এ বিষয়ে অভিভাবক সংগঠনের নেতাদের বক্তব্য হলো গ্রেডিং সিস্টেম নয়, কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে হলে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মবাজারের পরিবর্তন আনতে হবে। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, ‘আমাদের দেশে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বইবিমুখ। এখন যেভাবে মূল্যায়ন চলছে, সেটি বিবেচনা করলে বলা যায় শিক্ষার্থীদের তাদের শ্রেণী উপযোগী প্রশ্ন করা হচ্ছে না। অনেক সহজ প্রশ্ন করা হচ্ছে। আবার সেই প্রশ্নও আগেই অনলাইনে চলে আসছে। এভাবে চলতে থাকলে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার আগ্রহই হারিয়ে ফেলবে। এছাড়া ৩৫ শতাংশ নম্বর রাখা হয়েছে শিক্ষকদের হাতে। আমাদের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই নিশ্চয়তা কি দেয়া যায় যে সব শিক্ষার্থী তাদের শিখনফলের ভিত্তিতেই মূল্যায়িত হবে? এক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের সন্তানরা বাড়তি সুবিধা পাবে না বা শিক্ষকের ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হবে না? সব মিলিয়ে আমরা আরো স্বচ্ছ মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং উন্নতমানের প্রশ্নের ভিত্তিতে মূল্যায়ন চাই।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের কর্মবাজার ভালো ফলাফলনির্ভর। আমাদের সামাজিক পরিবেশ এবং কর্মবাজারের জন্যই অভিভাবকরা ভালো ফলাফলের চাপ তৈরি করেন। যতদিন এমন পরিবেশ থাকবে ততদিন অভিভাবকদের অবস্থাও একই রকম থাকবে। ‘অনন্য’ বা ‘এ প্লাস’—যে নামই দেয়া হোক তারা চাইবেন, তাদের সন্তান সবচেয়ে ভালো ফল করুক।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও এনসিটিবির চেয়ারম্যান (রুটিন দায়িত্ব) অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামানের মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
মাউশির মাধ্যমিক শাখার পরিচালক প্রফেসর সৈয়দ জাফর আলী বলেন, ‘এটি নতুন পদ্ধতি। নতুন পদ্ধতি হওয়ায় কিছু ধোঁয়াশা থাকতে পারে। তবে এটি ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে।’
শিক্ষাবার্তা ডটকম/জামান/০৫/০৭/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
