শিক্ষাবার্তা ডেস্ক, ঢাকা: দেশে রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া সাপের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় এই সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এ ছাড়া দ্রুত চিকিৎসা না নিলে মৃত্যু ঝুঁকির কারণে দেশজুড়ে বাড়ছে আতঙ্ক। এক সময় বিলুপ্তপ্রায় এই সাপ গত এক দশকে ৩০টিরও বেশি জেলায় দেখা গেছে।
রাসেলস ভাইপার সাপটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলোতে। তাই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উল্লেখযোগ্য হারে ভর্তি হচ্ছে এই সাপে কামড়ানো রোগী। হাসপাতালটিতে ২০১৩ সাল থেকে রাসেলস ভাইপারে কামড়ানো রোগীর চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন এই মেডিকেলের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবু শাহীন মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান।
এ ধরনের রোগীর চিকিৎসা করার অভিজ্ঞতার বিষয়ে ডা. আবু শাহীন বলেন, ২০১৩ সালে প্রথম রাসেলস ভাইপার সাপের কামড়ের শিকার রোগী পান তিনি। তবে সে সময় যেহেতু এই সাপটি প্রায় বিলুপ্ত বলে প্রচলিত ছিল তাই শুধুমাত্র লক্ষণ দেখে শনাক্ত করা হয় যে, ওই রোগীকে রাসেলস ভাইপার সাপ দংশন করেছে।
তিনি আরও বলেন, ওই ব্যক্তির শরীরে জায়গায় জায়গায় রক্ত জমাট বেঁধে ছিল। তখনই সন্দেহ হয়, শুধু ভাইপার প্রজাতির সাপের বিষের কারণে এমনটা হয়।
যেহেতু এ অঞ্চলে শুধু রাসেলস ভাইপারই লক্ষণীয় তাই তিনি ধারণা করেন এই সাপটিই কামড় দিয়েছে রোগীর শরীরে। পরে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে পুরোপুরি নিশ্চিত হন তিনি।
এই সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসা শেষে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পরও নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, কিডনি বা অন্যান্য অঙ্গে বিষ সংক্রমণ হওয়ার পর পূর্ণ চিকিৎসা না নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলে মৃত্যু ঝুঁকি থাকে রোগীদের। তাই কাউকে এই সাপে কাটলে পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসা বন্ধ করা যাবে না।
রাজশাহী মেডিকেলে ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২৩৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন, যাদের প্রায় সবারই চিকিৎসা দিয়েছেন ডা. আবু শাহীন। চন্দ্রবোড়া সাপের কামড়ে এসব রোগীর ৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা মোট রোগীর ২৮ থেকে ২৯ শতাংশ বলে জানান তিনি।
এই চিকিৎসকের দেওয়া তথ্যমতে, দিন দিন এই সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালটিতে রাসেলস ভাইপারের কামড়ের শিকার রোগীর সংখ্যা ২০২০ সালে ছিল ৩৫ জন, ২০২১ সালে ছিল ৩৭ জন, ২০২২ সালে ছিল ৩১ জন, ২০২৩ সালে ছিল ৫০ জন। এ ছাড়া চলতি বছর এ পর্যন্ত ১৭ জন রোগী রামেক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
কোন অঞ্চলের রোগী বেশি এমন প্রশ্নে তিনি জানান, অধিকাংশ রোগী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার। অঞ্চলটি থেকে রাজশাহী মেডিকেলে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা প্রায় ৫৩ শতাংশ।
কোনো অ্যান্টিভেনম এই সাপের বিষ নিরাময়ে কাজ করে না—এমন কথা ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে সরকারিভাবে যে অ্যান্টিভেনম সরবরাহ করা হয় তা হলো পলিভ্যালেন্ট। এই প্রতিষেধক ভাইপার, কোবরাসহ তিন ধরনের সাপের ক্ষেত্রেই কার্যকর। রাসেলস ভাইপারের কামড়ে আহত রোগীদের পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনমই দেওয়া হয়। রোগীরা সুস্থও হচ্ছেন। যাদের অবস্থা খারাপ হচ্ছে সেটি অ্যান্টিভেনম কাজ করছে না—এমনটি নয়, বরং দেরি করে হাসপাতালে আসার কারণে তাদের সংকটাপন্ন অবস্থার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
রাসেলস ভাইপার সাপে কাটলে আহত ব্যক্তির ক্ষত স্থানে কোনো ধরনের বাঁধন দেওয়া যাবে না বলে জানান তিনি। বলেন, বাঁধন দিলে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে অঙ্গহানি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কাটা জায়গা যাতে নড়াচড়া না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। পায়ে কাটলে নড়াচড়া বন্ধ রাখতে প্রয়োজনে বাতা দিয়ে পা বেঁধে ফেলতে হবে অথবা হাতে কাটলে হাত, গামছা বা অন্য কিছু দিয়ে গলায় ঝুলিয়ে দিতে হবে।
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম রয়েছে জানিয়ে মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন সাপের বিষ নিরাময়ে কাজ করে যাওয়া এই চিকিৎসক।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/২৫/০৬/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
