নিজস্ব প্রতিবেদক।।
কবি সুকান্ত যেমন তাহার টিনেজ বয়সে লিখিয়াছিলেন—‘অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি/ জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি।’ তেমনি করিয়া এখন যাহাদের টিনেজ বয়স, তাহারা এই পৃথিবীকে কী চোখে দেখিতেছে? সুকান্ত না-হয় তাহার স্বল্পায়ু জীবনটায় অস্থির পৃথিবীর মধ্যে বসবাস করিয়াছেন। কিন্তু এখন একটি কিশোর বা সদ্য তরুণ, যাহার চোখে রহিয়াছে সুন্দর জীবনের স্বপ্নাঞ্জন, সে কী ভাবিতেছে প্রতিদিনের পত্রিকার পাতায় খবর দেখিয়া? তৃতীয় বিশ্বে বসবাসকারী এই সকল কিশোর বা সদ্য তরুণ দেখিতেছে, সমাজ-রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দূষণ আর পচন। হাজার হাজার কোটি টাকার বড় বড় দুর্নীতি। শত-সহস্র কোটি ডলারের পাচারের কাহিনি। পত্রিকাগুলি যেন আর পত্রিকা নহে, সবই অপরাধ পত্রিকা। অপরাধ দুর্নীতি আর খারাপ খবরে পরিপূর্ণ। যাহাদের বয়স কম, যাহাদের সামনে পড়িয়া রহিয়াছে বিস্তর ভবিষ্যত্, তাহারা এই লুটেরাদের চিত্র দেখিয়া মনে করিতে পারে—তৃতীয় বিশ্বের কিছু কিছু দেশ কি লুটপাট করিবার দক্ষতা অর্জন করাটাই আসল যোগ্যতা?
কিন্তু এই যোগ্যতা তো মহা অপরাধ। নূতন প্রজন্মের যাহারা বিভিন্ন দেশে ঘুরিয়াছে, তাহারা দেখিয়াছে, কল্যাণকর উন্নত দেশগুলির ছেলেমেয়েরা সত্, পরিশ্রমী ও দেশপ্রেমিক। তাহারা মিথ্যা বলে না, মিথ্যা বলা জানেও না। সুশৃঙ্খল, হিউম্যান রাইটস, আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য, চিকিত্সা, লিভিং স্ট্যান্ডার্ড, পরিবেশ সুন্দর রাখিবার মহান ঐতিহ্য তাহারা বহন করিতেছে। পূর্বসূরিদের সেই ব্যাটন লইয়া তাহারা সম্মুখে অগ্রসর হইতেছে। মানুষ যেই হেতু তাহার পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যেই বাড়িয়া উঠে, সুতরাং এই তিন স্তরের ভালো বা খারাপ জিনিসগুলিই তাহাদের জীবনকে গড়িয়া দেয়। এখন প্রতিদিনই খবরের কাগজ খুলিয়া তৃতীয় বিশ্বের ছেলেমেয়েরা যদি দেখে আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে অসংখ্য ঘৃণ্য অপরাধমূলক কাণ্ডকারখানা দিনের পর দিন ঘটিয়া চলিতেছে এবং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতেছে, তাহা হইলে এই সংবেদনশীল ছেলেমেয়েরা ভব্যিষতের দর্পণে কী দেখিতে পাইবে?
ভণ্ডামিও বিপুল ও ব্যাপক তৃতীয় বিশ্বের সমাজে। সেইখানে ছোটবেলায় পড়ানো হয়—সততাই সর্বোত্কৃষ্ট পন্থা। কিন্তু দেখা যায় যে, অসততাই সমাজ-রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এবং অসৎ-অপরাধীরাই অধিক ক্ষমতাবান, প্রভাব ও প্রতাপশালী। এই সমাজে ইঁদুর-মানসিকতার মানুষের বিপুল বৃদ্ধি ঘটিতেছে। মিথলোজিতে রহিয়াছে, ইঁদুর হইল লুটেরা, মজুতদার, মধ্যস্বত্বভোগী, স্বার্থপর, সর্বভুক ও আত্মসাত্কারী। ইঁদুর রাতের আঁধারে সম্পদ হরণ করিয়া নিজের ডেরায় তাহা মজুত করে। দিনের বেলায় আলোতে ইঁদুর খাদ্যসম্পদ আহরণ করে না, কেবল অন্ধকারে লোকচক্ষুর আড়ালে সম্পদ লুণ্ঠন করে। এবং তাত্পর্যপূর্ণ দিকটি হইল—নিজের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি সম্পদ মজুত করে সর্বগ্রাসী ইঁদুর। আবার এই ইঁদুররা যে কোনো পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াইয়া লইতে পারে। ইঁদুর-শ্রেণি দ্রুত বংশবিস্তারেও বিশেষ দক্ষ। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে এই ইঁদুরেরা দেশের সম্পদ লুণ্ঠন অব্যাহত রাখিতে সকল ব্যবস্থা নিজেদের পক্ষে তৈরি করিয়া লইতেছে। পৌরাণিক কাহিনিতে লুটেরা ইঁদুরের বিপরীতে প্যাঁচাকে সম্পদের রক্ষক ও সমবণ্টনকারী হিসাবে দেখানো হইয়াছে। তাই ইঁদুর তাড়ানোর জন্য প্যাঁচা দিয়া ইঁদুর দমন করিবার কথা বলা হয়। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের কোথাও কোথাও দেখা যায়, সম্পদের রক্ষক ও সমবণ্টনকারীও ঐ ইঁদুর-দলেরই একজন! তৃতীয় বিশ্বের জন্য ইহা ট্র্যাজেডি বটে।
লুটেরা ও সর্বগ্রাসী ইঁদুরকে তাড়াইতে বারো শতকে জার্মানির হ্যামিলন শহরে আসিয়াছিলেন এক বাঁশিওয়ালা। কিন্তু সেই হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালাকেও প্রাপ্য পারিশ্রমিক দেওয়া হয় নাই। ফলে, যেইখানে সমস্যা থাকে, সেইখানে অসংখ্য সমস্যা আসিয়া সমস্যার জট তৈরি করে। এই জট পাকানো সমাজের এত ধরনের জটিলতা ও সমস্যা দেখিয়া নূতন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কী ভাবিতেছে? তাহারা কি হতাশ হইয়া পড়িতেছে? তাহারা কি চিন্তিত যে—‘এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে?’ কিন্তু এইভাবে তো চিরকাল চলিতে পারে না। কোনো দেশে কোনো রাষ্ট্র এইভাবে বেশি দিন চলে নাই। ইহাই তাহাদের সান্ত্বনা।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/জামান/২৫/০৬/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
