নিজস্ব প্রতিবেদক।।
ফিলিস্তিনের গাজা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে শিক্ষিতের হার অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যা উচ্চস্তরে পড়ে। কিন্তু সাত মাস ধরে যে ইসরায়েলি হামলা চলছে, তাতে ধসে পড়েছে গাজার সেই শিক্ষাব্যবস্থা। হামলায় গাজার প্রায় ৮৭.৭ শতাংশ স্কুল ভবন বিধ্বস্ত। উচ্চশিক্ষার জন্য যে ১২টি প্রতিষ্ঠান ছিল, তার সবই ধ্বংস করা হয়েছে। নিহত হয়েছে অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী। আহত হয়ে পঙ্গু জীবনযাপন করছে আরও অনেকে। ৬ লাখ ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর পড়াশোনা হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত। কিন্তু তারপরও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে চায় না গাজার শিক্ষার্থীরা। এ অবস্থার মধ্যেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেক তাঁবুতে স্কুল খুলে চলছে পাঠদান। অনলাইনেও চলছে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। চলমান শিক্ষাবর্ষ যাতে হারিয়ে না যায়, তার জন্য অনেকটা মরিয়া গাজার শিক্ষার্থীরা। গ্রন্থনা : ওয়াহেদুজ্জামান সরকার
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার খান ইউনিসসহ বেশ কয়েকটি শহরে তাঁবুর মধ্যে তৈরি করা হয়েছে পাঠশালা। মৃত্যুঝুঁকি মাথায় নিয়ে প্রতিদিন পাঠশালায় আসছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। যুদ্ধ যাতে শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে বাধা না হতে পারে, সেজন্য আমৃত্যু কাজ করতে বদ্ধপরিকর এসব পাঠশালার শিক্ষকরা। জাতিসংঘের তথ্য বলছে, গাজা উপত্যকার ৮৭.৭ শতাংশ স্কুল ভবন হামলায় বিধ্বস্ত হয়েছে। যার মধ্যে ৬০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই ব্যবহার হচ্ছিল আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে। সাড়ে ছয় হাজার শিক্ষার্থীর পাশাপাশি প্রায় ৩০০ শিক্ষাকর্মী নিহত হওয়ায় বন্ধ পাঠদান কার্যক্রম। তবে এতকিছুর পরও গাজার খান ইউনিসে তাঁবুর মধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে পাঠশালা। মৃত্যুঝুঁকি মাথায় নিয়ে প্রতিদিন ক্লাসে উপস্থিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। তাঁবুর ভেতর আলাদা করে তৈরি করা হয়েছে ক্লাসরুম। যেখানে ভিন্ন ভিন্ন কক্ষে পাঠদান চলছে বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীদের। এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে আমার পড়াশোনা বন্ধ ছিল। তাই তাঁবুর মধ্যে পড়াশোনা করতে এসেছি। তাঁবুতে ক্লাস করা আমার জন্য সমস্যা নয়। কারণ জ্ঞানের মাধ্যমে আমরা সামনে আসব।’
খান ইউনিসের এ শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষক। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে তারা সিদ্ধান্ত নেন যুদ্ধের জন্য শিশুদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করা যাবে না। তাই নিজেরাই তাঁবুর মধ্যে তৈরি করেন পাঠশালা। যেখানে স্কুলের মতোই চলছে পাঠ কার্যক্রম। তাঁবু পাঠশালার প্রধান শিক্ষক লাইলা ওয়াফি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারে না। যুদ্ধকে শিক্ষা বন্ধের অজুহাত হতে দেওয়া যাবে না। আমরা সারাজীবন যুদ্ধের মধ্যেই কাটিয়েছি। তবে শিশুদের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে হবে।’
যুদ্ধের মধ্যে পাঠশালায় শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়াকে কীভাবে দেখবেন অভিভাবকরা, এ নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন শিক্ষকরা। তবে অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ক্লাসে ফিরে যাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীরাও ছিল ব্যাকুল। তাই কানায় কানায় পূর্ণ তাঁবুর এ পাঠশালা। শিক্ষকরা বলেন, ‘শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে পাঠদান শুরুর বিষয়ে আগ্রহ ছিল। বাচ্চারা ক্লাসে ফিরতে পেরে খুবই খুশি। এ কারণে আমরাও পাঠদান চালিয়ে যেতে পারছি। প্রায় সাত মাস ধরে শিশুরা পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত ছিল। এটা আমাদের ব্যর্থতা। চালুর পর পাঠশালা শিক্ষার্থী দিয়ে পরিপূর্ণ। এখানে সবাইকে জায়গাই দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’ সব সংকট মোকাবিলা করেই যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ফিলিস্তিনি শিশুদের জন্য কাজ করে যেতে চান পাঠশালার এ শিক্ষকরা।
গাজা যুদ্ধে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে রাফাহ অভিযান নিয়ে। ইসরায়েলি বাহিনী যে কোনো সময় মিশর সীমান্তবর্তী গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় এ নগরীতে স্থল অভিযান শুরু করবে। এজন্য তারা রাফাহর বাসিন্দা এবং সেখানে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১৪ লাখ ফিলিস্তিনিকে ভূমধ্যসাগরের উপকূলবর্তী ছোট্ট শহর আল-মাওয়াসিতে চলে যেতে বলেছে। সেই আল-মাওয়াসির কাছে এপ্রিলের শেষদিকে তাঁবুর ভেতর স্কুল শুরু করেন কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক। তাদেরই একজন আসমা আল-আসতাল বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের স্কুলে নিচ্ছি এবং আমাদের আরও অনেক শিক্ষার্থী আছে, যারা স্কুলে ভর্তির অপেক্ষা করছে। ইসরায়েলিরা আমাদের হত্যা করতে পারবে, কিন্তু স্বপ্নকে নয়।’
শিবা/জামান/১৬/০৫/২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
