‘ধার করা’ শিক্ষার্থী দিয়ে চলছে হুলিয়ারপাড়া মাদ্রাসা ও দাখিল পরীক্ষা!

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার হুলিয়ারপাড়া জামেয়া কাদেরিয়া সুন্নিয়া আলিম  মাদ্রাসার দাখিল শ্রেণি চলছে ‘ভাড়া করা শিক্ষার্থী’ দিয়ে।  নামে মাত্র শিক্ষার্থী থাকলেও অনুমোদনহীন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী দিয়ে চলছে দাখিলের কার্যক্রম। শুধু দাখিলের পরীক্ষার্থী নিয়ে নয় ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণিতে শ্রেণি প্রতি ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী দেখানো হলেও ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থী আছে মাদ্রাসাটির।

গতকাল রবিবার বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে দাখিল পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, হুলিয়ারপাড়া জামেয়া কাদেরিয়া সুন্নিয়া আলিম  মাদ্রাসার দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ৫৯ জন শিক্ষার্থী। পাসের হার শতভাগ। তবে এই ৫৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩৯ জন শিক্ষার্থী ‘ধার করা’। অর্থ্যাৎ তারা হুলিয়ারপাড়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীই নন। ৫৯ জন দাখিল পরীক্ষার্থীর ৩৯ জন শিক্ষার্থী একই উপজেলার কুবাজপুর শাহজালাল সুন্নিয়া দাখিল মাদ্রাসার। কুবাজপুর শাহজালাল সুন্নিয়া দাখিল মাদ্রাসাটির নেই পাঠদানের অনুমোদন, নেই স্বীকৃতি। লন্ডন প্রবাসীদের আর্থিক অনুদানে চলা এই মাদ্রাসাটি গত প্রায় দশ বছর ধরেই শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়ে হুলিয়ারপাড়া জামেয়া কাদেরিয়া সুন্নিয়া আলিম মাদ্রাসায় নামে নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে দাখিল পরীক্ষা দিচ্ছে।

মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের দাখিল পরীক্ষার বিগত কয়েক বছরের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২২ সালে হুলিয়ারপাড়া জামেয়া কাদেরিয়া সুন্নিয়া আলিম  মাদ্রাসার দাখিল পরীক্ষার্থী ছিল ৫২ জন। এরমধ্যে কুবাজপুর শাহজালাল সুন্নিয়া দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ২৯ জন। মাত্র ২৩ জন শিক্ষার্থী হুলিয়াপাড়া মাদ্রাসার। ২০২৩ সালের দাখিল পরীক্ষার্থী ছিল ৫২ জন এর মধ্যে কুবাজপুর মাদ্রাসার ২৭ জন অর্থ্যাৎ হুলিয়াপাড়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ২৫ জন। ২০২১ সালে ৫৪ জন শিক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষা দিলেও এর সিংহভাগ শিক্ষার্থীই কুবাজপুর মাদ্রাসার। ২০২০ সালে দাখিল পরীক্ষায় ২১ জন অংশ নিলেও হুলিয়াপাড়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ছিল মাত্র কয়েকজন।  সর্বশেষ ২০২৪ সালের দাখিল পরীক্ষার্থী ৫৯ জনের ৩৯ জন কুবাজপুর মাদ্রাসার।

কুবাজপুর শাহজালাল সুন্নিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার হুলিয়ারপাড়া জামেয়া কাদেরিয়া সুন্নিয়া আলিম মাদ্রাসার নামে তারা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা দাখিল পরীক্ষা দিচ্ছে বিষয়টি স্বীকার করে শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, আমরা একাধিকবার আবেদন করেও পাঠদানের অনুমতি পায়নি। তাই হুলিয়ারপাড়া মাদ্রাসার নামে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দেওয়ানো হচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মাদ্রাসায় নবম শ্রেণিতে মানবিক ও বিজ্ঞান বিভাগ থাকতে হলে প্রতি বিভাগে নূন্যতম ২৫ জন শিক্ষার্থী থাকা বাধ্যতামূলক।

হুলিয়ারপাড়া মাদ্রাসায় বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগ থাকলেও বিজ্ঞান বিভাগে কোন শিক্ষার্থী না থাকায় তা গত কয়েকবছর যাবত বন্ধ আছে। অন্যদিকে মানবিক বিভাগেও শিক্ষার্থী ১৫ জনের মত। তবে প্রকৃত শিক্ষার্থী ১৫ জন হলে খাতা কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০ এর অধিক। বাকি শিক্ষার্থী কুবাজপুর শাহজালাল সুন্নিয়া দাখিল মাদ্রাসার।

মাদ্রাসার টির দুই জন ইংরেজি শিক্ষক মোঃ আলী আসকার ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। পাঠদানে না থাকলেও এই শিক্ষকের বেতন-ভাতার এমপিও অংশ প্রতি মাসেই ব্যাংকে আসছে। অন্যদিকে আর ইংরেজি শিক্ষক হেলাল উদ্দিন  ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চাকরি ছেড়ে চলে যান। বর্তমানে দুইজন ইংরেজি শিক্ষকের একজনও নেই। আলী আসকার লন্ডনে বসাবস করলেও সেই পদ শূন্য ঘোষণা করা হয়নি। ইংরেজির মত বিষয়ের শিক্ষক না থাকলে সেই মাদ্রাসার পড়াশোনার অবস্থা কি হয় তা সহজেই অনুমেয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদ্রাসাটির এক শিক্ষক বলেন, ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী মাত্র ১২ জন অথচ খাতা কলমে শিক্ষার্থী আছে ৭০ জন। শিক্ষার্থী ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে এসে ভর্তি হন। তাহলে অন্য শ্রেণিগুলোতে কি অবস্থা সহজেই বোঝা যায়।

জানা গেছে, কাম্য যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা না থাকলেও প্রথমে প্রভাষক ও পরবর্তী অধ্যক্ষ নিয়োগ পাওয়া হুলিয়ারপাড়া জামেয়া কাদেরিয়া সুন্নিয়া আলিম  মাদ্রাসার অধ্যক্ষ  মো. মইনুল ইসলাম পারভেজ একই সাথে তিনি বিবাহ ও তালাক নিবন্ধক। তার বিরুদ্ধে কাবিন ও বয়সজালিয়াতীর অভিযোগ রয়েছে। তিনি মাদ্রাসা থেকে নিয়মিত বেতন ভাতা নিলেও অধিকাংশ সময় ব্যস্ত থাকেন বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের দায়িত্ব নিয়ে। দিন দিন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী তলানী ঠেকলেও তাতে তিনি কোন কর্ণপাত করেননা। কুবাজপুর শাহজালাল সুন্নিয়া দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা  হুলিয়ারপাড়া মাদ্রাসার হয়ে দাখিল পরীক্ষা দেওয়ায় এবং প্রতি শ্রেণিতে একই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ভর্তি দেখানোয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে না অধ্যক্ষ মইনুল ইসলাম পারভেজের।

বিষয়টি নিয়ে অধ্যক্ষ  মো. মইনুল ইসলাম পারভেজের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কোন রেসপন্স করেননি।

এ বিষয়ে জানতে চেয়ে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) হোসাইন মুহাম্মদ আল-মুজাহিদের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, মাদ্রাসার নিয়মিত শিক্ষার্থী না হয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে কিছু কিছু জায়গায় আমরা এরকম খবর পাচ্ছি। এছাড়াও প্রতি শ্রেণিতে কাম্য শিক্ষার্থী না থাকলে প্রয়োজনে পাঠদানের অনুমতি বাতিল করা হবে।  খোঁজ নিয়ে মাদ্রাসাগুলোকে চিহ্নিত করে মাদ্রাসা প্রধানদের শোকজ করা হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন, মাদ্রাসার উন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের নানাবিধ সুবিধার্থে প্রবাসী কর্তৃক ব্যাংকে প্রদত্ব ৪০ লাখ টাকা অধ্যক্ষ মো. মইনুল ইসলাম পারভেজ অন্যান্যদের সহযোগিতায় আত্মসাৎ করেন। আর আর্থিক জালিয়াতির এই মামলায় ১৬ দিন জেল খাটেন অধ্যক্ষ মঈনুল ইসলাম পারভেজ। এছাড়াও নিয়োগ জালিয়াতি ও কাবিন জালিয়াতি করায় অধ্যক্ষ মইনুলকে দুইটি শোকজ করে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর।  হুলিয়ারপারা জামেয়া কাসেমিয়া আলিম মাদ্রাসার ইংরেজি শিক্ষক মোঃ আলী আসকার ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য দেশ ত্যাগ করেন। অথচ সর্বশেষ মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের সরকারি অনুদানের (বেতন-ভাতা) এপ্রিল-২০২৪ মাসের এমপিও শীটেও আলী আসকারের নামে বেতন-ভাতা এসেছে। তবে এর আগে অধ্যক্ষ মইনুল দাবি করেন গত নভেম্বর ২০২৩ তারিখে তিনি পদত্যাগ পত্র দিয়েছেন অথচ চলতি বছরের এপ্রিল মাসের এমপিও শীটেও এই শিক্ষকের নাম রয়েছে। এগুলো সব অধ্যক্ষের কারসাজি বলছেন এলাকাবাসী।

অধ্যক্ষ মইনুলের নানা অনিয়ম নিয়ে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে শিক্ষাবার্তা’য়।

আরও পড়ুনঃ

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/১৩/০৫/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.