এইমাত্র পাওয়া

স্মার্ট শিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়নে যা করা দরকার

মো. সিদ্দিকুর রহমানঃ শিশুর মন কাদামাটির মতো নরম। সঠিকভাবে পরিচর্যা করার সুযোগ সৃষ্টি হলে শিশু দক্ষ ও সুনাগরিক হিসাবে গড়ে উঠবে। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের নির্মম শাহাদতবরণের পর এদেশের শিশুশিক্ষা উলটা পথে চলছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে উন্নতি হলেও শিশুশিক্ষা আজও চরম বৈষম্যের মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রাথমিক শিক্ষার স্বপ্ন পূরণে শিক্ষক রুমানা আলীকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন। তার দায়িত্ব গ্রহণের এই উষালগ্নে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিরসনকল্পে কিছু সুপারিশ উপস্থাপন করছি।

শিক্ষক সংকট নিরসন : স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে শিক্ষায় ঘাটতি কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়। সে লক্ষ্যে শিক্ষক সংকট শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। এজন্য নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্যানেল ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। প্যানেলের নিয়োগ শেষ হওয়ার আগেই প্যানেল প্রস্তুত রাখা দরকার। নিয়োগপ্রাপ্তদের সিইনএড বা ডিপইএড প্রশিক্ষণ শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করাতে হবে, যাতে প্রশিক্ষণ গ্রহণের কারণে এক বা দেড় বছর বিদ্যালয়ের শিশুশিক্ষা ব্যাহত না হয়। নিয়োগদানকারী কর্তৃপক্ষকে গাফিলতির জন্য জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

স্বতন্ত্র প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার সার্ভিস গঠন : স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজন সমৃদ্ধ শিশুশিক্ষা। এজন্য প্রয়োজন মেধাবীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করা। এ লক্ষ্যে সহকারী শিক্ষকদের শতভাগ পদোন্নতির মাধ্যমে নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে, যাতে তারা তাদের মেধা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। পেশায় দক্ষ জনবল সৃষ্টি করার জন্য পদোন্নতির মাধ্যমে স্বতন্ত্র প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার সার্ভিস প্রয়োজন। মোট সরকারি কর্মচারীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনবল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে কর্মরত। অথচ সব মন্ত্রণালয় নিজস্ব ক্যাডার সার্ভিস থাকলেও বিশাল এ মন্ত্রণালয়ের স্বতন্ত্র ক্যাডার সার্ভিস নেই। প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের পদকে এন্ট্রি ধরে শতভাগ পদোন্নতি দিয়ে স্বতন্ত্র প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার সার্ভিস গঠন করা প্রয়োজন।

শিশুবান্ধব শিক্ষা ও সময়সূচি : শিশুর শারীরিক-মানসিক বিকাশের জন্য মনোবিজ্ঞানসম্মত পাঠদান, খেলা, বিনোদন, সহপাঠক্রমিক কার‌্যাবলির বিকল্প নেই। বিদ্যালয়ের সময়সূচি বিকাল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বিকালে খেলাধুলা ও বিনোদনের সুযোগ পায় না। প্রতিদিন বিদ্যালয়ে ছয়-সাতটা ক্লাসের মাধ্যমে শিশুকে কিছু শেখানোর পরিবর্তে বাড়ির পড়া, কাজ দিয়ে পাঠদান সমাপ্ত করা হয়। এতে শিখন ঘাটতি থেকে যায়। তাই দেশের সব শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুপুর ২টার মধ্যে ছুটি দেওয়া প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা বাসায় গিয়ে গোসল ও খাওয়াদাওয়া শেষে খানিকটা বিশ্রাম করে বিকালে ফুরফুরে মেজাজে সুস্থ দেহ-মন নিয়ে খেলাধুলা বা বিনোদনের সুযোগ পায়। বিদ্যালয়কে জ্ঞান অর্জনের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতিটি শ্রেণির কার্যক্রম ১ ঘণ্টা হওয়া বাঞ্ছনীয়। প্রতিটি ক্লাসের পর ৫ মিনিট বিরতি দেওয়া উত্তম। দৈনিক চার পিরিয়ডের বেশি ক্লাস হওয়া মোটেই কাম্য নয়। এতে একদিকে বিদ্যালয় হবে জ্ঞান অর্জনের কেন্দ্রবিন্দু, বাড়িতে পড়ার চাপ ও গৃহশিক্ষকের অভাব দূর হবে; অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা পরিবারের অন্যদের সঙ্গে দুপুরে খেতে পারবে। এ ছাড়া বিকালে খেলাধুলা বা বিনোদনের সুযোগ পাবে।

সরকারি-বেসরকারি উচ্চবিদ্যালয়সহ কলেজের প্রাথমিক শাখা বিলুপ্তকরণ : ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রাথমিক স্তর হবে প্রথম-অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। এর ফলে প্রতিটি উপজেলায় ২/১টি প্রাথমিক বিদ্যালয় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করার পর দীর্ঘ সময় থেকে এ কার্যক্রম স্থবির হয়ে রয়েছে। বরং প্রতিটি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় প্লে-নার্সারি থেকে প্রাথমিক শাখা সরকারি তত্ত্বাবধানে চলছে। অথচ উচ্চবিদ্যালয় ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শিশুশিক্ষায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। অপরদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রয়েছে উচ্চশিক্ষিত, মেধাবী, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক। ফলে জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থী সংকটে অস্তিত্ব বিলীন হতে চলেছে। অপরদিকে শিক্ষার্থীরা শিশুশিক্ষায় প্রশিক্ষণবিহীন শিক্ষকদের কাছ থেকে যথাযথ শিশু মনোবিজ্ঞানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে না। জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু হলে তৃণমূলের দরিদ্র, শ্রমিক, অসহায় মানুষসহ সর্বস্তরের মানুষ অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ পাবে। তাই পর্যায়ক্রমে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উচ্চ ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শাখা বিলুপ্ত করা হোক।

জাতীয় ও বিশেষ দিবস বার্ষিক ছুটি থেকে বাদ দেওয়া : বাঙালি সংগ্রামী জাতি। আমাদের মতো সংগ্রামী ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর কোনো জাতির নেই। অথচ আজকের প্রজন্ম স্বাধীনতার ৫ দশক পরও দেশ ও জাতির সংগ্রামী ইতিহাস, ঐতিহ্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে ভালো ধারণা লাভ করতে সক্ষম হয়নি। এর অন্যতম কারণ-বার্ষিক ছুটির তালিকায় বিদ্যালয় ছুটি দেখিয়ে স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে ডেকে এনে দায়সারাভাবে দিবসগুলো পালন করা হয়ে থাকে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা অফিসকক্ষে পরিদর্শনের অপেক্ষায় সময় কাটায়। অভিভাবক বিদ্যালয় বন্ধ জেনে শিক্ষার্থীদের দিবস পালনে বিদ্যালয়ে পাঠান না। এতে শিক্ষার্থীরা দেশ ও জাতির সংগ্রামী ঐতিহ্য-সংস্কৃতি জানার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। তাই বার্ষিক ছুটির তালিকা থেকে জাতীয় ও বিশেষ দিবসে ছুটি বাদ দিয়ে শিক্ষকদের শ্রান্তি বিনোদন ভাতা বিধিসম্মতভাবে তিন বছর পরপর দেওয়ার লক্ষ্যে গ্রীষ্মের ছুটি বা যে কোনো ছুটি একনাগাড়ে ১৫ দিন করা হোক। জাতীয় ও বিশেষ দিবস সম্পর্কে সব শিক্ষার্থীকে জানানোর বিষয়ে শিক্ষকদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।

দপ্তরিদের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তর : প্রাথমিকের দপ্তরিরা বিদ্যালয়ে অতি জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করে থাকেন। বিদ্যালয় ও শিক্ষকদের পদমর্যাদা সরকারি। অথচ বিদ্যালয়ের সার্বিক দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মচারী-দপ্তরিরা রয়েছেন আউটসোর্সিংয়ের আওতায়। তাদের অনেকটা সার্বক্ষণিক ডিউটি করতে হয়। এ প্রেক্ষাপটে কাজের গুরুত্ব বিবেচনা করে তাদের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করা প্রয়োজন। তাছাড়া সরকারি বিধিমোতাবেক কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করা জরুরি।

লেখক: সভাপতি, বঙ্গবন্ধু প্রথমিক শিক্ষা গবেষণা পরিষদ

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৪/০১/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.