এইমাত্র পাওয়া

পেটের ক্ষুধা, মনের জ্বালা দূর করার শিক্ষা

ড. মো. মোস্তাফিজার রহমানঃ :জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পথ বেয়েই সৃজনশীলতায় উপনীত হতে হয়। অর্থাৎ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা সৃজনশীলতার পূর্ববর্তী পর্যায় বা ধাপ। তথ্য যদি হয় জ্ঞান বিনির্মাণের উপকরণ; অর্জিত জ্ঞানকে নিজের উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতায় শানিত করে তার বাস্তব জীবনের সঙ্গে ইতিবাচক সামঞ্জস্য বিধানের সক্ষমতাই যদি হয় প্রজ্ঞা; সংগৃহীত তথ্য, অর্জিত জ্ঞান ও উপাদান কাজে লাগিয়ে কোনো আইডিয়া, সমাধান বা বস্তু তৈরি করাই যদি হয় সৃজনশীলতা; তাহলে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সৃজনশীলতার জায়গায় পৌঁছাতে হলে চিন্তা ও কল্পনার পরিচর্যা মানবজীবনে অপরিহার্য। চিন্তা ও কল্পনাই সে পথ অতিক্রম করার সহায়ক শক্তি। অর্থাৎ চিন্তা ও কল্পনার সহায়তা ব্যতিরেকে মাথা থেকে নতুন কিছু উদ্ভাবন, সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া অসম্ভব। হাতির আদলে ক্রেন আবিষ্কার, তিমি মাছের আদলে প্লেন আবিষ্কারের কল্পনা থেকেই হয়তো মানুষের ওই পথে হাঁটা ও আজকের বাস্তবতা। তা থেকে সৃজনশীলতার জায়গায় উপনীত হওয়ার ক্ষেত্রে চিন্তা ও কল্পনার গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়।

যাদের চিন্তা ও কল্পনা নেই; বোধের জায়গাতে যারা দীন-হীন, তাদের জগৎসংসারে দেওয়ারও কিছু নেই। একটি বিষয় সম্পর্কে বেশি বেশি চিন্তাভাবনা দ্বারা তা সম্পর্কে মানুষের মনে একটি কাল্পনিক রূপ সৃষ্টি হতে পারে। এর মাধ্যমে পুরোপুরি একটি নতুন বিষয় শিক্ষার্থীদের মনে জন্ম নিতে পারে। আবার কোনো বিষয় সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মনে জানার আগ্রহ বা প্রশ্ন তৈরি হওয়া ও তার উত্তর খুঁজে পাওয়ার অবিরাম প্রচেষ্টার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মনে কল্পনা ও চিন্তার অনুশীলন হতে পারে।

শিক্ষকের প্রধান কাজ হলো শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখানো, জাগ্রত ও অনুপ্রাণিত করা। সে কাজটি করা সম্ভব হলে শিক্ষার্থীদের মনে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়, যা তাদের কল্পনা ও চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি ও চর্চায় প্রেরণা জোগায়। মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির উন্মেষ, উৎকর্ষসাধন ও সৃজনশীলতায় চিন্তা ও কল্পনার গুরুত্ব অনুধাবন করা যায় রমেশ শীল, মুকুন্দ দাস, আরজ আলী মাতুব্বরসহ অনেক প্রাকৃতজনের অসাধ্য সাধনের সক্ষমতার মধ্যে। ধারণা করা হয়– চিন্তা, কল্পনা ও বোধশক্তির বলেই লালন ফকির থেকে শাহ করিমের মতো অনেক সাধারণ মানুষ চিন্তাজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। হয়ে উঠেছেন অসাধারণ।

মানুষের চিন্তা যখন দেশ-কালকে অতিক্রম করে সব দেশের সব মানুষের হয়ে ওঠে, তখন মানুষ বিশ্বজনীন সত্তা লাভ করে। সে নিবিষ্ট মনে সত্যানুসন্ধানী হয়ে ওঠে; বিবেক ও বিবেচনাবোধসম্পন্ন হয়ে একজন ভালোমানুষ হতে পারে। তাঁর চিত্ত হয় নির্ভীক। সে আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে গগনপানে ধায়। জ্ঞানের শক্তিতে শক্তিমান হয়ে সে সমাজে সুইপার (অস্পৃশ্য) থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের কর্ণধারসহ সবাইকে সমান জ্ঞান করতে শেখে। আপন জ্ঞানের অগ্নিশিখায় প্রজ্বলিত হয়ে হাজারো প্রদীপ জ্বালাতে পারে। আর তা সম্ভব করতে হলে শিক্ষাজীবনেই সে কাজের শুভসূচনা হওয়া চাই।

চিন্তা ও কল্পনার চর্চার দ্বারা শিক্ষার্থীদের বোধের জায়গাটি উর্বর করা অপরিহার্য জ্ঞান করি। বাধ্যতামূলক শিক্ষার সঙ্গে ঐচ্ছিক শিক্ষা সমানতালে এগিয়ে গেলে বা তাদের মধ্যে যথার্থ সমন্বয় সাধন করে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপিত হলে শিক্ষা শুধু মস্তিষ্কজাত না হয়ে হৃদয়জাতও হতে পারে। সেটা হলে আমাদের পেটের ক্ষুধা ও মনের জ্বালা উভয়ই দূর হতে পারে। তাই শুধু ডিগ্রি অর্জন নয়; সৃজনশীল করে গড়ে তোলার শিক্ষাই হোক আমাদের যথার্থ শিক্ষা।

লেখকঃ প্রাক্তন অধ্যক্ষ, নওগাঁ সরকারি কলেজ

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৫/১১/২০২৩ 

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.