রাশেদুজ্জামান রাশেদ: কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশ। এ দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামে সাধারণ মানুুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। খাবার টেবিলের আয়োজন জন্য করতে হয় রান্না। আর তার জন্য প্রয়োজন বাজার অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। সেগুলো কোনো না কোনো ভাবেই আমাদের দেশের কৃষক উৎপাদন করে। তবুও কেন জানি দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হাতের নাগালে বাইরে চলে গেছে।
লেখার শিরোনাম ‘শিক্ষা ও শিক্ষকের সংকট রেখে দেশ কি এগিয়ে যাবে?’ ফলে এই শিরোনাম লিখতে গিয়ে হঠাৎ বাজার ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করতে হচ্ছে কেন? তার কারণ যেই শিক্ষক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মাঝে পাঠদান করতে যান। তিনি আমাদের দেশের বাজার ব্যবস্থার বাইরে নেই। সমাজের কোনো একটি স্তরে যখন বিশৃঙ্খলা ঘটে তখন তার প্রভাবটা সকলের ওপর পড়ে। তাই আগে বুঝার দরকার কোনো ধরনের শিক্ষক ও শিক্ষার কথা বলছি। যেই শিক্ষক তার মাস শেষে বেতন পাওয়ার পরও পরিবারপরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে ঠিক সেই শিক্ষকের কথা বলছি।
আবার যে শিক্ষায় মৌলিক অধিকার না হয়ে বাণিজ্যিকীরণ শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে ঠিক সেই শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলছি। রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে প্রশ্ন করা আমার অধিকার যে শিক্ষা ও শিক্ষকের সংকট রেখে কি স্মার্ট দেশে পরিণত করতে পারব? শিক্ষায় জাতির মেরুদণ্ড। আর জাতির মেরুদণ্ড তৈরির কারিগর হচ্ছে শিক্ষক।
শিক্ষা ব্যবস্থা যখন ব্যবসায়ীদের হাতে যায় তখন শিক্ষা মৌলিক অধিকার আর থাকে না। শিক্ষা হয়ে যায় পণ্য। এমন শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকদের নাভিশ্বাস উঠে। তখন বিষয়টি গুরুত্বসহকারে ভাবতে হবে। বাংলাদেশে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় বেতনের উৎস যদি বিবেচনা করা হয় তাহলে দেখা যায় এ দেশে তিন ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে তিন স্তরের শিক্ষক আছেন। সরকারি, এমপিওভুক্ত এবং বেসরকারি। অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা বৈষম্য এবং শিক্ষা ও শিক্ষকের মান নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে তা সকলেই স্পষ্ট বুঝতে পারছি।
গত ১১ জুলাই থেকে প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন করেন বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলের এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা। পরবর্তীতে আন্দোলনরত অবস্থায় ১৬ জুলাই থেকে স্কুল বন্ধ করে ক্লাস নেওয়া থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। তাঁদের দাবি মাধ্যমিক শিক্ষার জাতীয়করণ (সরকারি করার জন্য)। এর ফলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের সমান বেতন-ভাতা, পেনশন সুবিধাদি পান। তবে ২০ দিন পর অর্থাৎ চলতি ২ আগস্ট বৈষম্য দূর করার নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং সরকার গঠিত কমিটিতে শিক্ষক প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনের ছেড়ে শ্রেণিকক্ষে ফিরে যান শিক্ষকেরা।
পরিসংখ্যানের তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশে ২১ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। তার মধ্যে ৬৮৪টি সরকারি। বাকিগুলো এমপিওভুক্ত অথবা বেসরকরি। এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয় পাঁচ হাজার ৫০০। তাদের মূল বেতন সরকার দেয়। তবে ভাতা ও সুবিধা নামমাত্র। তাদের শিক্ষক সংখ্যা তিন লাখেরও বেশি।
সরকারি শিক্ষকদের বাড়িভাড়া বেতনের ৪৫ শতাংশ, যেখানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা পান মাত্র ১০০০ টাকা; বেতনের ১০০ শতাংশ উৎসব ভাতা পান সরকারি শিক্ষকেরা, এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা পান মাত্র ২৫ শতাংশ; চিকিৎসা ভাতা এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা পান মাত্র ৫০০ টাকা, যেখানে সরকারি শিক্ষকেরা পান ১ হাজার ৫০০ টাকা। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পেনশন সুবিধা নেই। তাদের কোনো পেনশন নেই। মূল বেতন থেকে শতকরা ১০ ভাগ কেটে নেয়া হয়। এছাড়া কল্যাণ ফান্ড আছে। ফলে একদেশে দুই রকম নিয়ম কেন?
শিক্ষকদের বৈষম্য রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান কেমন হবে তা উপলব্ধি করার বিষয়। আবার অবহেলিত যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইবতেদায়ি মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত নয়, অনুদানভুক্ত। সাড়ে সাত হাজার ইবতেদায়ি মাদ্রাসার মধ্যে অনুদানভুক্ত আছে এক হাজার ৫১৯টি মাদ্রাসা। অনুদানপ্রাপ্ত মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেহাল দশা। তাহলে শিক্ষার মান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির(বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক শেখ কাওসার আহমেদ সংবাদমাধ্যমে বলেন,‘আমরা হিসাব করে দেখিয়েছি আমাদের সরকারি করলে সরকারের বাড়তি তেমন খরচ হবে না। শিক্ষার্থীদের বেতনও সবার সমান হবে। এখন বেসরকারি পর্যায়ে মাসে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন আছে।” যেখানে তিনি স্পষ্ট করেছেন ‘আমরা তো পাঁচটি শর্ত পূরণ করে এমপিওভুক্ত হয়েছি। যারা শর্ত পূরণ করতে পারেনি, তারা তো এমপিওভুক্ত হতে পারেনি। ফলে শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয় শিক্ষার জন্য। মান সম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত না করে যদি শিক্ষার আয়োজন সংকীর্ণ করা হয় তাহলে শিক্ষক জাতিকে কিভাবে সুশিক্ষা শিক্ষিত করবেন? মেরুদণ্ডহীন মানবদেহকে যেমন আমরা সুস্থ স্বাস্থ্যের অধিকারী বলতে পারি না। ঠিক তেমনি শিক্ষা বঞ্চিত একটি দেশকে সুস্থ জাতি বলতে পারি না। ফলে যিনি শিক্ষা দেন, সেই শিক্ষককে যদি অর্থনেতিক স্বস্তি দিতে না পারে তাহলে শিক্ষককের কাছ থেকে ভালো শিক্ষা আশা করা ঠিক না।
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ হওয়ার অনেক স্বপ্নের কথা শুনি। যেখানে বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী জিডিপির অংশ হিসেবে শিক্ষা খাতে ব্যয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে অন্যতম পেছনে। এমনকি পাকিস্তানের অবস্থানও আমাদের চেয়ে ভালো। তাহলে কেমন করে স্মার্ট দেশে পরিণত হবে? প্রশ্নের উত্তর তারাই ভালো বলতে পারবে যারা স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে। তাই উন্নত দেশের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে সময় এসেছে ‘মানবসম্পদ’ তৈরির কাজে মনোযোগ দিতে হবে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের চিকিৎসা ভাতা ১ হাজার ৫০০ টাকা করে দিতে হবে। উৎসব ভাতা অন্তত বেতনের ৫০ শতাংশ করা এবং ভবিষ্যতে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা থাকতে হবে। পেনশনের ব্যবস্থা করতে হবে।এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোকে জাতীয়করণ করে শিক্ষার মান উন্নয়ন করা। শিক্ষাখাতে বিগত কয়েক দশক ধরেই ১২% এর ঘরে থাকে বরাদ্দ। তবে দক্ষ ও সৃজনশীল মানবসম্পদ তৈরির জন্য শিক্ষায় পর্যাপ্ত বাজেট অপরিহার্য। রাষ্ট্রকে বিশেষ ভাবে নজর দেওয়া উচিত বিজ্ঞান শিক্ষার প্রচার ও প্রসার ঘটিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত, নৈতিক শিক্ষায় বলীয়ান, দক্ষ, কর্মঠ, সৃজনশীল, প্রগতিশীল ও উদ্ভাবনী চেতনায় জনবল তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৮/০৮/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
