এইমাত্র পাওয়া

দুয়া : কিছু শর্ত কিছু আদব

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক।।

দুয়ার ফলাফল চোখে দেখি বা না দেখি আমাদেরকে দুয়া করে যেতে হবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুয়ার ফলাফল একেবারেই কম দেখা যায়, বলতে গেলে দেখাই যায় না। এমন একটি ক্ষেত্র হলো, যখন মুসলমান মজলুম হতে থাকে, তাদের ওপর বিভিন্ন জায়গায় নির্যাতন চলতে থাকে, তখন দুয়া কান্নাকাটি করা হয়, চোখের পানি ফেলা হয়, কুনুতে নাযিলা পড়া হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রক্ত ঝরতেই থাকে, আগুন জ্বলতেই থাকে। একসময় আগুন জ্বলা বন্ধ হয় কিন্তু মানুষ যেভাবে দুয়া করেছিল, যেভাবে কান্নাকাটি করেছিল, সেভাবে কিছুই হয় না। তাৎক্ষণিকভাবেও হয় না, কাছাকাছি সময়েও হয় না।

তো যে সব ক্ষেত্রে ফলাফল চোখে দেখা যায় না সেসব ক্ষেত্রেও আমাদেরকে দুয়া করে যেতে হবে। দুয়া করে একথাও বলা যাবে না যে, আমি দুয়া করেছি, দুয়া কবুল হয় না। একথা বলা বেয়াদবি এবং দুয়ার মধ্যে বেবরকতির কারণ। বেবরকতির অর্থ হলো, দুয়া কবুল না হওয়া।

দুয়া কবুল হওয়ার জন্যে আল্লাহ অনেক উপায় দান করেছেন। সময় দিয়েছেন। আমল দিয়েছেন। ব্যক্তি দিয়েছেন। অর্থাৎ নির্দিষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, অমুক সময় দুয়া কবুল হয়। অমুক স্থানে দুয়া কবুল হয়। অমুক ব্যক্তির দুয়া কবুল হয়। অমুক অমুক আমলের পর দুয়া কবুল হয়। রোযাদারের দুয়া কবুল হয়। মুসাফিরের দুয়া কবুল হয়। সন্তানের জন্যে মা-বাবার দুয়া কবুল হয়। দুয়া কবুল হওয়ার কত ঘোষণা আল্লাহ কতভাবে দিয়েছেন।
দুয়া কবুল হওয়ার যেমন অনেক উপায় রয়েছে তেমনি দুয়া কবুল না হওয়ারও অনেক কারণ রয়েছে। সেগুলো থেকেও আমাদেরকে বাঁচতে হবে। আরেকটা বিষয় হলো, আমি যেভাবে চেয়েছি আমার দুয়া জানা বা অজানা কোনো কারণে সেভাবে কবুল হয়নি, তখন আমাকে দুটি কথা মনে রাখতে হবে।

এক. আমি দেখিনি তাই বলে একথা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে, আমার দুয়া কবুল হয়নি। দুয়া কবুল হওয়ার অনেক পদ্ধতি আছে। কোন পদ্ধতিতে দুয়া কবুল হয়েছে তা আমি জানি না। আল্লাহই ভালো জানেন। দুই. আমি দুয়া কবুল হতে দেখিওনি, আবার আমার কিছু ত্রুটির কারণে দুয়া কবুল হয়েছে বলেও মনে হয় না, তখনও আমার করণীয়, দুয়া করা। একেতো আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে দুয়া কবুল হয়নি। দ্বিতীয়ত যদি বাস্তবিকই দুয়া কবুল না হয়ে থাকে তাহলেও আমি দুয়া বাদ দিতে পারি না।

কী কী কারণে দুয়া কবুল হয় না। কবুল না হওয়ার অর্থ একেবারে কবুল হবে না এটা নয়। কবুল না হওয়ার অর্থ হলো, কবুল হওয়ার কোনো ওয়াদা নেই। নিশ্চয়তা নেই। নয়ত আল্লাহ তায়ালার কুদরত আছে, আল্লাহ চাইলে যে কোনো সময় যে কারো দুয়া কবুল করতে পারেন।

দুয়া কবুল না হওয়ার প্রথম কারণ হলো, হাদিস শরীফে এসেছে : আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে সে জিনিসের আদেশ করেছেন যে জিনিসের আদেশ তিনি নবীদেরকে করেছেন। তা হলো, হালাল খাও এবং সৎকাজ কর। রাসূলদেরকেও আল্লাহ সম্বোধন করে বলেছেন, তোমরা হালাল রিজিক গ্রহণ কর এবং আল্লাহর ইবাদত কর।

আল্লাহর এক বান্দা লম্বা সফরে বের হয়েছে। এত দীর্ঘ সফর যে, মাথার চুল এলোমেলো হয়ে গেছে এবং কাপড়চোপড় ময়লা হয়ে গেছে। সফরে তো এমনি দুয়া কবুল হওয়ার কথা। তার ওপর তার এই করুণ হালতে তো আরো বেশি করে কবুল হওয়ার কথা। তো সে এক বিপদে পড়ে দুহাত আসমানের দিকে প্রসারিত করে এভাবে আল্লাহকে ডাকছে, হে আল্লাহ! হে আল্লাহ! সে এভাবে দুয়া করেই যাচ্ছে।

অথচ লোকটার অবস্থা হলো, তার খাবার হারাম। যা পান করে তা হারাম। আবার যা পরিধান করে তাও হারাম। সুতরাং এর দুয়া কবুল হবে কীভাবে? তো উপার্জন হালাল না হওয়া দুয়া কবুল না হওয়ার একটি কারণ। আবার কোনো গোনাহের বিষয় আল্লাহর কাছে চাওয়া, যেমন আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করা, এটি এমনিতেও নাজায়েজ আবার দুয়া কবুল না হওয়ার একটি কারণ।

দুয়া কবুল না হওয়ার আরেকটা কারণ হলো, ব্যাপকভাবে যখন সমাজে নাহী আনিল মুনকার বন্ধ হয়ে যাবে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যখন একেবারেই ছেড়ে দেয়া হবে, ফাহেশা এবং অশ্লীলতা যখন মহামারির রূপ ধারণ করবে তখনও দুয়া কবুল হবে না। এ সকল বিষয়ে কুরআন মাজীদে সতর্ক করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে : তোমরা ওই বিপর্যয়কে ভয় কর, যা বিশেষভাবে তোমাদের মধ্যে যারা জুলুম করে কেবল তাদেরকেই আক্রান্ত করে না। (সূরা আনফাল : ২৫)।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.