অনিশ্চয়তায় শতাধিক শিক্ষার্থীর পাঠদান

গাইবান্ধাঃ জেলার ফুলছড়ি উপজেলায় ঠিকাদার এবং শিক্ষা কর্মকর্তার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং গাফিলতিতে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে শতাধিক শিক্ষার্থীর পাঠদান কার্যক্রম। বিশেষ করে নদী ভাঙনের আশঙ্কায় নির্মাণাধীন বিদ্যালয় ভবনটি স্থানান্তর ও নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ না নেওয়ায় ঠিক কবে স্কুলে যেতে পারবে শিক্ষার্থীরা, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।

নদী বেষ্টিত গাইবান্ধার চার উপজেলায় ছোট-বড় ১৬৫টি বালুচর ও দ্বীপচর রয়েছে। এই চার উপজেলার একটি ফুলছড়ি। সেখানকার দুর্গম চর দক্ষিণ খাটিয়ামারি ১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার পথে। চলতি বছর নদী ভাঙনের কবলে পড়েছে বিদ্যালয়টি।

সরেজমিনে চর দক্ষিণ খাটিয়ামারিতে গিয়ে দেখা যায়, ১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনটি চালবিহীন লোহার খুঁটির ওপর নদী থেকে মাত্র ৫০ ফুট দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে। এই বিদ্যালয়টিতে প্রায় ১২০ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। শিক্ষক আছেন ৪ জন। নদী ভাঙন থেকে বিদ্যালয়টি রক্ষায় ঠিকাদার ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের সহযোগীতা না পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রধান শিক্ষকের অনুরোধে নিজ উদ্যোগে ইতোমধ্যে নির্মাণাধীন বিদ্যালয় ভবনটির দরজা, জানালা, আসবাবপত্র ও টিনের চাল খুলে বিভিন্ন বাড়িতে নিয়ে রেখেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০২১ সালে বিদ্যালয় ভবনটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তিন বছরে ঠিকাদার কাজ করেছেন মাত্র ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ। অথচ কাজ শেষ না করেই বিদ্যালয় হস্তান্তর দেখিয়ে বিল উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে এই ঠিকাদারের বিরুদ্ধে।

দক্ষিণ খাটিয়ামারি ১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রিয়াজ আহমেদ বলেন, ‌‌‘নির্মাণ কাজ শেষ না হতেই নদী কাছে এসে গেছে। ইট, লোহার ভারি পিলার এগুলো এখনো ভাঙার কাজই শেষ হয়নি। শুনেছি ভাঙার কাজ ঠিকাদারের। কবে নাগাদ তারা ভাঙবে, কবে মেরামত করবে, এসব কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে জানায়নি। বিদ্যালয়টিতে প্রায় ১২০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। আমরা মোট চারজন শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যহত হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।’

বিদ্যালয়টির অপর সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আসলে আমাদের স্কুল ঘরটি নদী গর্ভে বিলিন হয়ে যাচ্ছে। এলজিইডি এবং শিক্ষা অফিস থেকে কোনো নির্দেশনা আসেনি। বাচ্চাদের স্কুল সময়ে গাছতলায় দাঁড়ি করিয়ে এক-দুই ঘণ্টা করে ব্রিফ দেই।’

বিদ্যালয়ের কাজ কতভাগ হয়েছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তিন বছরে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ কাজ করেছেন ঠিকাদার।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, স্কুলটা যাতে তাড়াতাড়ি নদীর কাছ থেকে সরিয়ে ভালো কোনো স্থানে দ্রুত নির্মাণ করা হয় সে আশাই করছি।

নদী সন্নিকটে আসায় বিদ্যালয়টি দ্রুত স্থানান্তর করা জরুরি হওয়ায় ইউপি সদস্য আলতাফ হোসেনকে ফোনে জানান প্রধান শিক্ষক হাবিবুল বারি। ইউপি সদস্য আলতাফ হোসেন বলেন ফোনে প্রধান শিক্ষক আমাকে বলেছেন, ‌‘মেম্বার ভাই স্কুল তো ভাঙা লাগবে, স্কুলটা ভাঙ্গি নিয়্যা আপাতত আপনার বাড়িত রাখেন। তখন আমি বললাম স্কুল ভাঙতে গেলে তো সবার সঙ্গে কথা বলতে হবে। তিনি বললেন, স্কুলটা আগে বাঁচান। এরপর আমি তড়িঘড়ি করে লোক লাগিয়ে বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষের গুরুত্বপূর্ণ আসবাবপত্র তুলে এনে নিজের বাড়িতে রেখেছি। চাল এবং দরজা-জানালা অন্য এক বাড়িতে খুলে রাখা হয়েছে।’

এদিকে বিদ্যালয়টির উপকরণ স্থানান্তর ও নতুন ভবন নির্মাণে ঠিকাদার এবং শিক্ষা কর্মকর্তার সহযোগিতা না পেয়ে নিজের হতাশার কথা বললেন বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক হাবিবুল বারি। তিনি বলেন, ‘গত ১ আগস্ট ফুলছড়ি উপজেলা শিক্ষা কমিটির মিটিংয়ে এ বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে। বিদ্যালয়ের কাজ শেষ না করেই বিদ্যালয় হস্তান্তর হয় কি করে? এমন প্রশ্ন উঠেছিল। পরে উপজেলা প্রকৌশলী লোহার খুঁটি (পিলার) তোলা এবং ইঁট হস্তান্তরের খরচ বহন করতে চেয়েছিলেন। তিনি পরে আর সেটাও করেননি। ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন না। এত লাখ লাখ টাকার লোহার পিলার এবং ইঁট চোখের সামনেই হয়তো নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।’

ফুলছড়ি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বছর ফুলছড়ি উপজেলায় নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৭টি। গত মাসের ৯ জুলাই এসব বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭টি বিদ্যালয়ের ভবন স্থানান্তরের সম্ভাব্য ব্যয় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেখিয়ে (চাহিদা) কর্তৃপক্ষকে লিখিত জানিয়েছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. বেলাল হোসেন। সেই চিঠি দেওয়ারও প্রায় একমাস হয়ে যাচ্ছে।

বিদ্যালয়টি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, কি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে ফুলছড়ি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. বেলাল হোসেন বলেন, ‘ভবন নির্মাণের কাজ শেষ না হওয়ায় ঠিকাদার আমাদেরকে স্কুল বুঝিয়ে দেয়নি। এক তারিখে (১ আগস্ট) এসব বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে। তাই, এসব কিছু হস্তান্তর এবং নির্মাণ, সবকিছুই ঠিকাদারের দায়িত্ব।’ তবে, শিক্ষার্থীদের পাঠদান অব্যাহত রাখার বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু বলতে পারেননি এই শিক্ষা কর্মকর্তা।

বিদ্যালয় ভবনের কাজ শেষ না করেই বিদ্যালয় হস্তান্তর দেখানোর বিষয়ে জানতে একাধিকবার উপজেলা প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে ঠিকাদার আব্দুল কাদের ভঁইয়া (আকাশ ভুঁইয়া) সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, ‘৩০ বস্তা সিমেন্ট কিনে রাখা হয়েছিল। বারান্দা, মেঝে এবং সিঁড়ির কাজ বাকি ছিল। রংপুর থেকে (সুপারেন্ডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার) স্যার এসে আমার স্কুল পরিদর্শন করে বললেন, টাকা নষ্ট করে লাভ কি! নদীতে কিছুদিন পর তো ভবন ভেঙেই যাবে। তারাই দায়িত্ব নেয় না, আমি কি করবো। তিনি এবং মনিটরিং কর্মকর্তা বিদ্যালয় হস্তান্তর করতে বলেছেন। আমি প্রধান শিক্ষককে স্কুল হস্তান্তর করেছি। আমার কাছে ডকুমেন্টস আছে। আমি আরও কিছু বিল পাবো।’ সূত্রঃ রাইজিংবিডি

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৬/০৮/২০২৩ 

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.