শিক্ষক শব্দটা কানে বাজতেই মনে পড়ে যায় গ্রামের স্কুলের কথা। বেত হাতে মোটা ফ্রেমের চশমাওয়ালা স্যারদের কথা। তাদের চোখে পড়া মানেই যেন অজানা এক ভয়ে অন্তর আত্মা কেঁপে উঠা। স্যার যতই আদর করুক তবুও যেন বিঘত মেপে মেপে আজন্ম এক দূরত্ব ভর করত। এই দূরত্বে ছিল শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, ভক্তি ও সম্মান। ঝুম বৃষ্টি কিংবা স্তব্ধ দুপুর বেলায় যে কণ্ঠস্বরগুলো শুনে শিহরণ জাগতো, সময় স্রোতে সেই শব্দ সুর আর নেই। কেউ কেউ বেঁচে নেই আবার কেউ কেউ অবসরে। আগের মতো দরাজ কণ্ঠ নেই, তবুও অপ্রস্তুতভাবে যদি কখনও দেখা হয়েই যায় বলে উঠেন ‘ভয় পেওনা, হাতে বেত নেই। স্মৃতি কিছু জিনিস অমীমাংসিত রেখে যায়, তার মধ্যে একটি হলো ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক।
শিক্ষাগুরুর মর্যাদা নিয়ে বাদশাহ আলমগীরের কাহিনী আমাদের সকলের জানা আছে। এরপর বহু শতাব্দী কেটে গেছে। সময়ের বিবর্তনে আজ অতীতের গৌরব আর নেই। আজ শিক্ষক ছাত্রের সম্পর্ক যে কতটা তলানিতে তা চোখ কান খোলা রাখলেই আমরা টের পাই। সাম্প্রতিক সময়ে পত্রিকায় দেখেছি বিভিন্ন বিদ্যালয়ে মর্মান্তিক ও দুঃখজনক ঘটনাগুলো । বিদ্যালয়ের বখাটে ছাত্ররা হাত তুলেছে শিক্ষকের গায়ে। এই ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কেন এসব হচ্ছে। কোথায় হারিয়ে গেল অতীতের সেই ছাত্র শিক্ষকের শ্রদ্ধা স্নেহময় সম্পর্ক! বিষয়টা ভাবতেই নজরে এলো সমস্যার উৎপত্তি আরো গভীরে।
যদি বলা হয় ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক অবনতির দায় কার বা কাদের, তবে এর উত্তর এক লাইনে নেই। একটা সামগ্রিক ব্যর্থতায় আজকের এই পরিণতির জন্য দায়ী। প্রথমত দায়ী রাজনীতির নষ্ট ছায়া, দ্বিতীয়ত পারিবারিক সুশিক্ষার অভাব, তৃতীয়ত শিক্ষকদের নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক মূল্যবোধের চরম বিপর্যয়।
চট্টগ্রামের সুনামধন্য আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের ঘটনাটিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বখাটে ছেলেটি শিক্ষকের সাথে চরম অশালীন আচরণ করেছে। তার বখাটে হওয়ার সময়কাল কয়েকদিন নয় বরং এতে লেগেছে দীর্ঘ সময়। কিশোর গ্যাং তৈরি করে ছেলেগুলো নানা অসামাজিক কাজে লিপ্ত ছিল বহুদিন ধরেই। এদেরকে লালন পালন ও প্রশ্রয়দাতা তথাকথিত সমাজসেবী রাজনীতিবিদ। যেকারণে তাদের সাহস ও মনোবল অন্য যেকোনো ছাত্র থেকে দৃঢ়। বখাটেরা ভাবে তারা যাই কিছু করুক না কেন ‘বড় ভাই’ তাদের বাঁচিয়ে নিবেন। দূর্ভাগ্যের বিষয় সেই বখাটেপনা চর্চার স্থানটি স্কুলের বারান্দা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। বলা যায় একটা জাতির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়ার আয়োজন সমাপ্ত হয়ে যায় তখনই, যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। আমাদের দেশের শিক্ষার পরিবেশ নাজুক হওয়ার পেছনে এটা প্রধানতম দায়ী।
রাজনৈতিকদের পাশাপাশি পরিবারগুলো এই সমস্যার পেছনে অন্যতম দায়ী। বাঙালির স্বভাবজাত সমস্যা অন্যের উপর আধিপত্য বিস্তার করা। তাই সমাজে যদি আমার ছেলেকে মানুষ ভয় পায়, ভয়ে চুপটি করে থাকে, বাদশাহ স্টাইলে ঘনঘন সালাম পাওয়া যায়, এ আর মন্দ কি! কয় জনের এমন কপাল থাকে, বলুনতো! সচেতনভাবে অনেক মা-বাবা সন্তানকে দুঃসাহসী করে তুলছেন সামান্য খায়েশের ইচ্ছায়। কিন্তু সে দুঃসাহসের পতন যে অত্যন্ত করুণ হয় তা বুঝতে খুব বেশি বুদ্ধির প্রয়োজন পড়ে না। আরেকদল মা-বাবার এরকম ইচ্ছা না থাকলেও তারা একেবারে বেখেয়াল তাদের সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে চলাফেরা করে, বিদ্যালয়ে তার অবস্থা কেমন। সঠিক পরিচর্চার অভাবে সন্তানরা কু-সঙ্গে নিপতিত হচ্ছে এবং ভয়ংকর হয়ে উঠছে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য, ধ্বংস করছে শিক্ষার পরিবেশ।
ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক নষ্টের পেছনে ছাত্র সম্পর্কিত উপাদানই কেবল নয় শিক্ষকদের মানসিকতা ও নৈতিক অধঃপতনও দায়ী। শিক্ষকতাকে চাকুরি হিসেবে যারা নেয়, তাদের কাছ থেকে খুব ভালো কিছু আশা করা যায়না। শিক্ষকতা একটি মহৎ পেশা, একটি পরিপূর্ণ আদর্শ ও একটি ধ্রুবতারা। যার আলোয় আলোকিত হবে সমস্ত ছাত্র সমাজ। কিন্তু অত্যন্ত দূর্ভাগ্য সেরকম আদর্শ মানের শিক্ষকের সংখ্যা এখন শূণ্যপ্রায়। শিক্ষকের লেকচার মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনবে শিক্ষার্থীরা এটাই নিয়ম, পাঠ্যপুস্তক থেকে জীবনধারা সমস্তটা পরিবর্তনে একজন শিক্ষক পালন করবে সর্বোচ্চ ভূমিকা। অথচ তার উল্টো চিত্র দেখা যায় শ্রেণি কক্ষে। পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ পুথিগত বিদ্যা উগরে দিয়েই শিক্ষক মহাশয় ক্ষান্ত হন এবং অতিরিক্ত হিসেবে মাঝেমধ্যে করেন অশ্রাব্য শব্দচয়ন। নৈতিকতা ও আচার ব্যবহার শিক্ষা দেয়া মা-বাবার পর শিক্ষকের দায়িত্ব। ছাত্ররা পড়তে পড়তে শিখবে, দেখে দেখে শিখবে। যদি শিক্ষকের আচরণই হয় উদ্ভট ও কদাকার তাহলে উনাদের কাছ থেকে কি শিখবে শিক্ষার্থীরা! এছাড়াও দলবাজী ও গ্রুপিং রয়েছে বর্তমান শিক্ষকদের মধ্যেও যা একেবারেই অপ্রত্যাশিত। জাতির বিবেক যদি স্ট্রোক করে, দেহে তো প্যারালাইসিস হবেই। সম্পর্ক নষ্টের পেছনে শিক্ষকরা কোন অংশে কম দায়ী নয় বলে আমি মনে করি।
সর্বক্ষেত্রে আমাদের মূল্যবোধের হয়েছে চরম অবনতি। মা-বাবা, শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধবসহ সমাজের সর্বস্তরে আঘাত করেছে এই অপসংস্কৃতি। ক্রমান্বয়ে সেই বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। মাদকাসক্ত ছাত্রসমাজের কাছ থেকে জাতি কিছুই আশা করতে পারেনা এবং তারই ইঙ্গিত বহন করে উল্লেখিত ঘটনাগুলো। তাহলে এখন উপায় কি?
উপায় অবশ্যই রয়েছে আমাদের হাতেই। প্রথমে পরিবার থেকে আচার ব্যবহার ও উত্তম চরিত্র গঠনের গোড়াপত্তন করতে হবে। এর সম্পূর্ণ দায়িত্ব পিতামাতা ও অভিভাবকের। সুসন্তান গড়তে হলে অল্প বয়স থেকে তৈরি করতে হবে, বয়স বেড়ে গেলে গড়ে তোলা কঠিন। ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য শেখাতে হবে পরিবার থেকেই। এরপর দায়িত্ব শিক্ষকদের। একজন ছাত্রের মনোজাগতিক গুরু মূলত শিক্ষক। তাই তিনি যেভাবে পাইডলাইন দিবেন ছাত্র সেভাবেই গড়ে উঠবে শিক্ষক যেহেতু জাতির বিবেক, তাই এই মহান দায়িত্ব পালনে ব্যক্তিগত বিবেক কাজে লাগাতে হবে। দলবাজী, গ্রুপিং, অশালীন আচরণ বাদ দিয়ে নৈতিক মানদন্ডে শিক্ষককে হতে হবে সবার সেরা। ছাত্রদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে তবে বন্ধুর মত নয়। নিজের সর্বোচ্চ মেধা মনন ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে তৈরি করতে হবে আদর্শিক প্রজন্ম। এই দায়িত্ব কঠিন বটে তবে দুরূহ নয়। শিক্ষক সমাজ তাদের দায়িত্ব যথাযথ পালন করলে সে জাতিকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় না। শিক্ষক ও সাধারণ অভিভাবক হিসেবে কাজ করেন। জনপ্রতিনিধি তথা রাজনীতিবিদগণ। তাদের হাতেই যেহেতু থাকে ক্ষমতার সিংহভাগ, তারা এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। মিছিলের যোগান না দিয়ে ভবিষ্যৎ জাতির বিজয় মিছিলে তরুণদের নিয়ে যেতে কাজ করতে হবে। নিজেদের ফায়দা হাসিলের জন্য একজন ছাত্রেরও সুন্দর ভবিষ্যৎ যাতে নষ্ট না হয়, ক্যাডার হিসেবে তৈরি না করে অন্তত বিসিএস ক্যাডার বানানোর সংকল্প করুন। এতে রাজনীতিও হবে, সমাজসেবাও হবে। সাথে সাথে প্রশাসন থেকে অনাকাঙ্খিত এই ঘটনাগুলো রোধে নিতে হবে কঠোর ব্যবস্থা।
আমাদের সামাজিক মূল্যবোধে আনতে হবে আমূল পরিবর্তন। শিক্ষককে দিতে হবে তার প্রাপ্য মর্যাদা। গুনীর কদর না থাকলে গুণীর জন্ম হবে না এটা প্রবাদে থাকলেও বাস্তবে এটির স্বরূপ দেখা যেতে হবে। শিক্ষকের হাতে শাসনের বেত আবার ফিরিয়ে দিতে হবে। এই বেতকে আপনি আক্ষরিক অর্থে নিবেন না। এটাকে শিক্ষকের শাসনের প্রতীক হিসেবে ধরতে হবে। তবেই কোমল মনের ছাত্র সেটাকে গুরুত্ব দিয়ে নিবে। শিক্ষক শাসন করবে আবার স্নেহ আদরও করবে। পরিবারের উচিত হবে শিক্ষকদের উপর আস্থা রাখা, শিক্ষকের কাজ হবে অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠা ও সততার সাথে পালন করা। ছাত্রদের মনে রাখতে হবে পৃথিবীতে যদি মানুষ হতে হয় তবে মা বাবা ও শিক্ষককে শ্রদ্ধার বিন্দুমাত্র ত্রুটি রাখা যাবেনা। উনাদের শাসন ও ভালোবাসা দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে। নিতে হবে। জগতে শিক্ষককে অশ্রদ্ধা করে, বেয়াদবী করে সফল হওয়ার কোন রেকর্ড কোন ছাত্রের নেই বরং নষ্ট ও পতিত হবার রেকর্ড চোখ খুললেই দেখতে পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে অনেক আগে। কিন্তু এখনো অনেক কিছুতেই আমরা পিছিয়ে আছি। যদি দৃঢ় সংকল্প নিয়ে প্রতিটা ক্ষেত্রে সাহসী কিছু মানুষ এগিয়ে আসতো তবে দ্রুতই বদলে যেত বাংলাদেশের চেহারা। সবাই ভাবে একদিন হ্যামিলিউনের বাঁশিওয়ালা এসে সমস্ত সমস্যা সমাধান করে দিয়ে যাবে। একুশ শতকের বাস্তবতায় এটা অলীক। এসব কেবল গল্পেই মানায়। বাস্তবে প্রতিটা ‘আমি’কে বাঁশিওয়ালা হতে হবে। নিজের স্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে, তবেই মিলবে মুক্তি। আশা করি একদিন প্রকৃত শিক্ষা ও শিক্ষকের আলোয় আমাদের মুক্তি মিলবে।
লেখক: চেয়ারম্যান, আঞ্চলিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘নয়া দালান’।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
