ময়মনসিংহঃ সিটি কলেজিয়েট স্কুল, রাধা সুন্দরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ ময়মনসিংহ শহরের শতবর্ষী এবং ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়গুলো আগে শিক্ষার্থীর প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর ছিল। এসব বিদ্যালয়ে যেমন ছিল পড়াশোনার মান, তেমনি ছিল নামডাক। শিক্ষকদের উদাসীনতা, শিক্ষক-কমিটি দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে বিদ্যালয়গুলো এখন রীতিমতো ধুঁকছে। ভালো শিক্ষার্থীরা এখন আর এসব বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চায় না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে প্রায় ফাঁকা শ্রেণিকক্ষ নিয়েই ঐতিহ্যবাহী স্কুলগুলোর দৈনন্দিন কার্যক্রম। অভিযোগ রয়েছে, অন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ভাড়া করা শিক্ষার্থী দেখিয়ে বেতন জুটছে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের।
গত ৯ থেকে ১৩ জুলাই নগরীর চারটি পুরোনো এবং ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে এগুলোর বেহাল অবস্থা দেখতে পায় সমকাল। এ চার প্রতিষ্ঠান হলো– সিটি কলেজিয়েট স্কুল, অ্যাডওয়ার্ড ইনস্টিটিউশন, মৃত্যুঞ্জয় স্কুল ও রাধা সুন্দরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। জানা গেছে, বর্তমানে এই চার বিদ্যালয়ে কাগজ-কলমে প্রচুর শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে তা নেই। বরং নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের এসব বিদ্যালয়ে ভর্তি দেখিয়ে সরকারি বই নেওয়া হয় শুধু। অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বোর্ড পরীক্ষাও দেওয়ানো হয় এসব বিদ্যালয় থেকে।
অ্যাডওয়ার্ড ইনস্টিটিউশন
সেহরা মুন্সিবাড়ি এলাকায় ১৯০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের সুযোগ আছে। রয়েছে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রম। অথচ তিনতলা ভবনের বিশাল বিদ্যালয়ের প্রায় প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ এখন শিক্ষার্থীশূন্য। গত ১২ জুলাই বেলা ৩টায় গিয়ে দেখা যায়, আড্ডায় মশগুল শিক্ষকরা। কোন ক্লাসে কত শিক্ষার্থী, তা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন প্রধান শিক্ষক খসরু বিন সাহাব। তবে খাতাপত্রে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রাথমিক শাখায় ৮৮ জন এবং মাধ্যমিকে ২৮১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে বলে দাবি প্রতিষ্ঠানের।
একটি শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করছিলেন শিক্ষক রেজাউল হক। তিনি জানান, শিক্ষার্থীতে ভরপুর ক্লাস এখন স্মৃতি। ধার করা শিক্ষার্থী দিয়ে স্কুল টিকে আছে। পাশেই দু’জন শিক্ষার্থী নিয়ে নবম শ্রেণির ক্লাস নিচ্ছিলেন শিক্ষক জালাল উদ্দিন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা অনিয়মিত। তাদের স্কুলে আনতে মোবাইল ফোনে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। দুটি ক্লাসে যাওয়ার পর অন্য কক্ষগুলোতে যেতে নিরুৎসাহিত করেন প্রধান শিক্ষক। তিনি বলেন, আগের প্রধান শিক্ষকের অব্যবস্থাপনার কারণে স্কুলের এমন অবস্থা।
রাধা সুন্দরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
১৯২৭ সালে নগরীর আদালতপাড়ায় এ স্কুলের প্রতিষ্ঠা। গত ১১ জুলাই বেলা ৩টায় স্কুলে গিয়ে কোনো শিক্ষার্থী পাওয়া যায়নি। পরদিন সকাল সাড়ে ১০টায় আবার গিয়ে দেখা যায়, ভবনের বারান্দায় সহকারী শিক্ষকরা আড্ডায় মশগুল। তারা জানান, মোট ৮ শিক্ষক ও ৩ জন কর্মচারী রয়েছে স্কুলে। কাগজপত্রে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী আছে ২১০ জন। বাস্তবে শ্রেণিকক্ষগুলো শূন্য। কাগজপত্রে শিক্ষার্থী দেখিয়ে কেবল সরকারি বই নেওয়া হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কাজীম উদ্দিনকে নিয়ে শ্রেণিকক্ষের অবস্থা দেখতে গেলে সব ক্লাস ফাঁকা পাওয়া যায়। শুধু সপ্তম ও দশম শ্রেণিতে একজন করে শিক্ষার্থী দেখা গেছে। কিছুক্ষণ স্কুলে অবস্থান করলে আরও তিন শিক্ষার্থীকে খবর দিয়ে আনা হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কাজীম উদ্দিন বলেন, ২০০২ সালের দিক থেকে স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যায় ধস শুরু হয়। কমিটির সঙ্গে দ্বন্দ্বে তৎকালীন প্রধান শিক্ষক স্কুল ছেড়ে চলে গেলে আর ঘুরে দাঁড়ানো যায়নি।
সিটি কলেজিয়েট স্কুল
রামবাবু রোডে ১৮৮৩ সালে সমাজ সংস্কারক ও শিক্ষাবিদ আনন্দ মোহন বসুর বাড়িতে স্থাপিত বিদ্যালয়টিতে কয়েক দশক আগেও প্রচুর শিক্ষার্থী ছিল। এখন চিত্র উল্টো। কাগজপত্রে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী ৩১৪ জন। গত ৯ জুলাই স্কুলটিতে গিয়ে একটি কক্ষে একজন এবং অপর শ্রেণিতে পাওয়া যায় তিনজন শিক্ষার্থী। প্রধান শিক্ষক বদরুদ্দৌলা সিদ্দিক বলেন, ২০১২ সালে তিনি যোগদানের পর থেকে স্কুলটির হারানো গৌরব ফেরানোর চেষ্টা করছেন। তবে সরকারি স্বীকৃতি ছাড়া স্কুল হওয়ায় এখানে শিক্ষার্থী কমে গেছে।
মৃত্যুঞ্জয় স্কুল
১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটিতে কাগজপত্রে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি এবং কারিগরি শাখা মিলে মোট শিক্ষার্থী আছে ৫১৭ জন। নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীও রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বেলা ৩টার দিকে স্কুলটিতে গিয়ে অল্প কিছু শিক্ষার্থী পাওয়া যায়। নবম শ্রেণিতে পাওয়া যায় একজন শিক্ষার্থীকে। দশম শ্রেণির ক্লাসে ১২ জন শিক্ষার্থী ছিল। প্রধান শিক্ষক রুকন উদ্দিনের দাবি, ২০১০ সালের আগে এ বিদ্যালয়ে প্রতি ক্লাসে ৮ থেকে ১০ জনের বেশি শিক্ষার্থী ছিল না। এখন বরং শিক্ষার্থী অনেক বেড়েছে।
সার্বিক বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহছিনা খাতুন বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান আছে শিক্ষার্থী থাকবে না, তা হয় না। সরকারের অনেক টাকা ব্যয় হচ্ছে এখানে। আমি যোগদানের পর এরই মধ্যে বিষয়গুলো নিয়ে আমার টিম কাজ করছে। বিদ্যালয়গুলোর এসব সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায়, তা আমরা দেখব।’
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৬/০৭/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
