নির্বাচনী বছরেও নিম্নমানের কাগজে বই ছাপার শঙ্কা

ঢাকাঃ সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়েছে আগামী শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবইয়ের মুদ্রণ। সরকার ভালো দরে উন্নতমানের বই ছাপতে আগ্রহী হলেও কিছু মুদ্রাকর সিন্ডিকেট করে কম দরে দরপত্র জমা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই দরে দরপত্রের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ভালো মানের বই কিছুতেই সরবরাহ করা সম্ভব নয়।

সূত্র জানায়, নির্বাচনী বছরে আগেভাগেই বিনামূল্যের বইয়ের মুদ্রণকাজ শেষ করাতে চায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। গত এপ্রিলে দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে বেশিরভাগ কাজেরই দরপত্র মূল্যায়ন শেষ হয়েছে। এখন ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়ার সময় হয়েছে। আগামী বছর প্রাথমিকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণি এবং মাধ্যমিকের অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম শুরু হবে। এই চার শ্রেণির বই ছাপাতে এখনো দরপত্র আহ্বান করা হয়নি।

উন্নতমানের বইয়ের জন্য এনসিটিবি ঠিকই ভালো দরে বই ছাপার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু প্রাথমিকের ১০ কোটির বেশি বই ছাপতে সর্বনি¤œ যে দর পড়েছে তা প্রাক্কালিত দরের তুলনায় ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ কম। আর মাধ্যমিকের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বইয়ের জন্য যে দর পড়েছে তা প্রাক্কালিত দরের চেয়ে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কম। কয়েকজন মুদ্রাকর সিন্ডিকেট করে কম দর দিয়েছে। ফলে তাদের বাইরে অন্য কারোর কাজ পাওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এবার অনেক আগেই বইয়ের কাজ শেষ করতে পারব। প্রাথমিকের বই ছাপার কাজ ১৫ অক্টোবরের মধ্যে শেষ হবে। মাধ্যমিকের দুটি শ্রেণির বইয়ের টেন্ডার এখনো বাকি। অষ্টম শ্রেণির বইয়ের টেন্ডার এ সপ্তাহেই হবে। আর নবম শ্রেণির বইয়ের টেন্ডার আহ্বান করতে আরও কিছু সময় লাগবে।’

তিনি বলেন, ‘দরপত্রের শর্ত পালনকারী সর্বনিম্ন দরদাতাকে নিয়মানুযায়ী আমরা কাজ দিতে বাধ্য। যথেষ্ট হিসাব-নিকাশ করেই আমরা দর প্রাক্কলন করেছি। তবে কিছু দরপত্রে রেট কম পড়েছে। যারাই কাজ পাক না কেন, আমরা নির্দিষ্ট সময়ে সঠিক মানের বই বুঝে নেব। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এবার যে দরে বইয়ের কাজ দিতে হচ্ছে তাতে ৬০ জিএসএমের কাগজেও বই দেওয়া কষ্টকর। অথচ দরপত্রে ৭০ থেকে ৮০ জিএসএমের কাগজে বই মুদ্রণের কথা বলা হয়েছে। ৮০ শতাংশ উজ্জ্বলতার কাগজ চাওয়া হলেও মুদ্রাকরদের দর অনুযায়ী তা দেওয়া সম্ভব হবে না। বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতি ২০২৪ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ সুবিধা দেওয়ার জন্য অনিয়মতান্ত্রিকভাবে দরপত্রের শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। তারা বলছে, ২০২৩ শিক্ষাবর্ষে সক্ষমতার বেশি কার্যাদেশ পাওয়া কয়েকটি মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের কাগজে বই সরবরাহ করে। এসব বই তিন-চার মাসের মধ্যেই পাঠের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান এপ্রিল মাসে বই সরবরাহ করলেও এনসিটিবি এই বিলম্ব নথিভুক্ত করেনি। ওই প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবৈধ সুবিধা দেওয়ার জন্য দরপত্রের শর্ত সংশোধন করে মুদ্রণ সক্ষমতার সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধিত শর্ত অনুযায়ীই ২০২৪ শিক্ষাবর্ষের বই মুদ্রণের কাজও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার মাধ্যমিকের বইয়ের প্রতি ফরমার দর নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩ টাকা ১০ পয়সা। কিন্তু কয়েকজন মুদ্রাকর ২ টাকা থেকে আড়াই টাকা পর্যন্ত সর্বনি¤œ দর দিয়েছে। বর্তমানে ভালো মানের নিউজ প্রিন্টেরই দাম টনে ৭৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা। বছরের শেষের দিকে দর আরও বাড়বে। অন্যান্য মুদ্রণসামগ্রী, বাইন্ডিং, বইয়ের কভার, পরিবহন প্রভৃতি বাবদ খরচ রয়েছে; সরকারের ট্যাক্স তো রয়েছেই। ফলে সর্বনিম্ন দরে কাজ দেওয়া হলে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপা হবে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রায় প্রতি বছর বই ছাপার আগে কাগজ ও বইয়ের মান তদারকি এবং সরবরাহের পর বইয়ের মান তদারকির কাজ পায় নির্দিষ্ট দুটি কোম্পানি। দুটি কোম্পানিরই মালিকানা কার্যত এক। তারা একই পরিবারের সদস্য। তারা মুদ্রাকর ও এনসিটিবির কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে নিম্নমানের কাগজকেও সঠিক মানের বলে প্রতিবেদন দেয়। ফলে নিম্নমানের নিউজপ্রিন্টে বই ছাপলেও মুদ্রাকরদের কোনো সমস্যায় পড়তে হয় না। আর কিছু প্রতিষ্ঠানকে সক্ষমতার বেশি কাজ দেওয়ায় বছরের শেষ দিকে কোটি কোটি বইয়ের কাজ আটকে থাকে। তখন এনসিটিবি মানের দিকে না তাকিয়ে ডিসেম্বরের মধ্যে যত বেশি সম্ভব বই সরবরাহের তাগিদ দেয়। এতে মুদ্রাকরদের সিন্ডিকেটেরই সুবিধা হয়।

বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘এবার একটি প্রতিষ্ঠানকে সক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বইয়ের কাজ দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে। তারা ২০২৩ শিক্ষাবর্ষের বই এ বছরের এপ্রিল মাসে দিলেও তাদের কোনো জরিমানা করা হয়নি; বরং তাদের জন্য সফটওয়্যার পরিবর্তন করেছে এনসিটিবি। আমরা এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এনসিটিবিতে লিখিত অভিযোগ জানাব। তাতে কাজ না হলে এনসিটিবির সামনে মানববন্ধন ও ঘেরাও কর্মসূচি দেওয়ার চিন্তা করছি আমরা।’

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২০/০৬/২০২৩   

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.