এইমাত্র পাওয়া

বিপাকে ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টরা

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ওষুধ বিতরণ ও সংরক্ষণের কাজটি করে আসছে ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টরা। কিন্তু ‘ফার্মেসি আইন-২০২৩’-এ গ্র্যাজুয়েট ছাড়া কেউ ফার্মাসিস্ট হিসেবে পরিচয় দিতে পারবেন না। কাজেই এ আইন বাস্তবায়ন হলে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তিন হাজারসহ পাস ১২ হাজার ডিপ্লোমাধারী ফার্মাসিস্ট পড়বেন বিপাকে। সরাসরি ফার্মাসিস্ট পদ ব্যবহার করতে পারবেন না তারা। সঙ্গে পেনশনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও জটিলতার মুখে পড়তে হবে বলে মনে করছেন তারা।

ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের ভাষ্য, সরকার গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের নিয়োগ দিতে চায়, নিঃসন্দেহে এটি ইতিবাচক। তবে ডিপ্লোমাধারীদের ক্ষতি যেন না হয়। নতুন আইনের বেশ কয়েকটি ধারা বাতিল কিংবা সংশোধন করা না হলে ওষুধ ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ফার্মাসিস্টদের মাঝে হতাশার সৃষ্টি হবে। নতুন খসড়া আইন চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে আগামী ৭ জুন আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠক ডাকা হয়েছে।

এমতাবস্থায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট অ্যাসোসিয়েশন। কিন্তু যাদের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, সেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাকিয়ে আছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) দিকে। সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় সংশোধনের আশ^াস দিয়েছে ডিজিডিএ ও বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৬ সালে সামরিক শাসনামলে ফার্মেসি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সে সময় গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট ছিল না। তাই তিন বছরের কোর্স করা ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের হাসপাতালসহ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ২০১১ সালে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে জারি করা অধ্যাদেশসমূহ অনুমোদন ও সমর্থন বিলুপ্ত করা হয়। এরপর ২০১৩ সালে ফার্মেসি আইনের নতুন খসড়া প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু মাঝে দশ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো তা চূড়ান্ত করা যায়নি। এবার “খসড়া ফার্মেসি আইন-২০২৩” নামে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা এখন চূড়ান্তের পর্যায়ে।

তবে এই আইনকে ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ও টেন্ডারধারী একাধিক গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ডিপ্লোমাধারী ফার্মাসিস্টদের। এ জন্য তারা বেশকিছু সংশোধনীও দিয়েছে। তবে তাদের অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়নি।

প্রায় ৯ বছর ধরে মুগদা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে কর্মরত ফার্মাসিস্ট নাছির আহাম্মেদ রতন। তিনি বলেন, ‘ফার্মেসি অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ অনুসারে আমাদের নিয়োগ এবং চাকরি বিধিমালা অনুসারে আমাদের কর্মপরিধি নির্ধারিত। এমতাবস্থায় ফার্মেসি আইন-২০২৩ এর বিতর্কিত ২, ৫ ও ৪৪ ধারা বাতিল অথবা সংশোধন না করে পাস করা হলে রাষ্ট্রীয় ওষুধ ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ফার্মাসিস্টদের মাঝে হতাশা নেমে আসবে। পাশাপাশি প্রশাসনিক ও সামাজিকভাবে পেনশন ও পদবি সংক্রান্ত সমস্যার সৃষ্টি করবে।’

বাংলাদেশে ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট অ্যাসোসিয়েশন বলছে, দেশে এই মুহূর্তে ডিপ্লোমাধারী ফার্মাসিস্ট পাস করা রয়েছে ১২ হাজারের মতো। এর মধ্যে নিবন্ধিত ফার্মাসিস্ট ৫ হাজার ৭০০ জন। এর মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালনায় ৩৭টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশাপাশি বিশেষায়িত ও টারশিয়ারিসহ ৫১৭টি সরকারি হাসপাতালে কর্মরত আছেন তিন হাজার ২৮৬ জন।

ফার্মাসিস্টদের এ সংগঠনের মুখপাত্র পলাশ দাস বলছেন, ‘সরকারি বিধি মোতাবেক ডিপ্লোমা করে ১৬ বছর ধরে আমি ফার্মাসিস্ট হিসেবে কাজ করছি। সরকারি নথিতেও আমার পদবি ফার্মাসিস্ট। অথচ এই আইন পাস হলে আমি আর ফার্মাসিস্ট পরিচয় দিতে পারব না। তাহলে তিন বছর কারাদণ্ড এবং দুই লাখ টাকা জরিমানা হবে।

সংগঠনটির সভাপতি মাসুক হোসেন চৌধুরী বলেন, “ভারত ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশগুলোতেও ফার্মাসিস্টরা ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরিতে সেবা দেয়। বাংলাদেশেও তাই। সরকার এখন গ্র্যাজুয়েটদের নিয়োগ দিতে চাচ্ছে। এটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু সরকারি বিধি অনুযায়ী আমরাও ফার্মাসিস্ট। এখন সংশোধনের মাধ্যমে আমাদের অবৈধ করা হলে সব মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ফার্মাসিস্টরা বিপদে পড়বে, আইনি জটিলতা শুরু হবে।”

ফার্মাসিস্টদের নিবন্ধন প্রদান ও তদারকির দায়িত্ব বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের। সংস্থাটির তথ্যমতে, দেশে ১৯ হাজার গ্র্যাজুয়েট এবং প্রায় ছয় হাজার ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট রয়েছে। সরকারের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারি কর্মকমিশনের মাধ্যমে ৬৭ ভাগ গ্র্যাজুয়েট এবং ৩৩ ভাগ ডিপ্লোমাধারীকে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে আসছে সংস্থাটি। তবে আজও তার বাস্তবায়ন হয়নি। এটি করা গেলে এই জটিলতার সৃষ্টি হতো না বলে মনে করেন কাউন্সিলের সচিব মাহবুবুল হক। একই সঙ্গে ডিপ্লোমাধারীদের বাদ দিয়ে কখনো এগোনো যাবে না বলেও মত দেন তিনি।

মাহবুবুল হক বলেন, ‘ডিপ্লোমাধারী ফার্মাসিস্টরা এ ব্যাপারে একটি স্মারকলিপি দিয়েছিল আমার কাছে, এরই মধ্যে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। আইনের বিষয়টি তারাই দেখে। আইনটি সংশোধনে বিশ^বিদ্যালয় থেকে শুরু করে প্রত্যেক স্টকহোল্ডার তাদের অভিমত দেয়। তবে এ আইন পাস হতে এখনো অনেক ধাপ বাকি। তাদের প্রস্তাব আগামী সভায় যেন ওঠে, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নিয়েছি। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ বিশ^মানের ওষুধ তৈরি ও রপ্তানি করে। এক্ষেত্রে ফার্মাসিস্টরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডাক্তাররা ওষুধ লিখে দেন কিন্ত কোন মাত্রায় সেটি প্রয়োগ করতে হবে তা নির্ধারণ করেন ফার্মাসিস্টরা। পাশাপাশি ওষুধ সংরক্ষণ, সরবরাহের কাজও তারাই করেন। গ্র্যাজুয়েটের পাশাপাশি ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদেরও প্রয়োজন আমাদের। তাই সবার সুরক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে আইনের সংশোধন করা উচিত।’

নতুন খসড়া ফার্মেসি আইনে বলা হয়েছে, ডিপ্লোমাকারীরা ‘ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট’ হিসেবে পরিচয় দেবেন। আর এখানেই আপত্তি ডিপ্লোমাধারীদের। তারা চান ‘ফার্মাসিস্ট (ডিপ্লোমা)’ ব্যবহার করতে।

এ নিয়ে গত ২৯ ও ৩০ মে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আইনের সংশোধন চেয়ে চিঠি দেয় ফার্মাসিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম আমাদের সময়কে বলেন, ‘২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী বলার পর আইনটি সংশোধনে অনেক মিটিং হওয়ার পর এ পর্যন্ত এসেছে। তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ দেখভাল করছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। সংশোধিত আইন কতটা এগিয়েছে, কোন পথে আছে, আমার জানা নেই। পুরো বিষয়টি তারা দেখছে। আজ পর্যন্ত আমরা এ সংক্রান্ত সভায় যেতে পারিনি।’

জানতে চাইলে ডিজিডিএর পরিচালক মো. আসরাফ হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, ‘প্রস্তাবিত খসড়া আইনের যে জটিলতার কথা বলা হচ্ছে সেটি হওয়ার কথা নয়। আইন সংশোধনের ফলে ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের কোনো সমস্যা হলে সেই অনুযায়ী সংশোধন করতে হবে। এ জন্য কমিটিও করা হয়েছে। তারাই বিষয়গুলো দেখবে।’

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৫/০৬/২০২৩   

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়

 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.