ঢাকাঃ রাজধানীর সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষক ক্লাস শেষে হন্তদন্ত হয়ে বিভাগীয় কার্যালয়ের দিকে যাচ্ছিলেন। পরে কার্যালয়ে গিয়ে তিনিসহ অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, শিক্ষকস্বল্পতার কারণে তাঁদের প্রায় প্রতিদিনই চাপে থাকতে হয়।
৮ মে এই বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁরা জানান, বিভাগে শিক্ষক আছেন চারজন। উচ্চমাধ্যমিক থেকে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তরে ক্লাস, পরীক্ষা—সবই তাঁদের সামলাতে হয়। তাঁদের বাইরে একজন ‘অতিথি শিক্ষক’ আছেন।
পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের এই কলেজ ছয় বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত হয়। লক্ষ্য ছিল মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু তা অর্জনে অনেকটাই পিছিয়ে কলেজটি।
কারণ হিসেবে সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষকেরা বলছেন, শিক্ষকের পর্যাপ্ত সংখ্যা ও মানের ওপর গুণগত শিক্ষা অনেকাংশে নির্ভর করে। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে এখন শিক্ষক আছেন ৩৩ জন। এই বিভাগে স্নাতক শ্রেণিতে প্রতিবছর ভর্তির সুযোগ পান ১৫০ জন।
অন্যদিকে সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগে প্রতিবছর ভর্তি হন ১৭০ জন। এর পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতেও প্রতিবছর ভর্তি হন কয়েক শ শিক্ষার্থী।
শিক্ষকসংকট শুধু সোহরাওয়ার্দী কলেজেই নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মোট সাতটি কলেজের অবস্থা কমবেশি একই। বাকি কলেজগুলো হলো ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুরের সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে কলেজগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। এর আগে কলেজগুলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ভুক্ত ছিল।
সাত বড় কলেজে ওপরের শ্রেণিতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার বিষয়টিও সমস্যা হিসেবে দেখছেন শিক্ষকেরা। আছে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি। তাঁরা বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়ার পর এসব কলেজের শিক্ষকদের কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে না, যা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দেওয়া হতো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, এখন সাতটি কলেজে সময়মতো পরীক্ষা হচ্ছে। ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও বেড়েছে। তবে কলেজগুলোতে তুলনামূলক শিক্ষার্থী বেশি। শিক্ষক না বাড়ালে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া কঠিন। বিদ্যমান সমস্যার সমাধানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেও মনোযোগী হতে হবে। এ বিষয়ে তাঁরা প্রস্তাব তৈরি করে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বসার উদ্যোগ নিয়েছেন।
শিক্ষকস্বল্পতা, মানসম্মত শিক্ষা কতটা সম্ভব
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য বলছে, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বর্তমানে গড়ে ১৯ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১ জন শিক্ষক আছেন। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাড়ে ৩৭ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য ২ হাজারের বেশি শিক্ষক আছেন। অথচ সাতটি কলেজে দেড় লাখের বেশি শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক আছেন ১ হাজার ২২৭ জন।
সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে গড়ে ১১২ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১ জন শিক্ষক আছেন।
সোহরাওয়ার্দীর পাশেই কবি নজরুল সরকারি কলেজে প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য ১২০ জন শিক্ষক আছেন। কলেজের অধ্যক্ষ আমেনা বেগম বলেন, শিক্ষকসংকটের কারণে তাঁরা সমস্যায় আছেন।
দেশের অন্যতম পুরোনো ঢাকা কলেজে এখন সব মিলিয়ে প্রায় ১৯ হাজার শিক্ষার্থী পড়েন। এ কলেজে শিক্ষক কিছুটা বেশি। তবু গড়ে ৭৮ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১ জন শিক্ষক।
২০১৯ সালের নভেম্বরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে এক সভায় সাত কলেজের অধ্যক্ষেরা প্রতিটি বিভাগে অন্তত ১৬ জন করে শিক্ষক নিয়োগের দাবি তুলেছিলেন। যদিও তা বাস্তবায়িত হয়নি। শিক্ষকেরা বলছেন, এত কম শিক্ষকে মানসম্মত শিক্ষা সম্ভব নয়।
শ্রেণিকক্ষসংকট, ভবন পড়ে আছে
সোহরাওয়ার্দী কলেজে ছোট-বড় ২৬টি শ্রেণিকক্ষ আছে। সরেজমিনে প্রাণিবিদ্যা বিভাগে দেখা যায়, বিভাগের জন্য তুলনামূলকভাবে বড় একটি শ্রেণিকক্ষ আছে। তবে শ্রেণিকক্ষের ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। একটি ছোট সেমিনারকক্ষেও অল্প কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাসের ব্যবস্থা আছে। আরেকটি ছোট কক্ষ দুই বিভাগ মিলে ব্যবহার করে। কলেজটিতে নেই আবাসিক হল, আবার যাতায়াতের জন্য নেই কোনো বাসও। ফলে শিক্ষার্থীদের সমস্যায় পড়তে হয়।
সমস্যাগুলো সবার জানা উল্লেখ করে কলেজের অধ্যক্ষ মোহসীন কবীর বলেন, এখন সমাধান হওয়া দরকার।
শ্রেণিকক্ষের সংকট কবি নজরুল সরকারি কলেজেও। ঢাকা কলেজের শ্রেণিকক্ষের সংকট কাটাতে কলেজ ক্যাম্পাসে প্রায় দেড় বছর আগে ১০ তলা নতুন ভবন শেষ হলেও লিফট না থাকায় ওপরের তলাগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
