সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সংকট চরমে

ঢাকাঃ  খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলায় সরকারি মাধ্যমিক স্কুল মাত্র একটি। নাম রানী নিহার দেবী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। স্কুলটিতে ছাত্র ও ছাত্রী মিলিয়ে শিক্ষার্থী আছে ৪৪২ জন, যার মধ্যে অধিকাংশই ছাত্রী। তবে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজনও শিক্ষিকা নেই। ১১ জন শিক্ষককের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র চারজন। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদও শূন্য। যে চারজন শিক্ষক আছেন, তাদের মধ্যে একজন তিন মাস পর অবসরে যাবেন। এ অবস্থায় স্কুলটি কিভাবে চলছে ও চলবে সেই উত্তর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কাছে অজানা। স্কুলটির সিনিয়র শিক্ষক নাঈমূল হক বলেন, সরকারি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষক নেই। তিনজন কর্মচারীর মধ্যে আছেন মাত্র একজন। অথচ চলতি বছর নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। কিন্তু শিক্ষক সংকটের কারণে এখানে শিক্ষা যেন থমকে গেছে।

এমন অবস্থায় অসংখ্যবার সরকারি দপ্তরে শিক্ষক চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানান মানিকছড়ি উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তা মো. লিয়াকত। তিনি বলেন, বারবার আশ^াসও মিলেছে। কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যাদেরকে এখানে পোস্টিং দেওয়া হয়, তারাই কোনো না কোনোভাবে নাম কেটে অন্য স্কুলে চলে যান বলে শুনেছি।

শুধু মানিকছড়ি নয়, দেশের পার্বত্য অঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা, চরাঞ্চল ও অধিকাংশ উপজেলার সরকারি স্কুলের চিত্র অনেকটা একই রকম। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) যথাযথ পদক্ষেপের অভাব, নতুন শিক্ষক নিয়োগের পরও জেলা ও মহানগরে পোস্টিং এর জন্য দায়ী। অন্যদিকে এর বিপরীত চিত্র দেখা যায় রাজধানীসহ মহানগরী ও জেলা পর্যায়ের সরকারি স্কুলগুলোতে। ঢাকার তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মোট শিক্ষকের সংখ্যা ৫১ জন। বিধি অনুযায়ী এখানে ২৫ জন সিনিয়র শিক্ষক ও ২৫ জন সহকারী শিক্ষক থাকবেন।

কিন্তু স্কুলটিতে আছেন মাত্র ১০ জন সহকারী শিক্ষক। বাকি ৪০ জনই সিনিয়র শিক্ষক। শুধু তাই নয়, প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বে আছেন নুরুন্নাহার। তিনি শুধুই একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক নন, একটি জেলার শিক্ষা কর্মকর্তাও।

এসব বিষয়ে মাউশির মাধ্যমিক শাখায় যোগাযোগ করা হলে কর্মকর্তারা পার্বত্য ও উপকূলীয় অঞ্চলে শিক্ষক ঘাটতির বিষয়টি স্বীকার করেন। কতজন শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে তা জানতে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়।

জানতে চাইলে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ বলেন, সবাই গুণগত শিক্ষার কথা বলেন। গুণগত শিক্ষার জন্য দরকার ভালো শিক্ষক। কিন্তু শিক্ষায় এখন শিক্ষক সংকট প্রকট। আমরা বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছি। সর্বশেষ শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিসিএস প্যানেল থেকে শিক্ষক নিয়োগের জন্য পিএসসিতে আবেদন করার কথা।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, কলেজ পর্যায়ে একটি বিষয়ে একজন অধ্যাপক ও দুজন সহকারী অধ্যাপক থাকবেন। একটি বিষয়ে তিনজন অধ্যাপক থাকার সুযোগ নেই। অদৃশ্য কারণে ঢাকার সব সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে ৮০ ভাগই সিনিয়র শিক্ষক। তিন বছর পর বদলির নিয়ম হলেও যুগের পর যুগ একই স্কুলে শিক্ষকতা করছেন তারা। বদলি ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার কারণেই এমন পরিস্থিতি দিনের পর দিন চলে আসছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দেশে ৩৫১টি সরকারি মাধ্যমিক স্কুল আছে।

এসব স্কুলে সহকারী শিক্ষকের পদে কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা ১১ হাজার। সহকারী শিক্ষকের পদ সাড়ে ১২ হাজার। এর মধ্যে দেড় হাজারের বেশি পদ শূন্য। প্রতিদিন গড়ে ৩০-৪০ জন শিক্ষক অবসরে যাচ্ছেন। সর্বশেষ ২০২২ সালে সরকারি মাধ্যমিকে দুই হাজার শিক্ষকের নিয়োগও দেওয়া হয়। কিন্তু এসব শিক্ষককে শহর অঞ্চলে পোস্টিং দেওয়ায় সমস্যা কমার পরিবর্তে আরও বেড়েছে। এর ফলে সরকারি মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক সংকট প্রকট আকার নিয়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (বিদ্যালয়) বেলাল হোসাইন বলেন, নতুন শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক সমন্বয় করতে গিয়ে শিক্ষক সংকটের সমাধান হয়নি। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকটের তালিকা চেয়েছে। এই তালিকা আমরা প্রস্তুত করছি। বছরে দুইবার এই তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

৭৫ ভাগ স্কুলে নেই সহকারী প্রধান শিক্ষক ॥ সরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে সহকারী প্রধান শিক্ষক নেই বললেই চলে। বর্তমানে মাত্র ৮০টি বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক রয়েছে। মাউশির কর্মকর্তারা বলছেন পরিস্থিতি এমন যে, আগামী কয়েক বছরে একটি বিদ্যালয়েও সহকারী প্রধান শিক্ষক থাকবে না। এর জন্য নীতিমালা পরিবর্তন এখন অপরিহার্য।

মাউশি জানায়, ২০২১ সালের ৩০ জুন সরকারি মাধ্যমিকের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার শিক্ষককে পদোন্নতি দিয়ে সিনিয়র শিক্ষক করা হয়। যার গ্রেড নবম ও নন ক্যাডার। এদিকে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে যিনি সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদে যোগদান করছেন তার পদও নবম কিন্তু ক্যাডার। মূলত সিনিয়র শিক্ষক পদ ও সহকারী প্রধান শিক্ষক পদের গ্রেড একই হওয়ায় সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

তবে এই বিষয়ে নীতিমালা পরিবর্তন হলে পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন মাউশি পরিচালক বেলাল হোসাইন। তিনি বলেন, নবম গ্রেডের নন ক্যাডার পদটি ক্যাডারের মাধ্যমে পদোন্নতি দেওয়া যেতে পারে। নীতিমালা পরিবর্তনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুরোধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিলেই সমস্যা সমাধান সম্ভব।

সহাকারী শিক্ষকরা জানান, সরকারি মাধ্যমিকের সংকট সমাধানে একটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তর এখন সময়ের দাবি। প্রয়োজন পদ সোপান। কিন্তু এই ধরনের উদ্যোগ না থাকায় মেধাবীরাও শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়েও চাকরি বদল করছেন।

নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে বাধা ॥ চলতি বছর ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমের আলোকে নতুন পাঠ্যপুস্তক ও শিখন কার্যক্রমের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। নতুন কারিকুলামে শিক্ষকদের ভূমিকাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বেশির ভাগ বিষয়ে ৫০ শতাংশ নম্বরের জন্য পরীক্ষা ও বাকি ৫০ শতাংশের ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হবে শ্রেণিকক্ষে, যা দেখভাল করবেন শিক্ষকরা। অথচ দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে অধিকাংশ শিক্ষক বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত নন। যেমন গণিতের শিক্ষক বাংলা পড়ান, আবার ধর্মের শিক্ষক ইংরেজি পড়াচ্ছেন। এর পাশাপাশি শিক্ষক সংকট অব্যাহত থাকলে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন অসম্ভব বলে মনে করেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক জনকণ্ঠকে বলেন, শিক্ষা যদি জাতির মেরুদ- হয়, তবে শিক্ষক শিক্ষার মেরুদ-। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক অনুপাত ঠিক না থাকলে ভালো পাঠদান সম্ভব নয়। অথচ আমাদের দেশে প্রচুর শিক্ষিত তরুণ রয়েছে যারা শিক্ষক হতে চান। দ্রুত এ বিষয়ে সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ না নেওয়া হলে অবশ্যই শিক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দ্রুত এর বিকল্প উপায় খুঁজে বের করার পাশাপাশি দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের তাগিদ দেন তিনি।

শিক্ষক নিয়োগে ধীরগতি, আর সব নিয়োগ কেন্দ্রীয়ভাবে হওয়ায় সংকট বেড়েছে বলে মনে করেন জাতীয় শিক্ষাক্রম উন্নয়ন ও পরিমার্জন কোর কমিটির সদস্য এম তারিক আহসান। জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, সরকারি পর্যায়ে নীতি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। তবে সাময়িকভাবে এই সমস্যা মোকাবিলায় টিম টিচিং ও ক্লাস্টারভিত্তিক শিক্ষকদের পাঠদান করা প্রয়োজন। এর বাইরে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে রিমোট লার্নিং করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, এসব সংকট দূর করতে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) একটি উদ্যোগ নিয়েছে। যে উদ্যোগ একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। এমন একটি ফ্রেম ওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে, যার ফলে শিক্ষক নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতির বিষয়ে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা উতরানো সম্ভব হবে।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৭/০৫/২০২৩  

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তা’য়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.