দেশে এক কোটি মানুষের জন্য মাত্র তিন অধ্যাপক!

ঢাকাঃ দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে হাঁপানিসহ বক্ষব্যাধিসংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের রোগের সেবাদানে যতসংখ্যক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দরকার তা নেই। অ্যাজমা (হাঁপানি), যক্ষ্মা (টিবি), সিওপিডি’র (দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা) মতো চিকিৎসায় সরকারি পর্যায়ে অধ্যাপকের জন্য সৃষ্ট পদ রয়েছে মাত্র তিনটি। এর মধ্যে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে দুটি এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজে একটি অধ্যাপক পদ রয়েছে। গত ১৪ বছরেও অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকের নতুন পদ সৃষ্টি হয়নি। এতে করে রোগীরা হাসপাতালে এসেও পূর্ণাঙ্গ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এমন পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বের মতো মঙ্গলবার দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব হাঁপানি দিবস-২০২৩। প্রতিবছর মে মাসের প্রথম মঙ্গলবার হাঁপানি দিবস পালিত হয়। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো- ‘অ্যাজমা কেয়ার ফর অল।’

হাঁপানি বা অ্যাজমা শ্বাসনালির দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত রোগ। হাঁপানি রোগীদের ফুসফুসের শ্বাসনালি সরু হয়ে যায় এবং ফুলে যায়। যার ফলে শ্বাস নিতে অসুবিধা হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩০ কোটি মানুষ হাঁপানিতে আক্রান্ত। বাংলাদেশে বর্তমানে এক কোটির বেশি মানুষ হাঁপানি সমস্যায় ভুগছেন। ১ থেকে ১৫ বছর বয়সি শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার বেশি। বর্তমানে গ্রামের তুলনার শহরের অধিবাসীদের মধ্যে রোগটির প্রাদুর্ভাব বেশি পরিলক্ষিত হয়। হাঁপানির কিছু প্রধান কারণের মধ্যে রয়েছে বায়ুদূষণ, পারিবারিক ইতিহাস, অ্যালার্জি, পেশাগত এক্সপোজার যেমন-রাসায়নিক ধোঁয়া, ধুলা এবং ধূমপান ইত্যাদি। হাঁপানির উপসর্গগুলো হলো-শ্বাসকষ্ট, কাশি, বুকে বাঁশির মতো শব্দ হওয়া, বুকে চাপ অনুভূত হওয়া বা দমবদ্ধভাব।

সূত্র জানিয়েছে, সারা দেশের সরকারি হাসপাতালে বক্ষব্যাধি রোগীদের চিকিৎসাদানের জন্য এক যুগেরও বেশি সময় আগে সীমিতসংখ্যক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। তারাই জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল ও চট্টগ্রাম মেডিকেলসহ কয়েকটি হাসপাতালে কাজ করছেন। এর বাইরে সরকারি হাসপাতালে বক্ষব্যাধি চিকিৎসায় পদহীনভাবে ৩০০ থেকে ৪০০ জনের মতো বিশেষজ্ঞ আছেন। যারা বক্ষব্যাধির চিকিৎসক হয়েও মেডিসিন ও ইএনটিসহ বিভিন্ন বিভাগে সেবা দিচ্ছেন। জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. খায়রুল আনাম বলেন, ‘আমার হাসপাতালেই দৈনিক গড়ে বহিঃ, জরুরি ও অন্তঃবিভাগ মিলে হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নেন। সারা দেশের হাসপাতালেই এসব রোগীর চাপ রয়েছে। যা সামাল দিতে এই মুহূর্তে শুধু আটটি পুরাতন মেডিকেলেই সহকারী, সহযোগী ও অধ্যাপক মিলে ২৫০ থেকে ৩০০টি পদ সৃষ্টি জরুরি। আমি পরিচালকের দায়িত্ব নেওয়ার পর পদ সৃষ্টির চেষ্টা করছি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করছি। সম্প্রতি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরে যোগাযোগের পর ২৬৭টি পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া চলছে। সেখান থেকেও কাটছাঁট করে সহকারী, সহযোগী ও অধ্যাপকের জন্য মাত্র ৬০টি পদ অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়াধীন আছে।’

সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা আরও বলেন, দেশে রেসপিরেটেরি মেডিসিন ও থোরাসিক সার্জারি বিষয়ে বিভিন্ন পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন কোর্স এম.ডি (চেস্ট ডিজিজি/পালমনোলজি), এফসিপিএস (রেসপিরেটেরি মেডিসিন) ডিটিসিডি, এমএস ও এফসিপিএস (থোরাসিক সার্জারি) চালু আছে। যার মধ্যে প্রতিবছর অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক (পালমনোলজিস্ট ও থোরাসিক সার্জন) তৈরি হচ্ছে। এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা যোগ্য পদ ও পদায়নের জন্য অপেক্ষায় আছেন। পদ ও পদোন্নতি না থাকায় অনেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মেডিকেল অফিসার, সহকারী রেজিস্ট্রার ও রেজিস্ট্রার হিসাবে কাজ করছেন।

অথচ এই মুহূর্তে সরকারি হাসপাতালগুলোর রেসপিরেটিরি মেডিসিন বিষয়ে অধ্যাপকের ৩টি পদ রয়েছে। এছাড়া সহযোগী অধ্যাপকের পদ ১৪টি। যাদের ৯ জনই জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউিট হাসপাতালে। সহকারী অধ্যাপকের ১৯টিসহ সরকারিতে বক্ষব্যাধি বিষয়ে ৩৬টি বিশেষজ্ঞ পদ রয়েছে। নতুন পদ সৃষ্টি না হওয়ায় অনেক চিকিৎসক মেডিকেল অফিসার হিসাবেই অবসরে যাচ্ছেন।

মহাখালীর ৬৭০ শয্যার জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউিট ও হাসপাতালের সেবা তত্ত্বাবধায়ক ডা. আব্দুল্লাহ আল মেহেদি বলেন, তাদের হাসপাতালে রেসপিরেটরি মেডিসিন বিষয়ে অধ্যাপকের জন্য সৃষ্ট পদ মাত্র ২টি। দীর্ঘদিন পর গত সপ্তাহে একজনকে পদায়ন করা হয়েছে। এখনো একটি পদ শূন্য রয়েছে। সহকারী অধ্যাপকের (চেস্ট মেডিসিন) জন্য সৃষ্ট ৩টি পদের মধ্যে দুটিই শূন্য রয়েছে। থোরাসিক সার্জারিতে অধ্যাপকের একটি পদ থাকলেও শূন্য এবং থোরাসিক সার্জারির সহযোগী অধ্যাপকের দুটি পদের সব শূন্য। সার্জারিতে সহযোগী অধ্যাপকের একটি পদ, সেটিও শূন্য। এনেস্থেসিওলোজির অধ্যাপকের একটি পদ, সহযোগী অধ্যাপক (এনেস্থেসিওলোজি) ৩টির সব এবং সহযোগী অধ্যাপক (এনেস্থেসিওলোজি) চারটির মধ্যে ৩টি শূন্য পড়ে রয়েছে। প্যাথলজি ও মাইক্রোবায়োলজি অধ্যাপকের পদ শূন্য পড়ে আছে। সবমিলে বিভিন্ন পদে ২৩ জন চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে।

চিকিৎসকরা বলেন, হাঁপানিসহ শ্বাসতন্ত্রের রোগের সেবায় প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসক না থাকার বড় কারণ সংশ্লিষ্ট বিভাগের সিনিয়রদের অবহেলা ও আত্মকেন্দ্রিকতা। ফলে নতুন করে পদ তৈরি হচ্ছে না। পদ সৃষ্টি ও সেবাদানের কাঠামো কম থাকায় বক্ষব্যাধি চিকিৎসকদের পদোন্নতি ও পদায়ন হচ্ছে না। যার প্রভাব পড়ছে চিকিৎসাদানে।

এদিকে বিশ্ব হাঁপানি দিবস উপলক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারিভাবে সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দ্য চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোশিয়েশন অব বাংলাদেশের ৪১তম বাৎসরিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভা শেষে বৈজ্ঞানিক সম্মেলন হবে। এছাড়া জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও সংস্থার উদ্যোগে সচেতনতামূলক আলোচনা সভা, শোভাযাত্রা, লিফলেট বিতরণসহ নানা কর্মসূচি পালিত হবে।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০১/০৫/২০২৩    

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.