নিজস্ব প্রতিবেদক, পটুয়াখালীঃ জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলার টুঙ্গিবাড়ীয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে পাহাড়সম অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। চার জন কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে ২২ লক্ষ টাকা উৎকোচ গ্রহণ এবং এই কর্মচারীদের এমপিওভুক্তি করানোর নামে জন প্রতি আরও ৪০ হাজার টাকা করে উৎকোচ নেওয়া, বিদ্যালয় থেকে প্রাপ্য আয় ব্যাংকে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা, ম্যানেজিং কমিটি ছাড়াই স্বাক্ষর জাল করে বেতন-ভাতা উত্তোলন করাসহ একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে এই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টুঙ্গিবাড়ীয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চার জন কর্মচারী মো: জিবুল হাসান (নৈশ প্রহরী), মো: জিএস মিয়া (অফিস সহায়ক), রাহিমা আক্তার খাদিজা (আয়া), মো: আবু তালেব (নিরাপত্তা কর্মী) নিয়োগ দিয়ে প্রায় ২২ লক্ষ টাকা উৎকোচ গ্রহণ এবং বেতন-ভাতা অনলাইনে ছাড় করানোর জন্য অফিস খরচের কথা বলে চল্লিশ হাজার টাকা করে চার জনের কাছ থেকে মোট এক লক্ষ ষাট হাজার টাকাসহ সর্বমোট তেইশ লক্ষ ষাট হাজার টাকা আত্মসাৎ করে শূন্য থেকে কোটি টাকার মালিক হয়ে সুদের ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। এর আগে গত ০৮/০৯/২০২০খ্রি: থেকে ০৩/০৬/২০২১ তারিখ পর্যন্ত প্রায় ০৪ মাসের বেশি সময় ধরে ম্যানেজিং কমিটি গঠন না করে সভাপতির স্বাক্ষর জাল-জালিয়াতি করে সকল অর্থনৈতিক কার্যক্রম সম্পন্ন করেন।
নতুন নিয়োগকৃত চার জন কর্মচারীর এমপিওভুক্তির ব্যাপারে ম্যানেজিং কমিটি ১০ মার্চ ২০২৩ তারিখ পত্রের মাধ্যমে দায়িত্ব প্রদান করলেও তাদের এমপিওভুক্তির কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করে ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্তকে অবজ্ঞা করার অভিযোগ উঠেছে।
এর আগে ২০১৭ সালে তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটি কর্তৃক বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষার জন্য গঠিত অডিট কমিটির সদস্যদের সাথে অডিট কার্যক্রম সম্পন্ন করতে সহযোগিতা না করে অডিট কাজে বাধা সৃষ্টি করেছিলেন। বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের টাকা বিদ্যালয়ের ব্যাংক একাউন্টে জমা না রেখে নিজ ইচ্ছামত ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্ত ব্যতিরেকে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে নগদ লক্ষ লক্ষ টাকা হাতে রেখে আর্থিক অনিয়ম করেন অডিট কমিটির রিপোর্ট থেকে তার প্রমাণ মেলে। বিদ্যালয়ের ০৩ টি আলমারী থাকা সত্ত্বেও বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র যেমন-হাজিরা খাতা, রেজ্যুলেশন বহি, ক্যাশ বহি, ভাউচার, টালি খাতাসহ গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিজ বাড়ীতে রেখে বার বার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস সমূহ অডিট কমিটির নিকট প্রদর্শন করেননি।
এছাড়াও বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির নিয়মিত সভা আহ্বান করার ক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষকের সেচ্ছাচারী মনোভাবের কারণে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। চলতি মাসের ২ তারিখে সভাপতি সাধারণ সভা সাত কর্মদিবসের মধ্যে আহ্বান করার চিঠি দিলেও তিনি সভা আহ্বান করেননি।
বিদ্যালয়ের ২০১০ ইং সাল থেকে ২০১৫ ইং সাল পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারী অনুদানে উন্নয়নমূলক কোনো কাজ না করে সরকারি বরাদ্ধের টি-আর, কাবিখার চাল বিক্রির সমুদয় টাকা আত্মসাৎ করেন বলে পূর্বের ম্যানেজিং কমিটি, বর্তমান ম্যানেজিং কমিটির সদস্যগণ ও অডিট কমিটির সদস্যগণ অভিমত দিয়েছেন।
প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আরও যত অভিযোগ-
২০১০ ইং সাল হতে ২০১৫ ইং সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্য ও সাবেক পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্তৃক সরকারী বরাদ্দের চাল ও নগদ টাকা সহ প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকার কোনো কাজ না করে সমুদয় টাকা আত্মসাৎ করে ভূয়া মাষ্টার রোল দাখিল করেন। সিডরে বিধস্ত ১২০ ফুট লম্বা এবং ৪০ ফুট প্রস্থের কাঠের তৈয়ারী বারান্দা বাবদ এবং টিনের ছাউনীর পুরাতন কাঠ ও টিন গোপনে বিক্রির বিশ হাজার টাকা এবং পুরাতন কাঠ ও টিন বিক্রির পঁচিশ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন । ১৯৯৮ ইং সাল হতে ২০২২ ইং সাল পর্যন্ত ভর্তি ফি থেকে উদ্ধৃত্ত আনুমানিক পনের লক্ষ টাকা, ১৯৯৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সেশনফির উদ্ধৃত্ত আনুমানিক দশ লক্ষ টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেন। ২০১০ সাল থেকে ২০২২ পর্যন্ত জেএসসি উদ্ধৃত্ত পাঁচ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেন।২০১০ সাল থেকে ২০২২ পর্যন্ত উদ্ধৃত্ত দশ লক্ষ টাকা, জেএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্র-ছাত্রীদের ট্রান্সক্রিপ্ট ও প্রসংশা পত্রের জন্য ৫০০ টাকা করে সর্বমোট পাঁচ লক্ষ টাকা এবং ফসলী জমি থেকে প্রত্যেক বছরে ২৫,০০০ টাকা করে ২৪ বছরে সর্বমোট ছয় লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেন। উল্লেখ যে প্রতিষ্ঠানের কৃষি জমির পরিমান প্রায় ২.৭৭ একর। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ফি থেকে আদায়কৃত টাকা থেকে উদ্ধৃত পাঁচ লক্ষ টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেন প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম।
এছাড়াও বিদ্যালয়ের ১২০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৪০ ফুট প্রস্থ বিশিষ্ট একটি ঘরের টিন ও কাঠ থেকে চল্লিশ হাজার টাকার কাঠ ও টিন প্রধান শিক্ষক নিজে এবং তার ভগ্নিপতি ফজলুর রহমান, ভাই মো: ইব্রাহিম স্ব-স্ব বসত ঘরে ব্যবহার করেন। ২০১২ সালে জেএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র এ বিদ্যালয়ে আনার জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে এক হাজার টাকা করে সর্বমোট সত্তর হাজার টাকা আদায় করে আত্মসাৎ করেন। ২০১০-২০১৭ সাল পর্যন্ত ভর্তি ফি, সেশন ফি, রেজিষ্ট্রেশন ফি আদায় করে বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাবে জমা না রেখে ট্রান্সক্রিপ্ট বাবদ ৫০০ টাকা এবং প্রসংশাপত্র বাবদ ৫০০টাকা প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে সর্বমোট এক হাজার টাকা করে রশিদ না দিয়ে সমুদয় টাকা আত্মসাৎ করেন।
পূর্বের ম্যানেজিং কমিটির সদস্যবৃন্দ জানান, ২০১৭ সালে এ বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা ৩৮১ জন এর মধ্যে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি ৯৬ জন, তাদের কাছ থেকে ভর্তি ফি ও সেশন ফি প্রত্যেকের কাছ থেকে ৭১০ টাকা হারে মোট ৬৮, ১৬০ টাকা, ৭ম শ্রেণীতে ছাত্র সংখ্যা ৯১ জন, প্রত্যেকের কাছ থেকে সেশন ফি ৬৬০ টাকা করে মোট প্রাপ্য ৬০,০৬০ টাকা, ৮ম শ্রেণীতে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা ৯০ জন প্রত্যেকের কাছ থেকে সেশন ফি ৬৬০টাকা করে মোট ৫৯,৪০০ টাকা, ৯ম শ্রেণীতে ছাত্র- ছাত্রী সংখ্যা ৫২ জন প্রত্যেকের কাছ থেকে ৭৬০ টাকা হারে মোট প্রাপ্য ৫০, ২২০টাকা, ১০ম শ্রেণীতে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা ৫২ জন প্রত্যেকের কাছ থেকে ৭৬০ টাকা হারে মোট প্রাপ্য ৩৯,৫২০ টাকা, উক্ত ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে ভর্তি ফি, সেশন ফি বাবদ আদায় করে সর্বমোট ২,৭৭,৩৬০ টাকা বিদ্যালয়ের ব্যাংক একাউন্টে জমা ননা রেখে আত্মসাৎ করেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে টুঙ্গিবাড়ীয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের মুঠোফোনে কল করলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর তার ব্যক্তিগত ব্যবহৃত তিনটি মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়টির ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি জাহিদ হাসান পিয়েল শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, নানা অভিযোগে ধান শিক্ষক মোহাম্মদ নজরুল ইসলামকে ম্যানেজিং কমিটির পক্ষ থেকে শোকজ করা হয়েছে। বার বার সাধারণ সভা আহ্বান করার জন্য তাকে চিঠি দিলেও তিনি কোন কর্ণপাত করছেন না। তার বিরুদ্ধে নানা আর্থিক অনিয়মের লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। তদন্ত করলে সব বেড়িয়ে আসবে।
এ বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (রাঙ্গাবালী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্বেও তিনি) মুজিবুর রহমান শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, এ বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়গুলো আমি জানি। খুব দ্রুতই তদন্ত করা হবে। তদন্তের আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/৩০/০৪/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
