এইমাত্র পাওয়া

স্কুল শিক্ষকের ছেলে কাউছার জাল টাকার মাফিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক, পটুয়াখালীঃ পঞ্চাশ বছর বয়সী কাউছারের জন্ম পটুয়াখালীর লোহালিয়া ইউনিয়নের এক স্কুল শিক্ষকের ঘরে। ঘরে মা-বাবা ছাড়া তারা ছয় ভাই ছিলেন। আটজনের পরিবারে অভাব-অনটন লেগে থাকতো সবসময়। বাবা শিক্ষক হলেও তারা কোনো ভাই লেখাপড়ায় সুবিধা করতে পারেনি। কাউছারেও একই অবস্থা। টেনেটুনে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। বাবা মৃত্যুর পর সংসারে অভাব আরও তেড়ে আসে। তাই ভাইদের অনেকেই লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে কৃষিকাজে ঝুঁকে পড়ে। আর তার তৃতীয় ভাই হুমায়ুন কবীর জড়িয়ে যায় জাল টাকার কারবারিদের সঙ্গে। প্রথমদিকে অন্যদের সঙ্গে কাজ করলেও এক সময় সবকিছু রপ্ত করে হুমায়ুন নিজে জাল টাকা তৈরি শুরু করে।

জাল টাকার কারবার করে রাতারাতি অনেক টাকার মালিক হয়ে যায়। বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলা হুমায়ুন কারও সঙ্গে মিশতো না। ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গেও দেখা করতো না। কিন্তু কাউছারসহ সবাই বুঝতে পারতো হুমায়ুন কিছু একটা করছে। যা দিয়ে রাতারাতি অনেক টাকার মালিক হয়ে গেছে। অবশ্য এসব কথা বেশি দিন গোপন থাকেনি। জানাজানি হয়ে যায় বন্ধু-বান্ধবসহ কাছের অনেকের কাছে। হুমায়ুন জাল টাকা তৈরি করে। পরে বন্ধুরা মিলে হুমায়ুনকে কিডন্যাপ করে কৌশল আয়ত্ত করার পাঁয়তারা করে। যদিও চতুর হুমায়ুন সেটি বুঝতে পারে। পরে অবশ্য তাকে কিডন্যাপ করা হয়নি। হুমায়ুনের রমরমা অবস্থা দেখে কাউছারেরও আগ্রহ জন্মায় জাল টাকা তৈরি করার। কিছুদিন পর কাউছার লেগে যায় জাল টাকা নিয়ে গবেষণা করা। অনেক চিন্তা ধারার পর একশ’ টাকার একটি নোটকে পাঁচশ টাকায় রূপান্তর করে জাল টাকা তৈরির জগতে পা রাখে। সময়ের ব্যবধানে কাউছার এখন এই জগতের মাফিয়া। একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছে। সে এখন দেশের শীর্ষ জাল টাকার কারিগরদের অন্যতম।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলেন, জাল টাকার কারিগর হওয়ার পরে ৯টি মামলা হয় কাউছারের বিরুদ্ধে। এসব মামলায় ৯ বার কারাভোগ করে। সবশেষে গত শনিবার রাজধানীর ধলপুর এলাকার কমিশনার রোডের একটি বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার ৭ মাস আগে জামিনে কারামুক্ত হন। এরপরই আবার ল্যাপটপ ও প্রিন্টার কিনে জাল টাকা তৈরি শুরু করে। বিশেষ যে ৭ ধাপে জাল টাকা তৈরি করতো, তার মধ্যে রয়েছে নিখুঁত মনোগ্রাম স্থাপন ও হাজার টাকার নোটকে হুবহু রং দেয়া এবং নিরাপত্তা সুতা স্থাপন ও প্লাস্টিকের প্রলেপ দিয়ে সুইয়ের মাধ্যমে প্রলেপ দেয়া। এতে করে কারোই বোঝার উপায় থাকতো না এটি জাল নোট। বিশেষ করে টাকার বান্ডিলের সঙ্গে ৩-৫টি নোট জুড়ে দিলে ব্যাংকের কর্মকর্তা কর্মচারীদেরও বোঝা কঠিন হয়ে যেতো।

সূত্র মতে, দুই ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রী থাকলেও তাদেরকে সবসময় দূরে রাখে কাউছার। এ কাজের সঙ্গে কাউকেই সম্পৃক্ত রাখে না। যখন জেলে যায় তখন ধারদেনা করে জামিন নেয়ার চেষ্টা করে। প্রায় দেড় যুগ আগে এ কাজে সম্পৃক্ত হয়। প্রথম দিকে বিপুল টাকা উপার্জন করে। সেই টাকা দিয়ে ২০০৭ সালে ৬ লাখ টাকা দিয়ে প্রাডো গাড়িও কিনেছিল। পরে গ্রেপ্তার হয়ে সেই গাড়ি বিক্রি করে দেয়। তার এই জাল টাকার কারবারে অসংখ্য ডিলার রয়েছে। যাদের মাধ্যমে সারা দেশে জাল টাকা ছড়িয়ে দিতো। যদিও ডিলারদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেয়নি। তবে তার মতোই জাল টাকা কারিগর হিসেবে জাকির, সেলিম ও রফিক নামে তিনজন সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছেন কাউছার। তবে ওই নামে আসলেও কোনো জাল টাকার কারিগর রয়েছে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেনি ডিবি।

ডিবি ক্যান্টনমেন্ট জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) এস এম রেজাউল হক বলেন, কাউছার এতটা নিখুঁত জাল টাকা তৈরি করে তার সঙ্গে পাল্লা দেয়ার মতো খুব কম আছে। এ ধরনের কাজে যারা জড়িত তারা একনামে তাকে চিনে। জাল টাকার বিষয় যখনই সামনে আসে তখনই কাউছারের নাম আসে। জাল টাকা তৈরির নেশায় পড়ে সে অনেকটাই বন্দি জীবনযাপন করছিল। বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জেলে বন্দি জীবন কাটায়। জামিনে বের হয়ে আবার একই কাজে লেগে বন্দি জীবন। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কারও সঙ্গে তার যোগাযোগ থাকে না। সর্বশেষ গত বছরের শেষের দিকে জেল থেকে বের হয়ে ধলপুরে বাসা নিয়ে জাল টাকা তৈরি শুরু করে। আমরা তাকে ৬৫ লাখ টাকার জালনোটসহ গ্রেপ্তার করেছি। আদালতের নির্দেশে আমরা তাকে ৩ দিনের রিমান্ডে এনেছি। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তার থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হবে। তবে ঈদকে সামনে রেখে তার ৩ কোটি টাকার জাল নোট ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা ছিল। রেজাউল বলেন, পরিবারের অভাবের তাড়নায় প্রথমে তার ভাই (হুমায়ুন) এবং পরে কাউছার এই কারবারে জড়ান। জাল টাকা তৈরি ছাড়া আর কোনো কাজ পারে না। জামিনে মুক্ত হয়ে নতুন ঠিকানায় বাসা ভাড়া করে এই কাজ শুরু করে।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৪/০৪/২০২৩       

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.