ভারপ্রাপ্ত আর ভারপ্রাপ্ত; মেহেরপুর জেলার ৩০৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৬৯টি চলছে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে। তিন উপজেলার এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। এছাড়া এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৮৯টি সহকারী শিক্ষক পদেও রয়েছে শূন্যতা। এতে একরকম নুয়ে পড়েছে গোটা জেলার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা।
অভিভাবকদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটি সামলাতে হচ্ছে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে; আবার কোনোটি চলিত দায়িত্ব দিয়ে। নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি প্রধান শিক্ষকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সহকারী শিক্ষকদের হিমশিম অবস্থা অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে। এ ব্যবস্থার দ্রুত সমাধান চান চান তারা।
সদর, মুজিবনগর ও গাংনী উপজেলা নিয়ে গঠিত মেহেরপুর জেলার শিক্ষা বিস্তারের জন্য রয়েছে ৩০৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখানকার শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো। কিন্তু প্রধান শিক্ষকসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংকট এ শিক্ষা বিস্তারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মেহেরপুর সদরে উপজেলায় ১০৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৭টি, গাংনীতে ১৬২টির মধ্যে ১৭টি এবং মুজিবনগরে ৩৮টির মধ্যে ১৫টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য।
প্রধান শিক্ষক না থাকায় সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে সিনিয়র একজনকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এ দায়িত্ব পালন করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি জেলা, উপজেলা ও ক্লাস্টারভিত্তিক বিভিন্ন মিটিংয়ে অংশ নিতে হয় দায়িত্বপ্রাপ্তদের। এতে ওই শিক্ষকের অতিরিক্ত ক্লাসগুলো নিতে হিমশিম খেতে হয় অন্য সহকারী শিক্ষকদের। যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান শিক্ষকের পাশাপাশি একজন বা দুজন সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য, সেখানে তো ক্লাস নিতে লেজেগোবরে অবস্থা।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা বলছেন, দাফতরিক কাজের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান – দুটি কাজই তাদের একসঙ্গে করতে হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে তারা বিনাশ্রমে যে দায়িত্বটি পালন করেন, এতে কোনো সুবিধা নেই; বরং সিনিয়র শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের না আছে কোনো ভাতার ব্যবস্থা, না আছে মূল্যায়ন।
এ বিষয়ে অভিভাবকরা বলছেন, প্রধান শিক্ষক না থাকায় প্রায়ই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্রছাত্রীরা যত্রতত্র বাইরে ঘুরাফেরা করে। শ্রেণিকক্ষের ভেতরে থাকতে চায় না শিশুরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষকের খুবই প্রয়োজন।
সদর উপজেলার কোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. আজহার আলী বলেন, প্রায় চার বছর ধরে প্রধান শিক্ষক ও একজন সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য। এতে তারা ক্লাস নিতে হিমশিম খান। তার মতে, সন্তান যেমন পিতা ছাড়া এতিম, ঠিক তেমনি একজন প্রধান শিক্ষক ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এতিম।
সদর উপজেলার দফরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আশরাফুল আলম বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করি বিধায় আমরা অনেক রকম সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। একই সঙ্গে দুরকম কাজ – দাফতরিক কাজ ও শ্রেণিকক্ষে পাঠদান – এত কিছু করেও আমাদের সঠিক মূল্যায়ন নেই। নেই কোনো পারিশ্রমিক। সহকারী শিক্ষক হিসেবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি প্রথমত বুঝতেই পারতাম না। তারপরও সরকারি দায়িত্ব এখন পর্যন্ত পালন করে যাচ্ছি।’
সচেতন মহলের প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষানুরাগী নুরুল আহমেদ বলেন, ‘শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড বলা হয়। একজন শিশুকে তার মেধা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা শেখানো ছাড়াও তাদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার ভিত রচনা করে প্রাথমিক বিদ্যালয়। এভাবে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক দিয়ে যদি আমাদের স্কুলগুলো চলতে থাকে, তাহলে আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত দুঃখজনক হবে।’
সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আপিল উদ্দিন বলেন, ‘শূন্যপদের বিপরীতে আমরা সরকারি বিধি মোতাবেক গ্রেডেশন তালিকা তৈরি করেছি, যেটি এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে রয়েছে বলে জানি। অচিরেই এ পদগুলো হয়তো পূরণ হয়ে যাবে।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ভূপেশ রঞ্জন রায় বলেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে স্কুল পরিচালনা করায় শিক্ষা কার্যক্রমে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। খুব দ্রুতই এ সংকট কেটে যাবে।
প্রধান শিক্ষকসহ সহকারী শিক্ষকের শূন্যপদে নিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত এ সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেন তিনি।
জেলার এক-তৃতীয়াংশ প্রাথমিক বিদ্যালয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে চলছে। সেই সঙ্গে রয়েছে সহকারী শিক্ষক সংকটও। তাই শিক্ষানুরাগীসহ সচেতন মহল বলছেন, একমাত্র শিক্ষাই সকল উন্নয়নের চাবিকাঠি, যার প্রথম ধাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে হয়। তাদের মতে, অবিলম্বে শূন্য পদে সহকারী শিক্ষক ছাড়াও প্রধান শিক্ষক পদ পূরণ করার কোনো বিকল্প নেই।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৪/০৪/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
