কিন্ডারগার্টেনের সঙ্গে প্রাথমিকের অঘোষিত প্রতিযোগিতা

নিজস্ব প্রতিবেদক, জামালপুরঃ জেলার মাদারগঞ্জে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী সংকট বাড়ছে। শিশুরা এখন কিন্ডারগার্টেনমুখী হয়ে যাচ্ছে। এর জন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়ালেখার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে তদারকির দাবি জানানো হয়েছে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানা গেছে, এ উপজেলায় ১৯৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩২ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। সেই সঙ্গে কিন্ডারগার্টেন বা বেসরকারি বিদ্যালয় রয়েছে ৮৭টি। তবে বেসরকারি একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা প্রায় শতাধিক।

সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, কায়স্থ পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা পাঁচজন। অন্য শ্রেণিগুলোতে শিক্ষার্থীদের আসন ফাঁকা ছিল। এ সময় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী না থাকার বিষয়ে সংশ্নিষ্টরা দাবি করেন একদিন আগে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হয়েছিল বিদ্যালয়ে তাই উপস্থিতি নেই। যদিও অন্য দিনের হাজিরা খাতা অনুসন্ধানে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি পাওয়া যায়, প্রথম শ্রেণিতে ২০, দ্বিতীয় ১০, তৃতীয় ৫, চতুর্থ ১০ এবং পঞ্চম শ্রেণিতে পাঁচজন। একই ধরনের অবস্থা দেখা গেছে মধ্য রায়ের জাংগালিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এখানে শুধু শিক্ষকদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এ বিষয়ে সহকারী শিক্ষিকা রাজিয়া মাহবুব জানান, পাশের বিদ্যালয়ে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চলছে। তাই সব শিক্ষার্থী ওই অনুষ্ঠানে চলে গেছে। তবে এই বিদ্যালয়ে ১১৭ ছাত্রছাত্রী রয়েছে বলে দাবি তাঁর।

তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেক ছাত্র বিদ্যালয়ে আসে না। তারা কিন্ডারগার্টেনে পড়ে। শুধু শিক্ষা উপবৃত্তির জন্য ভর্তি হয় সরকারি প্রতিষ্ঠানে। কারণ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী উপস্থিতি না থাকলেও নিয়মিত উপবৃত্তি তালিকায় তাদের নাম রয়েছে।

জানা গেছে, অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ উপেক্ষা করে অভিভাবকরা শিক্ষা বাণিজ্যের ফাঁদে পা দিচ্ছেন। কারণ ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেনগুলো শিক্ষার্থী ধরতে প্রচার চালায়। এ ক্ষেত্রে চাকচিক্যই তাদের মূল কথা।

তবে ভিন্ন কথা বলছেন শিক্ষার্থী অভিভাবকরা। তাদের মতে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়ায় তদারকির অভাব রয়েছে। এর বিপরীতে কিন্ডারগার্টেনে তদারকি হয় নিয়মিত।

সাইদুর রহমান নামের এক অভিভাবক জানান, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভবন আছে, খেলার মাঠ আছে, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকও আছেন। কিন্তু পড়ালেখার মানের প্রশ্নে অভিভাবকদের সন্তুষ্টির অভাব আছে। তা ছাড়া বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিয়মিত ও যথাসময়ে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন না। এসব কারণে কিন্ডারগার্টেনে আগ্রহ বাড়ছে।

কথা হয় নবপ্রাণ কিন্ডারগার্টেনে কেজি শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহসিন তরফদারের মা রাহিমা খাতুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, কিন্ডারগার্টেনে স্কুলগুলোতে যেভাবে যত্ন নিয়ে পড়ানো হয়, প্রাথমিকে তা হয় না। এজন্য অভিভাবকরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি কিন্ডারগার্টেনেও পড়ান।

তবে পাটাদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল ইসলামের দাবি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মানের ওপর ব্যাপক তদারকি রয়েছে। শিক্ষা প্রশাসন এই ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করায় সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থারও উন্নতি হচ্ছে।
জানা গেছে, গত বছর বালিজুড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল ১০০।

বর্তমানে এক বছরের ব্যবধানেও এই বিদ্যালয়টিতে নতুন শিক্ষার্থী বাড়েনি। অথচ বিদ্যালয় এলাকার ওইসব কিন্ডারগার্টেনে
শিক্ষার্থী বৃদ্ধির সংখ্যা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

বালিজুড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিথী আফরীন বলেন, ‘আমরা বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু শিক্ষার্থীদের কিন্ডারগার্টেনমুখী করছেন সংশ্নিষ্টরা।

জানতে চাইলে মাদারগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূরুল আমিন বলেন, ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আমরা প্রতিমাসেই পরিদর্শনে যাচ্ছি। তারপরও কিন্ডারগার্টেনের সঙ্গে অঘোষিত প্রতিযোগিতায় থাকতেই হচ্ছে। কিন্ডারগার্টেন স্কুল পরিচালনার বিষয়ে সরকারের একটা নীতিমালা থাকা জরুরি।’

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২১/০২/২৩   


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.