শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ বগুড়ার সোনাতলা পাইলট হাইস্কুলের শরীরচর্চার শিক্ষক ছিলেন আব্দুল হামিদ মন্ডল। সেই সঙ্গে ছিলেন স্কাউটের দক্ষ এক নেতা। সারাদেশে স্কাউটের মাধ্যমে সোনাতলা হাইস্কুলকে আলাদা একটি পরিচিতি এনে দিয়েছিলেন তিনি। হাইস্কুল থেকে অবসরে যাওয়ার পর তিনি সোনাতলার আরেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টিএম মেমোরিয়াল একাডেমিতে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরে সেখানকার প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পান। সেই স্কুলে পড়ার সুবাদে আমি তার ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করি।
তিনি শুধু আমার নন, আমার নানা ও আমার বাবারও শিক্ষক ছিলেন। বগুড়ার সোনাতলার অনেকের কাছেই তিনি ছিলেন তিন প্রজন্মের শিক্ষক। সোনাতলার কে না চেনেন তাকে! সবাই এক নামে চেনেন হামিদ স্যারকে। তবে পুরো সোনাতলা তাকে স্যার হিসেবে চিনলেও তার আরেকটি বড় পরিচয় আছে। তা হলো- তিনি একজন ভাষাসৈনিক।
তিনি ১৯৫২ সালের ভাষাসৈনিক ছিলেন। রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে তিনি ছিলেন সোচ্চার। বগুড়ার সোনাতলায় তিনিই প্রথম ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, সে কারণে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি হয়েছিল। গ্রেফতারি পরোয়ানা এড়াতে তাকে আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে। ফলে তিনি ওই বছর মেট্রিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি। এক বছর পর তিনি মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন।
হামিদ স্যার আমাদের ইংরেজি ক্লাস নিতেন। ক্লাস নেওয়ার সময় তার হাতে থাকতো পুরোনো আমলের গ্রামার বই। তিনি ক্লাসে ঢুকলেই একদম পিনপতন নীরব হয়ে যেত ক্লাস। কারণ সবাই তাকে কড়া শিক্ষক হিসেবেই চিনতেন। কড়া হলেও তিনি ছিলেন সৎ, নিষ্ঠাবান ও দায়িত্ববোধ সম্পন্ন শিক্ষক। বাসা থেকে স্কুল কাছে হওয়ায় তিনি প্রতিদিন হেঁটে স্কুলে যেতেন। আমি এক মিনিটও তাকে ক্লাসে দেরি করে ঢুকতে দেখিনি। প্রতিদিন তিনি যথাসময়ে ক্লাসে ঢুকতেন।
ক্লাসে তিনি মাঝেমধ্যেই ভাষা আন্দোলনের দিনগুলোর গল্প করতেন। শুধু ভাষা আন্দোলনের গল্পই নয়, করতেন মুক্তিযুদ্ধের অনেক গল্প। কারণ মুক্তিযুদ্ধ তো তিনি কাছ থেকে দেখেছেন, যুদ্ধের উত্তাল সেই দিনগুলোর সাক্ষী তিনি।
আব্দুল হামিদ স্যারের নাতি সাজিদ হাসান বলেন, ‘সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও দাদু পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়া, খাবারের জোগান দেওয়া, কোনো মুক্তিযোদ্ধা আহত হলে চিকিৎসা (ফাস্টএইড) দেওয়াসহ নানা রকম সহায়তা দিয়েছিলেন।’
সাজিদ হাসান বলেন, ‘যুদ্ধের একপর্যায়ে রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানিরা দাদুকে আটক করেছিল। সে সময়ের একটি বর্ণনা দিতে গিয়ে দাদু বলেছিলেন যে, তার সামনেই অনেক বাঙালিকে গাছের সঙ্গে উল্টো করে ঝুলিয়ে অমানবিক অত্যাচার করে হত্যা করা হয়েছে। সেখান থেকে দাদু নামাজ পড়ার কথা বলে কৌশলে পালিয়ে এসেছিলেন।’
টিএম মেমোরিয়াল একাডেমিতে থাকাকালীন তিনি সবচেয়ে বেশি মিশতেন সেখানকার সহকারি শিক্ষক আশরাফুল আলমের সঙ্গে। আশরাফুল আলম স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘হামিদ স্যারের সাথে দীর্ঘ পাঁচ বছর আমি চাকরি করেছি। আমাকে অনেক স্নেহ করতেন। যখন আমার সঙ্গে গল্প করতেন, গল্পের ঝাঁপি খুলে বসতেন। বেশিরভাগ গল্পই তার সোনালি অতীত ঘিরে। ভাষা আন্দোলনের গল্প, যুদ্ধের গল্প।’
আশরাফুল আলম বলেন, ‘টিএম মেমোরিয়াল একাডেমিতে হামিদ স্যার প্রধান শিক্ষক হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির সমৃদ্ধি এবং উন্নতি মূলত তার হাত ধরেই শুরু হয়। ব্যক্তিগতভাবে হামিদ স্যার ছিলেন অত্যন্ত সৎ আর আড্ডাবাজ মানুষ। সে সময় তার বয়স প্রায় আশির উপরে। বয়স তাকে কখনোই হারাতে পারেনি। আমাকে একটা কথা প্রায়ই বলতেন, ভালো শিক্ষকের গুণ স্ট্যাডি করে ক্লাসে যাওয়া। বুঝলে আশরাফ?’
হামিদ স্যার ছিলেন দেশপ্রেমিক, রাজনৈতিক সচেতন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ। তিনি কখনোই অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতেন না। শিক্ষকতার প্রতি অসামান্য ভালোবাসার কারণে তিনি বিমান বাহিনীর চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন।
তিনি ভাষা আন্দোলনের যথাযথ স্বীকৃতি না পেলেও এটি নিয়ে তার কোনো কষ্ট ছিল না, আক্ষেপ ছিল না। তবে ২০১৬ সালে সোনাতলা উপজেলার তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাবিবুর রহমান তাকে ভাষাসৈনিক হিসেবে সম্মাননা স্মারক দিয়েছিলেন।
বগুড়ার সোনাতলার এই গুণিজন ৯০ বছর বয়সে ২০১৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে একটি শোক বই খোলা হয়েছিল। সোনাতলার পিটিআই মোড়ে তিন দিনের জন্য শোক বইটি রাখা হয়েছিল।
আমরা এমন একজন অসাধারণ শিক্ষক ও প্রজ্ঞাবান মানুষকে হারিয়েছি। যার শূন্যতা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। আজ মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি ভাষাসৈনিক আব্দুল হামিদ স্যারকে।সুত্রঃ জাগো নিউজ
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২১/০২/২৩
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
