শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুর রশিদ। বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার ভাটগ্রামের বাসিন্দা। তিনটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে ছিলেন উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি। উপজেলা চেয়ারম্যান পদেও নির্বাচন করেন সে সময়। জমি-জমাও ছিল প্রায় ১৪ বিঘা।
কিন্তু সব হারিয়ে পরিবারের থেকে বিতাড়িত হয়ে নিঃস্ব সেই শিক্ষক আশ্রয় নিয়েছিল বাসস্ট্যান্ডের যাত্রী ছাউনিতে। শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার কারণে চলাফেরা করতে পারতেন না। ফলে ধুলো-ময়লার মধ্যেই শীর্ণ দেহ নিয়ে কাটিয়ে দেন এক বছরের বেশি সময়। সম্বল বলতে ছিল একটি মাদুর, একটি বালিশ আর একটি লুঙ্গি। গায়ে ছিল না কোনো জামা। দিনের অধিকাংশ সময় যাত্রী ছাউনির এক কোনায় মাদুর বিছিয়ে শুয়ে থাকতেন আব্দুর রশিদ (৮৮)। আশপাশের হোটেল থেকে বা মানুষের দেয়া খাবারই ছিল তার বেঁচে থাকার সম্বল।
গত নভেম্বরে বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসে। এরপরে নন্দীগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শিফা নুসরাত আব্দুর রশিদের দায়িত্ব নিয়ে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে দেন। সেখানেই চলতে থাকে তার চিকিৎসা। কিছুটা সুস্থ হলে এরপর ঢাকার কল্যাণপুরের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ারের বৃদ্ধাশ্রমে তার ঠাঁই হয়। বর্তমানে কেয়ার সেন্টারের নিচতলায় আরও চারজনের সঙ্গে বসবাস আব্দুর রশিদের।
চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ার মূলত রাস্তায় পড়ে থাকা বা ফেলে দেয়া অসহায় বৃদ্ধ ও শিশুদের তুলে এনে আশ্রয় দেয়ার পাশাপাশি আমৃত্যু সেবা দিয়ে থাকে। পুরোপুরি অনুদান নির্ভর রাজধানীর ব্যতিক্রমী এ প্রতিষ্ঠানর ম্যানেজার মিরাজ হোসেন জানান, এখন অনেকটাই সুস্থ আব্দুর রশিদ। নিজেই খেতে পারেন। নিয়মিত তার চিকিৎসা চলছে। আমৃত্যু সব ব্যয়ভার এই প্রতিষ্ঠানই বহন করবে।
চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ারের ম্যানেজার মিরাজ হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে যখন আব্দুর রশিদের কাছে যান সময় সংবাদের এই প্রতিবেদক তখন বিছানায় বসে চা খাচ্ছিলেন তিনি। দেখেই তার চেহারা খুশিতে ভরে যায়। মিরাজ হোসেনের কাছে জানতে চান তাকে দেখতে আসছি কি না। সালাম দিয়ে স্বীকার করতেই হেসে দিয়ে আধ আধ গলায় বলেন, ‘খাওয়ার সময় সালাম দিতে হয় না।’ এরপর নিজেই জানতে চান আমি কেমন আছি, কি করছি? পরিচয় দিতেই নিজ থেকে এরশাদ সরকারের সময়ে তার রাজনৈতিক অবস্থার কথা বলতে শুরু করেন। এরপরই আসে তার পরিবারের গল্প।
নিজের যৌবনে পরিবার ও সন্তান ছাড়া যিনি কিছুই বুঝতেন না, জীবনের অন্তিম সময়ে সেই পরিবারের ভালোবাসা তার কপালে জোটেনি। অসহায়ত্বের কথা মনে পড়তেই চোখ ভিজে যায়। স্ত্রী ক্যানসারে আক্রান্ত হলে চিকিৎসক দুই মাস সময় দিয়েছিলেন, এরমধ্যেই তিনি মারা যান। আর একমাত্র ছেলে মারা গেছেন একটি দুর্ঘটনায়। সম্বল বলতে ছিল একমাত্র মেয়ে ও ভাই। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, সেখানে তার তিন নাতি। সবাই পড়াশোনায় ভালো হওয়ায় তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ এই শিক্ষাগুরু। এখনও বেঁচে আছে তার ছোট ভাই, গ্রামে পরিবার নিয়েই বসবাস তার। কিন্তু ওই দুই পরিবারের কারও আর্থিক অবস্থাই তেমন ভালো না। তাই অক্ষম এই বৃদ্ধকে তারা নিজেদের কাছে রাখতে চাননি।
তবে কীভাবে তিনি উপজেলার কুন্দারহাট বাসস্ট্যান্ডের যাত্রী ছাউনিতে এলেন সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু মনে করতে পারেননি।
মিরাজ হোসেন জানালেন, তারা যখন বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে থেকে আব্দুর রশিদকে কেয়ার সেন্টারে নিয়ে আসতে গিয়েছিলেন তখন তার ছোট ভাই নিজের আর্থিক অস্বচ্ছলতার কথা জানিয়ে আব্দুর রশিদের দায়িত্ব নিতে অনেকটা অপারগতা প্রকাশ করেন। তার চাওয়া ছিল, আব্দুর রশিদ যেন ভালো থাকে, তার আশ্রয় যেন হয় কোনো এক বৃদ্ধাশ্রমে। তবে এখন পর্যন্ত তার একমাত্র মেয়ে বাবার খোঁজ নেয়নি।
জীবনের এই অন্তিম সময়ে রাজধানীর এই বদ্ধঘর আর ভালো লাগে না আব্দুর রশিদের। বহুদিন সূর্যের আলো দেখতে না পারা এই প্রবীণ পৃথিবীটাকে আবার নতুন করে দেখতে চান। অনেক অভিমান জমে থাকলেও কারও কাছে কোনো অভিযোগ করতে চান না। শত কষ্টেও চান না কোনো অধিকার, কোনো প্রতিকার। হাত দিয়ে কোমরের পেছনটা (হাড় ভাঙার অংশ) দেখিয়ে বললেন, শুধু একটু হাঁটতে পারলেই ফিরতে চান বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার নিজ বাড়ি ভাটগ্রামে। দেখতে চান তার স্কুলগুলো।
কিন্তু এই প্রবীণ কি ফিরতে পারবেন তার নিজ বাড়িতে? আর কোনোদিন কি দেখা পাবেন প্রিয়জনের? যে নাতিদের মেধার প্রশংসায় পঞ্চমুখ আব্দুর রশিদ, তাদের কাছে পেলে কতটা আপ্লুত হবেন তিনি, তার কাছে না গেলে হয়তো সেটা বোঝা যাবে না। তার পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্র কেউ এ বঞ্চনার দায় এড়াতে পারবে না। সুত্রঃ সময় টিভি
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৫/০২/২৩
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
