এইমাত্র পাওয়া

ঋতুকালীন ঐচ্ছিক ছুটি প্রয়োজন

শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ বাংলাদেশের নারীদের নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। অফিস-আদালত, রাস্তাঘাটে চলতে-ফিরতে নানারকমের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তবু তারা প্রতিকূলতাকে জয় করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিকূলতা জয় করতে পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবেশ গড়তে আমাদের সমাজব্যবস্থা আজও ব্যর্থ। নারীদের নিয়ে সমাজের মনোভাব যেন এক ধরনের দিশাহীন। তাদের জীবন, শরীর, স্বাস্থ্যসহ অনেক কিছু নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার বেশিরভাগ নারীর থাকে না। বিশেষ করে মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক নানা পরিবর্তন যখন হয় তখন একজন মেয়ের প্রয়োজন শিক্ষায় সাহায্য, পরামর্শ, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসচেতনতা। কিন্তু আমাদের সমাজব্যবস্থা এসবের সহযোগিতা কতটুকু করতে পারছে। বিভিন্ন সময় নারীরা শারীরিক ব্যক্তিগত কিছু সমস্যার মুখোমুখি কমবেশি সবাই হয়।

কয়েকদিন আগে অফিসের সিঁড়ি ভেঙে খুব ক্লান্ত ভঙ্গিতে আমার এক সহকর্মী জুনিয়র মেয়েকে উঠতে দেখে জিজ্ঞেস করলামÑ কী হয়েছে?

-আপা পিরিয়ড হয়েছে, পেটে ব্যথা আছে। অবসাদ লাগছে।

-বিশ্রাম করো।

-না আপা, ফিল্ডে কাজ আছে ছুটি নেই।

থেমে গেলাম। আর কিছু বললাম না। সে কষ্ট করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল। হঠাৎ আমার মনে পড়ল কয়েক মাস আগে স্পেন সরকারের তিন দিনের ঋতুকালীন ছুটি দেওয়ার কথা। আমাদের দেশে ঋতুকালীন ছুটি থাকলে মেয়েদের এই অবস্থায় কষ্ট করতে হতো না।

ঋতুস্রাব, মাসিক, পিরিয়ড যে নামেই বলি না কেন, এ হচ্ছে নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। নিয়মিত এবং সঠিকভাবে মাসিক বা পিরিয়ড হওয়ার মানে হচ্ছে তিনি সন্তান ধারণে সক্ষম। কিন্তু এই সময়ে আমরা কি অনেকেই নিজের সঠিক যত্ন নিতে পারছি? হয়তো অনেকেরই নানা ব্যস্ততার কারণে সঠিক যত্ন নেওয়া হচ্ছে না। ফলে পরবর্তী সময়ে দেখা দিচ্ছে নানা সমস্যা।

মাসিকের সময় কী কী হতে পারে : ক. পেটে প্রচণ্ড ব্যথা খ. তলপেট ফুলে যাওয়া ও ব্যথা হওয়া গ. অবসাদ ভাব ঘ. খাবারে অরুচি ঙ. হরমোনের প্রভাবে মানসিক ও শারীরিক বেশ কিছু পরিবর্তন যেমনÑ রাগ, উত্তেজনা, মেজাজ খিটমিটে থাকা ইত্যাদি।

পিরিয়ড বা মাসিককালীন সব নারী কমবেশি শারীরিক ও মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হয়। স্প্যানিশ গাইনোকোলজি অ্যান্ড অবস্টেট্রিক্স সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, পিরিয়ডের সময় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী গুরুতর ব্যথায় ভোগেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ডিসমেনোরিয়া। ডিসমেনোরিয়ার লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র পেটে ব্যথা, মাথাব্যথা, ডায়রিয়া ও জ্বর। এ অবস্থায় কোনো নারীর পক্ষে কাজে শতভাগ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব নয়।

এ সময়ে করণীয় কী!

১. এ সময়ে জরায়ুু বেশ নাজুক অবস্থায় থাকে, সে কারণে আমাদের তলপেট যেন কোনো আঘাতপ্রাপ্ত না হয় সে বিষয়টি লক্ষ্য রাখতে হবে। ২. ভারী কোনো কাজ করা যাবে না।

৩. ৪-৫ ঘণ্টা পরপর স্যানিটারি প্যাড চেঞ্জ করতে হবে।

৪. দুশ্চিন্তামুক্ত থাকার জন্য বই পড়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জামাকাপড় পরা, পরিচ্ছন্ন অন্তর্বাস পরিধান করতে হবে। ৫. পিরিয়ডকালীন র‌্যাশ ওঠাসহ নানা ধরনের সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষার জন্য জায়গাটি শুষ্ক রাখতে হবে।

৬. অবশ্যই প্রচুর পরিমাণে পানি ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে।

৭. পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের প্রয়োজন।

আমাদের দেশের নারীরা ঋতুস্রাব চলাকালীন অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য প্রস্রাব সংক্রমণ ও জরায়ু মুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হন। তাই মাসিককালীন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের জন্য নারীদের ঐচ্ছিক ছুটির ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য ‘পিরিয়ডকালীন পলিসি নামে’ একটি পলিসি তৈরি করা যেতে পারে। এখানে অন্যান্য মেডিক্যাল ছুটির মতো কোনোভাবেই এই ছুটি ভোগ করার সময় তাদের বেতন কাটা যাবে না। নারী পিরিয়ডকালীন প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় যেদিন অস্বস্তিবোধ করবেন এবং ব্যথা অনুভব করবেন সেদিনই ছুটি নিতে পারবেন। তিনি বাড়ি থেকে টেলিফোনের মাধ্যমে বা ই-মেইলের মাধ্যমে অফিসে তার ওপরের কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবহিত করার সুযোগ পাবেন।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যেমন জাপান, তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাম্বিয়া এবং ইন্ডিয়ার কিছু প্রদেশে কয়েকটি প্রাইভেট কোম্পানিতে তাদের নারীকর্মীদের পিরিয়ডকালীন নারীর ঐচ্ছিক ছুটির ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া বিহার সরকারের নারীকর্মীদের জন্যও এমন একটি আইন আছে। বিহার সরকারের কিছু বিভাগের নারীকর্মীরা ‘শারীরিক কারণে’ প্রতি মাসে দুদিন ছুটি পান। পিরিয়ডকালীন নারীকে কোনোভাবেই ভারী কোনো কাজে বাধ্য করা যাবে না। পিরিয়ডকালীন বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর :

ক. একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী সার্বক্ষণিকভাবে ওয়াশরুমের সামনে অবস্থান করবেন, যতবার ছাত্রছাত্রী কিংবা অফিস কর্মকর্তা যাবেন মেঝে ভেজা থাকে সেটি শুকনো রাখার ব্যবস্থা করবেন এবং সেই সঙ্গে শৌচাগারটি পরিষ্কার করে ফেলবেন।

খ. শৌচাগারটি পরিষ্কার করার জন্য একটি রেজিস্টারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেটি অনুযায়ী পরিচ্ছন্নতাকর্মী ঘণ্টার ব্যবধানে পরিষ্কার করবেন এবং তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছ থেকে কমেন্টস ও সিগনেচার নিয়ে নেবেন।

গ. বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছাত্রছাত্রী কিংবা অফিসের কর্মীরা জানেন না ময়লাটি ডাস্টবিনে ফেলতে হবে এবং কীভাবে শৌচাগারটি পরিষ্কার রাখা যেতে পারে। তাই এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ বা ট্রেনিংয়ের আয়োজন করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে সবাই শৌচাগারটির ব্যবহারবিধি সম্পর্কে জানতে পারবে।

ঘ. হাইওয়ে বা শহরের পেট্রোল পাম্প কিংবা একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে পরিচ্ছন্ন শৌচাগারের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে জোর ক্যাম্পেইন চালাতে হবে। সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে শৌচাগার ব্যবহারের সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে। এতে করে সবাই উপকৃত হবে। এ ব্যবস্থাগুলোতে পিরিয়ডকালীন নারীদের অসম্ভব উপকার হবে বলে মনে করি।

তাই মাসিককালীন নারীদের ঐচ্ছিক ছুটি এবং দুর্গন্ধমুক্ত ওয়াশরুমের কোনো বিকল্প নেই। কেবল নারী নয়, যে কোনো মানুষের জন্য অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে, শ্যাওলা ধরা ওয়াশরুম ভয়াবহ। সাধারণত দিনে পাঁচ থেকে সাতবার প্রস্রাব করা প্রয়োজন। কিন্তু বাবা-মায়ের কাছে প্রায়ই শোনা যায়, শৌচাগারটি অপরিষ্কার থাকার কারণে ¯ু‹লকামী মেয়েশিশুরা প্রস্রাব আটকে রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে মেয়েশিশুরা ইউরিনারি ট্রাক্ট ইনফেকশনে (ইউটিআই) আক্রান্ত হচ্ছে। এর ফলে ইউরিন ইনফেকশন হতে পারে এবং বারবার ইনফেকশন হলে পরে কিডনি জটিলতা দেখা দিতে পারে। পিরিয়ডকালীন ওয়াশরুম ব্যবহার বাধ্যতামূলক, সেখানে বেশিরভাগ ¯ু‹ল, কলেজ এবং অফিসের ওয়াশরুম পরিষ্কার না হওয়ায় নারীরা ওয়াশরুমে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে না। তাই মনে করি পিরিয়ডকালীন পরিচ্ছন্ন, সুস্থ-সুন্দর, সতেজ জীবনযাপনের জন্য নারীদের প্রয়োজন পরিপূর্ণ বিশ্রাম, মানসিক উৎফুল্লতা ও পরিচ্ছন্ন শৌচাগার।

জয়শ্রী দাস : কথাসাহিত্যিক ও গবেষক

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০১/২৬/২৩   


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.