খরচের ব্যবধান আকাশ-পাতাল

নিউজ ডেস্ক।।

রংপুর থেকে ঢাকায় মেডিকেলে ভর্তিপরীক্ষা দিতে এসেছেন নাঈম। স্বপ্ন তার বিশ্বমানের চিকিৎসক হবেন। বড়ভাইকে সঙ্গে রাজধানীর তিতুমীর কলেজের গেটের বাইরে অপেক্ষা করছেন। নির্ধারিত সময়ে গেট খুলে দেয়ার পর ছোটভাইকে পরীক্ষাকেন্দ্রে পাঠিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুণছেন বড়ভাই আবদুল মোনায়েম। চার ভাই দুই বোন নিয়ে তাদের বাবা-মায়ের সুখী পরিবার। মধ্যবিত্ত এ পরিবারটির প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছোট দুই সন্তানকে চিকিৎসক বানাবেন।
নাঈমের মতো ছোটবোন সিরাজুম মুনিরাও মেডিকেলে ভর্তিপরীক্ষা দেবেন। তার পরীক্ষা রংপুর মেডিকেল কলেজ কেন্দ্র হবে।দুজনেই রংপুরে এইচএসসির পাঠ চুকিয়েছেন। দুই ভাইবোনের ভর্তিপরীক্ষা নিয়ে আবেগাপ্লুত মোনায়েম। চোখে তার স্বপ্নের ডাক্তার ভাইবোন। পরিবার মনে পুষে রেখেছে একদিন তারা দুজন বড় চিকিৎসক হবে। সেদিন তাদের এই কষ্ট সার্থক হবে। এসব কথা মোনায়েমের সঙ্গে আলাপচারিতায় ওঠে এসেছে। আলাপচারিতার একপর্যায়ে মোনায়েমের কপালে চিন্তার ভাঁজ লক্ষ করলাম! স্বপ্ন পথে বাধার ভয়।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মোনায়েম বললেন, সরকারি বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টালে পড়াশোনায় এত খরচের পার্থক্য মাথায় আসে না। আমার মনে হয় এর জন্য আমাদের ব্যবস্থাপনা দায়ী। তারা বেসরকারি মেডিকেলগুলোকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে স্থাপনের অনুমোদন দিয়ে থাকেন। আর অনুমোদন পাওয়া মালিকরা মনে করেন সোনার ডিম পাড়া হাঁস পেয়ে গেছি। তারা একবারও চিন্তা করেন না সরকারি মেডিকেলে চান্স না পেলে একজন মধ্যবিত্ত বাবার স্বপ্ন মাটিতে মিশে যেতে পারে। খেটে খাওয়া কৃষকের ঘরে স্বপ্নের ডাক্তার হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

আবার বেসরকারি মেডিকেলে স্কলারশিপেও আছে অনিয়ম। গরিব আর মেধাবীদের সেই স্কলারশিপও আত্মীয়দের পকেটে জোটে। এত বৈষম্য সত্যি বোধগম্য নয়। সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেলের মধ্যে খরচের এই তফাৎ আমাদের ব্যথিত করে। স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে বড় অন্তরায় হয়ে থাকে। দুই ভাই বোন বিজ্ঞানে পড়ালাম ওদের স্বপ্ন চিকিৎসক হবে। কিন্তু সরকারিতে চান্স না হলে তো ওদের পড়ানো দুরূহ হয়ে দাঁড়াবে।

এমন কথা শুধু আবদুল মোনায়েমের নয়, হাজারো পরিবারের কষ্টের কথা। গত শিক্ষাবর্ষ থেকে বেসরকারি মেডিকেলে সব মিলিয়ে তেইশ লাখের মতো খরচ নেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি মেডিকেলে সামান্য কিছু ভর্তি ফি আর বেতনে শিক্ষার্থীরা পড়ার সুযোগ পাচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকারি মেডিকেল কলেজে যেসব মেধাবী শিক্ষার্থী পড়াশোনার সুযোগ পান, তারা খুবই সৌভাগ্যবান। তারা নামমাত্র ভর্তি ফি ও বেতনভাতায় পড়াশোনা করার সুযোগ পান। সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি ফি কলেজ ভেদে সর্বনিম্ন ৭ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা। মাসিক বেতন কলেজ ভেদে সর্বনিম্ন ২০ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা। মাসিক বেতন এত কম হওয়ায় কোনো শিক্ষার্থীই মাসে বেতন দেন না। ছয়মাসে কিংবা বছর শেষে পরীক্ষার সময় একসঙ্গে বেতন দেন।

অর্থাৎ সরকারি মেডিকেলে এক শিক্ষার্থীকে এমবিবিএস কোর্স শেষ করতে কলেজ ভেদে ভর্তি ও মাসিক ফি-বাবদ সর্বোচ্চ (ভর্তি ফি ২০ হাজার টাকা ও মাসিক বেতন ১০০ টাকা ধরে) মোট খরচ করতে হয় ২৬ হাজার টাকা। অন্যদিকে গেলো বছরের পয়লা মার্চে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি ফি ১৬ লাখ ২০ হাজার টাকা, ইন্টার্ন ফি ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ও টিউশন ফি ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকাসহ সর্বমোট ২২ লাখ ৮০ হাজার টাকা ধার্য করা হয়।

সরকারি মেডিকেলে পাঁচ বছরে মোট খরচ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানান, সরকারি মেডিকেল কলেজ বলতে গেলে খরচই নেই। ভর্তির সময় মাত্র ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা নেয়া হয়। মাসিক বেতন থাকলেও কেউ মাসে দেয় না। বছরে দুই-চারশ টাকা পরিশোধ করে। শুধু খারওয়ার খরচটাই তাদের পকেট থেকে যায়। কেউ কেউ আবার স্কলারশিপ পাওয়ায় উল্টো টাকা পায়।

অপরদিকে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। গত ২০১৮-২০১৯ সেশন থেকে বেসরকারিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মোট ২২ লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ গুনতে হচ্ছে। এর আগে ২০১৭-২০১৮ সেশন পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থীর ভর্তি ফি, ইন্টার্নশিপ ও টিউশন ফিসহ মোট ১৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা খরচ হতো। তবে চলতি বছর আর খরচ বাড়বে না।

ভর্তিপরীক্ষার ফল প্রকাশে বিলম্ব
প্রতিবছর মেডিকেলে ভর্তিপরীক্ষার দুদিনের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ করা হলেও এবার তিন দিনের আগে ফলপ্রকাশ সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, গত বছর পর্যন্ত ওএমআর মেশিনে শুধু উত্তরপত্র (এ৪ আকারের কাগজ) প্রবেশ করিয়ে পরীক্ষা করা হতো। আকারে ছোট হওয়ায় এতে সময় কম লাগতো।

কিন্তু এবার ভিন্ন পদ্ধতিতে ও ভিন্ন মেশিনে উত্তর ও প্রশ্নপত্র উভয়ই পরীক্ষা করে দেখা হবে। এবার আগের তুলনায় বড় আকারের (এ-৩ আকারের কাগজ) আইসিআর মেশিনে পরীক্ষা করা হবে। মেশিনে প্রশ্ন ও উত্তরপত্র উভয় পরীক্ষা ও কাগজের আকার বড় হওয়ার কারণে সময় বেশি লাগবে। এজন্য কম-বেশি ৪ দিন লাগতে পারে। তবে চেষ্টা থাকবে যত দ্রুত পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করা যায়।

অন্যসব বছর মেডিকেল কলেজে ভর্তিপরীক্ষার ফলাফল ৪৮ ঘণ্টা মধ্যে প্রকাশ করা হলেও এবার ফলাফল প্রকাশে দেরি হবে। এবার ৭২ ঘণ্টার আগে ফলাফল প্রকাশ করা সম্ভব হবে না। অন্যসব বছর অপটিক্যাল মার্ক রিকগনেশন (ওএমআর) মেশিনে শুধু উত্তরপত্র দেখা হলেও এবারই প্রথম প্রশ্ন ও উত্তরপত্র দুটোই ইন্টিলিজেন্স ক্যারেকটার রিকগনেশন (আইসিআর) নামক মেশিনে দেখা হবে। এবার ভর্তিপরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ৭৩ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থীর খাতা দেখতে হবে বলে গতবারের চেয়ে দ্বিগুণ সময় লাগবে।

পরীক্ষা ও বেসরকারি মেডিকেলে ব্যয় বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার আমার সংবাদকে বলেন, সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে সুষ্ঠুভাবে ভর্তিপরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। কতজন অনুপস্থিত রয়েছে এ বিষয়ে এখনি কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছে বলে আমি মনে করছি।

বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে এবার খরচ বাড়বে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২২ লাখ ৮০ হাজারের পর আর নুতন করে কোনো ব্যয় বাড়ানো হয়নি এবছর। আশা করছি বাড়বেও না এই শিক্ষাবর্ষে।

উল্লেখ্য যে, গতকাল শুক্রবার রাজধানীসহ সারা দেশের ১৯টি কেন্দ্রের ৩২টি ভেন্যুতে সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস প্রথম বর্ষ ভর্তিপরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ১০০ নম্বরের নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নে সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত এক ঘণ্টার এ ভর্তিপরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

ভর্তিপরীক্ষায় পদার্থবিদ্যায় ২০, রসায়নে ২৫, জীববিজ্ঞানে ৩০, ইংরেজিতে ১৫ এবং বাংলাদেশের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সাধারণ জ্ঞানে ১০ নম্বর ছিল। এবারের এমবিবিএস ভর্তিপরীক্ষায় সরকারি চার হাজার ৬৮টি ও বেসরকারি ছয় হাজার ৩৩৬টিসহ ১০ হাজার ৪০৪টি আসনের বিপরীতে ৭২ হাজার ৯২৮ জন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। গত বছরের চেয়ে এ বছর ৭ হাজার ৯ জন বেশি পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করছেন।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.