অলোক আচার্য ।।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। ইদানীং লক্ষ করা যাচ্ছে, শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের সম্মানবোধ, শ্রদ্ধা কমে গেছে। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীর হাতে শিক্ষককে শারীরিকভাবে নিগৃহীত পর্যন্ত হতে হচ্ছে। আবার কোথাও শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে তাদের অভিভাবকরা শিক্ষককে আঘাত করছে, অপমান করছে। অন্য পেশার সঙ্গে শিক্ষকতার কিছুটা পার্থক্য আছে। শিক্ষকের দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ অন্য পেশার চেয়ে অনেক বেশি। সেই চ্যালেঞ্জ যেমন ছাত্রছাত্রীদের প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করার, তেমনি তাদের বিপথে যাওয়া থেকে দূরে রাখার। সন্তান মানুষ না হলে যেমন বাবা-মা’র ওপর দায় চাপে, তেমনি শিক্ষকের দায়ও কম নয়। তাকে শেখাতে না পারার ব্যর্থতার গ্লানি বইতে হয়। আবার সফলতা এলে বিপরীত চিত্র। এটাই শিক্ষকতা।
কিছুদিন আগে এক ছাত্রের নির্মম আঘাতে উৎপল কুমার নামের একজন শিক্ষকের করুণ মৃত্যু হয়েছে। আবার সাতক্ষীরার শ্যামনগরের একটি ঘটনা পত্রিকায় দেখেছি। জানা যায়, শ্যামনগরের গোবিন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেমকে বেধড়ক মারধর করেছে শিক্ষার্থীর অভিভাবক। প্রধান শিক্ষকের লিখিত অভিযোগে যা জানা যায় তা হলো, তিনি ক্লাস নেওয়ার সময় শিক্ষার্থীরা তার বসার চেয়ারে ‘সুপার গ্লু’ লাগিয়ে রাখে। ফলে শিক্ষক চেয়ারে বসে পরে উঠতে গেলে প্যান্ট লেগে যায়। এতে শিক্ষার্থীরা মজা পায়। এ কারণে শিক্ষার্থীদের মৃদুভাবে কয়েকটি চড় মারেন ওই প্রধান শিক্ষক। এরপর তিনি বাড়ি ফেরার সময় শিক্ষার্থীদের কয়েকজন অভিভাবক তাকে মারধর করে।
বিষয়টি নিয়ে ভাবার আছে। যদি ধরে নেই, এই শিক্ষক ক্লাস নেওয়ার সময় শিক্ষার্থীরা দুষ্টামির ছলেই তার চেয়ারে সুপার গ্লু লাগিয়েছিল, তবুও সেটা একটি গর্হিত অপরাধ। এ কারণে তাদের মৃদু শাস্তি দিয়েছেন তিনি। এটা খুব স্বাভাবিক একটি বিষয় বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। কারণ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের শাসন করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়ায় অভিভাবকরা তাকে রাস্তায় মারধর করবে, এটা ভাবনারও অতীত। বরং তাদের উচিত ছিল সন্তানদের কর্মকাণ্ডের জন্য শিক্ষকের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, নৈতিক অধঃপতন শুধু ছাত্রছাত্রীদের ঘটছে তা নয়, বরং তাদের অভিভাবকদেরও ঘটছে। মোট কথা, একটি সামাজিক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে দেশে। এর পেছনে কাজ করছে নিজের ক্ষমতা জাহির করার মানসিকতা। দেশে শিক্ষককে লাঞ্ছিত করার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। সেটা ছাত্র দ্বারা হোক বা অন্য কারও দ্বারা। এসব ঘটনার কয়টির প্রতিবাদ হচ্ছে? কোনো শিক্ষকের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা আর তাকে লাঞ্ছিত করা এক নয়। আসলে একটু একটু করে ক্ষয়ে যাচ্ছে আমাদের নৈতিকতার স্থানগুলো। দেশে মেধাসম্পদ তৈরি করার মূল কারিগর হলেন শিক্ষক। শিক্ষকের হাত ধরেই একজন শিক্ষার্থী দক্ষতা অর্জন করে। দেশকে কিছু দেওয়ার সুযোগ অর্জন করে। একটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক থাকবে আন্তরিক; থাকবে বিশ্বাস, ভালোবাসা। এটি না থাকলে আমাদের সামনে আরও খারাপ সময় অপেক্ষা করছে।
অলোক আচার্য : শিক্ষক, পাবনা
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
