নিউজ ডেস্ক।।
ধূমপায়ীদের মৃত্যুঝুঁকি অধূমপায়ীদের চেয়ে ১৩ গুণ বেশি। এটি এখন সবাই জানেন, ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর, ধূমপান করলে মুখ গহবর, খাদ্যনালী, ফুসফুসসহ ২০ ধরনের ক্যান্সার হয়ে থাকে, তার পরও মানুষ ধূমপান করছে। ব্যবসা বাড়ানোর জন্য শুধু প্রাপ্তবয়স্ক নয়, শিশু-কিশোর বয়সীদের ধূমপানে আকৃষ্ট করতে তামাক কোম্পানিগুলো অভিনব কৌশল নিয়েছে। দোকানে তামাকজাতীয় পণ্যের মোড়কের ছবি এমন স্থানে রেখে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যেখানে শিশু-কিশোরদের চোখ সহজেই পড়ে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, এভাবে অনেক শিশু-কিশোর ধূমপায়ী হয়ে যাচ্ছে।
গ্লোবাল স্কুল বেজড স্টুডেন্ট সার্ভে, বাংলাদেশের তথ্যানুসারে, বাংলাদেশে ১৩ থেকে ১৫ বছরের স্কুল ছাত্রছাত্রীদের ৯.২ শতাংশ ধূমপায়ী। এটিকে খুবই উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন মহাখালী ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের এপিডেমিওলজির বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা: হাবিবুল্লাহ তালুকদার। তিনি বলেন, ‘এ প্রবণতা হ্রাস করতে না পারলে জাতির সর্বনাশ হয়ে যাবে।’
বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক তিন কোটি ৭৮ লাখ মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারকারী দুই কোটি ২০ লাখ এবং ধূমপায়ী এক কোটি ৯২ লাখ। ‘ইকোনমিক কস্ট অব টোব্যাকো ইউজ ইন বাংলাদেশ : এ হেলথ কস্ট অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তামাক ব্যবহারের ক্ষতির কারণে চিকিৎসা ব্যয় ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। তামাকসংক্রান্ত অন্য একটি পরিসংখ্যান অনুসারে, বাংলাদেশে তামাকজাতীয় দ্রব্য ব্যবহারের কারণে নানা রোগে ভুগে বছরে এক লাখ ৬১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ইদানীং তামাক কোম্পানিগুলো শিশু-কিশোরদের ধূমপানে আকৃষ্ট করতে অভিনব কৌশল নিয়েছে। তামাকপণ্য প্রদর্শনকে বিজ্ঞাপন প্রচারের কৌশল হিসেবে ব্যবহারের জন্য তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেট বা মোড়কের ডিজাইনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে তামাক কোম্পানিগুলো। তারা শিশু-কিশোরদের আকর্ষণীয় খাবারের পণ্যগুলোর নিচেই সিগারেটের খালি মোড়ক এমনভাবে প্রদর্শন করছে যে, শিশু-কিশোররা সহজে আকৃষ্ট হচ্ছে এসব তামাকপণ্যে। দোকানদারকে আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে তামাক কোম্পানিগুলো এ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে থাকে। এটি অচিরেই বন্ধ করার দাবি করছে ধূমপানবিরোধী সংগঠন প্রজ্ঞা।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের এপিডেমিওলজির বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক সোহেল আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘যেকোনো বিক্রয় স্থলে তামাকজাত পণ্যের প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা উচিত। অন্য দিকে শিশু-কিশোরদের তামাকজাত পণ্য থেকে দূরে রাখতে শুধু বিক্রয় স্থলে তামাক পণ্যের প্রদর্শন নিষিদ্ধ করলেই চলবে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে কোনো দোকানে তামাকজাত পণ্য বিক্রিও নিষিদ্ধ করে দিতে হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) এর ২০১৬ সালের ‘স্মোক ফ্রি পলিসিস ইমপ্রোভ হেলথ ফোরকাস্ট’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, ‘বিক্রয় স্থলে তামাকজাত পণ্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হলে দৈনিক ধূমপানের প্রবণতা ৭ শতাংশ কমে যায়।’ এ প্রতিষ্ঠান ৭৭ দেশের তথ্য পর্যালোচনা করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে।
তামাক পণ্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ ইউরোপের ছয়টি দেশে এক গবেষণার পর ফলাফলে বলা হয়েছে, ‘কিশোর বয়সীদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা কমাতে তামাকপণ্য বিক্রয় স্থলে দেখানো বন্ধ করলে এর কার্যকর প্রভাব পড়ে। আইসল্যান্ড ও কানাডায় প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ধূমপানের হার ১০ শতাংশ কমেছে।’ অন্য দিকে নেপাল, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, নরওয়েসহ বিশ্বের ৫০ দেশ ইতোমধ্যে পয়েন্ট অব সেল বা বিক্রয় স্থলে তামাকজাত দ্রব্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, কোভিড-১৯ মহামারীতে ধূমপায়ীদের গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি অধূমপায়ীদের চেয়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি। ধূমপান করলে দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের সংক্রমণে (সিওপিডি) ধূমপানে মৃত্যুঝুঁকি অধূমপায়ীদের চেয়ে ১৩ গুণ বেশি (সিডিসি, টোব্যাকো ড্যাটা)। হৃদরোগ ও শ্বাসতন্ত্র বিভিন্ন অসুখের অন্যতম প্রধান কারণ তামাকজাত পণ্য। কারণ তামাকে থাকে সাত হাজারের বেশি রাসায়নিক পদার্থ, এর ৭০টি ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
