নিউজ ডেস্ক।।
“এডভোকেট সাহেব একটু বাসায় আছেন, চারটা উইল করার প্রস্তুতি নিয়ে আসবেন।”
ঠিক আছে, আমি আসছি।
যথা সময়ে এডভোকেট সাহেব আসলো।
উপস্থিত আছেন কবি গাজী আনিস সাহেব। সাবেক জেলা ছাত্রলীগ নেতা। স্থানীয় লোকজনের মূ্ল্যায়ন তিনি সফল ছাত্র নেতা ছিলেন। মানুষ হিসেবে ভালো। নির্ভর যোগ্য । মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা আছে তাঁর। তার সন্তানের মা মারা যাওয়ার পরে তিন মেয়েকে তিনি বাবা এবং মায়ের স্নেহ দিয়ে বড় করেছেন। মেয়েরা এখন এস এস সি ইন্টারে পড়ে। সন্তানের নানী নানার কাছে গাজী সাহেব দীর্ঘ সময়ের পরীক্ষীত ভালো জামাই, নাতীদের ভালো বাবা।
বাস,ট্রাক, এবং স্থানীয় জুয়েলারি দোকানের সাথে স্বর্নের ব্যবসাসহ সিজোনাল (সম্মানের সাথে) ব্যবসা ঢাকার সাথে করতেন।
আর্থিকভাবে সফল, একজন সফল ব্যবসায়ী গাজী আনিস সাহেব অবসরে কবিতা লিখতেন। কবিতা লেখার সময় তার দৃষ্টিতে থাকতো তাঁর প্রয়াত স্ত্রী। তাই কবিতায় ব্যথা দুঃখ বেদনা সুখ প্রাপ্তি হারানো বা না পাওয়া হাহাকার হু হু করে ঝরে পড়তে। যা প্রবল ভাবে পাঠকের হৃদয় নাড়িয়ে দিত। আবেগপ্রবণ পাঠক আর ফলোয়ারের সংখ্যা কেলকুলেটার দিয়ে হিসেবের পর্যায় চলে যায়। কত পাঠিকা সহানুভূতি আর আবেগের ডালা নিয়ে কবির কান ঝালাপালা করে ডাক্তারের কাছে পাঠাতে বাকি রেখেছেন। এরকম আবেগের কঠিন জলোচ্ছ্বাসে কবি এতটুকু না টলে হিমালয়ের মতো নিজের ব্যক্তিত্ব, চরিত্র, আর সন্তানদের জন্য অর্থ ধরে রেখেছেন। কোথাও এতটুকু টলে ঢলে পড়েন নি।
এডভোকেটকে যে ভদ্র মহিলা উইল তৈরি করে দেয়া জন্য ডেকেছেন, এই ঢাকা শহরে অনেকগুলো ফ্লাট এবং ডুপলেক্স বাড়ি আছে তার। কাকতালীয় ভাবে তাদের সন্তান নেই। সৃষ্টিকর্তা সম্পদ দিয়েছেন। সম্পদ পাহাড়া দেয়ার জন্য সন্তান নেই। এই শহরের টেলিভিশন চ্যানেলে তাদের প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপন দিত। একজন পাঠিকা হিসেবে এরকম একজন ধনাঢ্য মহিলার সাথে গাজী আনিসের জানাশুনা হয়।
গাজী আনিস সাহেবের তিনজন মেয়ে। ধনাঢ্য মহিলা গাজী আনিস সাহেবকে তার তিন মেয়ের জন্য তিনটি ডুপলেক্স বাড়ি লিখে নিতে অনেক বার বলেছেন। যাতে মেয়েদের জীবন নিরাপদ হয় তার জন্য গাজী আনিস সাহেবের মেয়েদের বাড়ি লিখে দিতে চান ধনাঢ্য মহিলা। মেয়েদের জন্য তিনটা বাড়ি গাজী সাহেব লিখে নিলে গাজী সাহেব কে একটা ফ্লাট লিখে দিবেন। যাতে গাজী সাহেবের মেয়েদের জন্য আর নিজের জন্য কোন টেনশন করতে না হয়।
এরপর শুধু এই ঢাকায় বসে কবিতা লিখবেন আর অবসর সময় বসে বসে গল্প লিখবেন। কুষ্টিয়া শহরে যেয়ে এসে বাস ট্রাক আর স্বর্নের ব্যবসা দেখলে কবিতা লেখায় “ডিস্ট্রাব” হবে।
একজন সাহিত্যানুরাগী হিসেবে ধনাঢ্য মহিলা সেটা মেনে নিতে পারেন না। তাই অনেক চেষ্টা করে ও গাজী সাহেবকে যখন সম্পদ বাড়ি ফ্লাট নিতে রাজি করাতে পারেন নি তখন ধনাঢ্য মহিলা নিজেই এডভোকেটকে ডেকে আনলেন বাসায়। এবার তিনি গাজী সাহেবের মেয়েদের বাড়ি লিখে দিয়েই ছাড়বেন। সবকিছু রেডি । শুধু গাজী সাহেব রাজী হলেই তিনটা ডুপলেক্স বাড়ি একটা ফ্লাট গাজী সাহেবের হয়ে যায়।
এডভোকেট সাহেব গাজী সাহেব কে বললেন ভাই আপনি এতো বোকা।
এতকরে দিতে চাচ্ছে আর আপনি নিতে চাচ্ছেন না।
এমন বোকা মানুষ ও হয়।
ধনাঢ্য মহিলা গাজী সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলেন, এতো বোকা মানুষ হয়!
গাজী সাহেব বিনয়ের সহিত বললেন, বাবা হিসেবে আমিই আমার মেয়েদের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ। আপনি দোয়া করবেন আমি যেন আমার সন্তানদের জন্য বেঁচে থাকতে পারি।
ধনাঢ্য মহিলা বললেন গাজী সাহেব এই যে এডভোকেটকে বাসায় ডেকে আনার পরও ফিরিয়ে দিলেন একদিন এই সম্পদের জন্য আপনাকে আফসোস করতে হবে।
সেদিনের জন্য আপনি আছেন। সেদিন আমার মেয়েদের জন্য আপনি আছেন।
ধনাঢ্য মহিলা: বাড়ি নিলেন না তাহলে আপনি আমার একটা অনুরোধ রাখেন!
গাজী সাহেব: বলুন কি করতে হবে?
ধনাঢ্য মহিলা: আপনার কুষ্টিয়া শহরের বিজনেস আপনি ঢাকায় শিপ্ট করেন। তাহলে আপনার কুষ্টিয়া আসা যাওয়া করা লাগবে না আর সাহিত্য চর্চায় কোন ডিস্ট্রাব হবে না।
গাজী সাহেব: আমার তো বাস ট্রাক গাড়ির ব্যবসা। সেগুলো তো ঢাকা শহরে হুট করে পারমিশন পাওয়া যাবে না। হুট করে তো এই বিজনেস শিপ্ট করা যায় না।
ধনাঢ্য মহিলা: আপনি সেই বোকাই রয়ে গেলেন। বাস ট্রাক ঢাকায় আনতে হবে কেন?
গাজী সাহেব: তাহলে?
ধনাঢ্য মহিলা: ওগুলো বিক্রি করে দেবেন।
গাজী সাহেব: তারপর?
ধনাঢ্য মহিলা: তার আর পর কি ! ওগুলো বিক্রি করে আপনার আর কয়টাকা হবে। ওগুলো এনে আমাদের ব্যবসার সাথে লাগিয়ে দিবেন মাসে মাসে আমাদের মোট বিজনেসে আপনার কত টাকা খাটতেছে সে অনুযায়ী লভ্যাংশ নিয়ে যাবেন। কোম্পানির যদি লাভ না হয় আপনি আপনার টাকার লাখে নূন্যতম একটা পারসেনটিজ প্রতিমাসে নিয়ে নিবেন। আপনার সামান্য কযটা টাকা। আপনি যেন লসে না পরেন।
এমন ভালো প্রস্তাব গাজী সাহেব কে এর আগে কেউ দেয়নি।
“আর হ্যা গাজী সাহেব এসব আপনি আমাদের বিজনেসে টাকা দেয়ার সময় লিখিত রাখবেন। টাকা পয়সার বিষয়ে আপনার ভাইকে তো নয়- ই, আমাকেও বিশ্বাস করবেন না। সব কিছু লিখে রাখা ভালো। সুন্নত।
গাজী সাহেব সুন্নাত পালন না করেই বাস ট্রাক বিক্রি করে , জুয়েলারির সাথে ডিল একটা দফারফা করে , ঢাকার সাথে বিজনেস পার্টির সাথে হিসেব নিকেশ শেষ করে এক কোটি আটাশ লক্ষ(১,২৮,০০,০০০) টাকা ধনাঢ্য মহিলার হাতে তুলে দেয়ার পর তিনি (ধনাঢ্য মহিলা) বললেন এগুলোর জন্য একটা লিখিত নিয়ে নিবেন। আর আরো তিশ লাখ টাকা এনে দুই কোটির একটা রাউন্ড ফিগার করে লিখিত টা নিয়ে নিবেন। আমি দুই কোটির একটা ডিট রেডি করি। আপনি আর ত্রিশ লাখ টাকা রেডি করে নিয়ে আসেন। দরকার হলে জমিটমি একটু বিক্রি করে দেন। আপনার তো সামান্য কয়টা টাকা। দুই কোটি হলে তা-ও একটা রাউন্ড ফিগার হলো।
গাজী সাহেব বাড়ি গিয়ে বাবার ভিটি থেকে ত্রিশ লাখ টাকা মূল্যের জমি বিক্রির চেষ্টা করলে বড় মেয়ে বলে, “বাবা দাদার জমি বিক্রি করে দিবা?”
মা তোদের নিয়ে আমরা ঢাকায় থাকব।
বড় মেয়ে বাবাকে থামাতে না পেরে নানুকে ঘটনাটা জানাল শাশুড়ি গাজী সাহেব কে বললেন, বাবা, বাপদাদার জমি বিক্রি করে বিজনেস না করলে হয় না।
বিজনেস যদি সফল না হয় তাহলে জমিও গেল…
এরকম সময় ধনাঢ্য মহিলার ফোন, গাজী সাহেব এক্সোপোর্টের একটা শিপমেন্ট ছিল আপনার ত্রিশ লাখ কালকের ভেতরে রেডি হলে আপনার দুই কোটি টাকা এখানে খাটিয়ে দিতাম।
জমি বিক্রি করতে না পেরে গাজী সাহেব তাঁর বিজনেস এক, আটাশের ভেতরে রাখার জন্য ধনাঢ্য মহিলা কে অনুরোধ করলে তিনি বললেন ঠিক আছে কি আর করা।
এরপর গাজী সাহেব ফোনে ধনাঢ্য মহিলা কে তেমন একটা রিস করতে পারেন না।
আপনার ডায়েলকৃত নাম্বারে এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
আস্তে আস্তে আনিস সাহেবের কাছে মনে হয় এলাকায় তাঁর বাস ট্রাক আর জুয়েলারির ব্যবসাই ভালো ছিল।
একজন কবি বা লেখক কবিতায় যেমন উদার নিজের ব্যর্থতায় নিজেকে ধ্বংশ করতে তেমনি মারমুখী। কবি তো নবী।
আমাদের মতো কোন সাধারণ মানুষ না।
সেই তিনটা ডুপলেক্স বাড়ি আর একটা ফ্লাট …
নিজকে সামলাতে না পেরে এক কোটি আটাশ লাখ টাকা ফেরত না পেয়ে গত চার জুলাই সোমবার বিকেলে ঢাকা প্রেস ক্লাবের সামনে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আশেপাশের মানুষ ঘটনা বুঝতে বুঝতে তাঁর শরীরের ৯০% পুরে যায়।
শেখ হাসিনা বার্ণ ইউনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে মেয়েদের এতিম করে যান।
মা নেই।
বাবা নেই!
কে দেখবে তাঁর মেয়েদের!
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
