আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সরকারিকৃত কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীগণ

নিজস্ব প্রতিবেদক।।
উপজেলা ভিত্তিক সরকারিকৃত কলেজগুলোর শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সরকারি বেতন-ভাতা চালু হওয়ার আগে যে বেতন পেতেন সরকারি বেতন চালু হওয়ার পর তা অনেক কমে গেছে বলে জানিয়েছেন অনেকে।

বিশেষ করে ৭ম গ্রেডের শিক্ষকদের বেতন এবং মান দুটোই কমেছে। এসব কলেজের ৭ম গ্রেডের শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ম গ্রেড-এ এবং বেতন ফিক্সেশন সে অনুসারেই করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারিকৃত তিনশতাধিক কলেজের মধ্যে শুধুমাত্র মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুর কে বি কলেজের শিক্ষকদের নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে ২০২১ সালের ২ নভেম্বর। “সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা – ২০১৮” অনুযায়ী সারা দেশের মধ্যে দীর্ঘ ৭ বছরের টানাপোড়েনের পর প্রথমবারের মতো নিয়োগ সম্পন্ন হওয়া কলেজ এটি।

কলেজটি ২০১৬ সালে সরকারিকরণের তালিকায় আসে এবং ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট থেকে সরকারি করা হয়। ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর কলেজটি সচিব কমিটির অনুমোদন পায়। সম্প্রতি এ কলেজের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বেতন-ভাতা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিধিমালা অনুসারে ৪র্থ, ৫ম, ৬ষ্ঠ, ৭ম এবং ৯ম গ্রেডের শিক্ষদের স্ব স্ব গ্রেড ও বেতনে ফিক্সেশন করার কথা থাকলেও কলেজটির ৭ম গ্রেডের শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ম গ্রেড-এ। তাদের বেতন ২৯ হাজার টাকা স্কেল থেকে কমিয়ে ২২ হাজার টাকা স্কেল-এ নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা জানান, বিষয়টি নিয়ে পূণরায় আবেদন করলে সমস্যা সমাধান করা হবে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের এমন মৌখিক আশ্বাসে তারা বর্তমান পে-ফিক্সেশন মেনে নিয়েছেন। দ্রুতই এ বিষয়ে মহাপরিচালক বরাবরে আবেদন করবেন বলে শিক্ষকদের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়।

এদিকে সরকারিকৃত কলেজগুলোর সার্বিক কাজে নিয়োজিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরকারি কলেজ শাখা-৫, এর উপসচিব আলমগীর হোসেনের সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা – ২০১৮ এর ৯ ধারা অনুসারে যাদের আগের পদ প্রভাষক তাদের প্রভাষক পদের সংশ্লিষ্ট গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপে অর্থাৎ ৯ম গ্রেড-এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

৭ম গ্রেড-এ নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়। তবে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের পে-ফিক্সেশন বর্তমান বেসিক অনুসারেই করা হবে। আর্থিকভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না।” মূলত আত্তীকরণ বিধিমালা ২০১৮ এর ৯ ধারায় শিক্ষকদের বেতন-ভাতাদি নির্ধারণ নিয়ে বলা হয়েছে, ‘অস্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীগণ, সংশ্লিষ্ট কলেজ সরকারিকরণের তারিখ হইতে, বিদ্যমান জাতীয় বেতন স্কেলের সংশ্লিষ্ট গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপে স্ব স্ব পদের বেতন ভাতাদি প্রাপ্য হইবেন।’

মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত এ কর্মকর্তা আর্থিকভাবে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না বললেও ডিজি অফিস এবং এজি অফিস তা মানতে নারাজ বলে জানান শিক্ষকরা। বাস্তবে দেখা যায়, বিক্রমপুর কে বি কলেজের ৭ম গ্রেডের শিক্ষকদের ২২ হাজার টাকা স্কেল-এ তিনটি ইনক্রিমেন্টসহ মোট বেসিক ধরা হয় ২৫ হাজার ৪৮০ টাকা যাদের বেসরকারি অবস্থায় ২৯ হাজার টাকা স্কেল-এ ৪টি ইনক্রিমেন্টসহ বেসিক ছিল ৩৫ হাজার ২৬০ টাকা। একজনের শিক্ষকের মাসিক মুল বেতন কমেছে ৯ হাজার ৭৮০ টাকা।

এই টাকার ৪০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া কমেছে ৩ হাজার ৯১২ টাকা। সর্বসাকুল্যে একজন শিক্ষকের মাসিক বেতন কমেছে ১৩ হাজার ৬৯২ টাকা। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকগণ বলছেন এটা অমানবিক! যেখানে চাকরি সরকারি হলে বেতন বাড়ার কথা সেখানে এত টাকা কমে যাওয়া মেনে নেওয়া যায় না বলে জানান তাঁরা।

এদিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তালিকায় “সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা – ২০১৮” অনুসারে সরকারি হওয়া নওগাঁ জেলার জাহাঙ্গীরপুর স্কুল এন্ড কলেজের কলেজ শাখার ৭ম গ্রেডপ্রাপ্ত ১৫ জন শিক্ষকও একই রকম বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। অথচ গত বছরের ২১ জুন “জাতীয়কৃত কলেজ শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা, ২০০০” অনুসারে নিয়োগ পাওয়া সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার সরকারি এমসি একাডেমি স্কুল এন্ড কলেজের কলেজ শাখার একই গ্রেডের অর্থাৎ ৭ম গ্রেডের শিক্ষকগণ ৯ম গ্রেড-এ নিয়োগ পেলেও তাদের বেতন স্কেল ২৮ হাজার ১০০ টাকা ফিক্সেশন করে তিনটি ইনক্রিমেন্টসহ মোট বেসিক নির্ধারণ করা হয়েছে ৩২ হাজার ৫৪০ টাকা।

প্রতিষ্ঠানটি সরকারিকরণের প্রক্রিয়ায় আসে ২০১৭ সালে এবং সরকারি হয় ২০১৮ সালের ২৫ এপ্রিল থেকে। সরকারিকরণের তালিকায় পরে আসলেও ‘আত্তীকরণ বিধিমালা ২০১৮’ প্রকাশের আগে জিও (Government order) জারি হওয়ার কারণে কলেজ শাখার শিক্ষকদের নিয়োগ সম্পন্ন হয় ২০০০ বিধিতে ক্যাডার হিসেবে।

একইরকম প্রতিষ্ঠান, একই গ্রেড, একইরকম নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং প্রায় কাছাকাছি সময়ে সরকারি হওয়া সত্বেও দুইরকমের বিধিমালার মারপ্যাঁচে পরে ২০১৮ বিধিতে নিয়োগ পাওয়া ৭ম গ্রেডের শিক্ষকগণ ২০০০ বিধিতে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক থেকে বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ৯ হাজার ৮৮৪ টাকা কম পাচ্ছেন। ২০১৮ বিধিতে ক্যাডার পদ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষকরা। সরকারিকৃত এসব কলেজের সহকারী লাইব্রেরিয়াগণ ১০ গ্রেড-এ নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও তাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে চতুর্দশ গ্রেডে। বেতন-ভাতাও কমছে সমান হারে।

এসব বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে সরকারি কলেজ স্বাধীনতা শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. শরীফ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “সরকারিকৃত কলেজগুলোর শিক্ষক-কর্মচারীদের গ্রেড ও বেতন নিচে নামিয়ে দেওয়া অমানবিক! সরকারি হওয়ার পর বেতন স্কেল কমে যাওয়া এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা দেশে নজিরবিহীন! আমাদের শিক্ষকদের ‘পে-প্রটেকশন’ দিয়ে এধরণের বৈষম্য অচিরেই বন্ধ করতে হবে। আমরা সেটা কখনও মেনে নিবনা।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি নিয়ে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় সাধারণ শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে লাগাতার কর্মসূচির দ্বারা দাবি আদায় করা হবে ইনশাআল্লাহ। “

তিনি আরও বলেন, মূলত আত্তীকরণ বিধিমালা ২০১৮ এর ৯ ধারর বিধানমতে ৭ম গ্রেড-এ নিয়োগ দেওয়া হলেও কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আবার ‘এমপিও নীতিমালা -২০২১’-এ শিক্ষকদের প্রথমবারের মতো সিনিয়র প্রভাষক পদে পদোন্নতি দিয়ে ৭ম গ্রেড প্রদানের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকলে সরকারিকৃত কলেজগুলোর ৭ম গ্রেডের শিক্ষকদেরও সিনিয়র প্রভাষক পদে নিয়োগ দিয়ে এ সমস্যার সমাধান করা যায়। এক্ষেত্রে বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা যেতে পারে। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.