এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষাব্যবস্থার গ্যাড়াকলে পিষ্ট শিক্ষার্থীরা

আয়েশা।।

‘লেখাপড়া করে যে, গাড়িচাপা পড়ে সে’! হ্যাঁ, গাড়িচাপা না পড়লেও শিক্ষার অব্যবস্থাপনার নিচে ঠিকই চাপা পড়ে পঙ্গুত্ববরণ করছে দেশের কোটি শিক্ষার্থী। বাংলাদেশে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ১৮-৩০ বছর। এর আগে ও পরে একজন শিক্ষিত ব্যক্তি চাকরিতে প্রবেশে অক্ষম।

অথচ শিক্ষাব্যবস্থাই আমাদের সক্ষম সময়টা কেড়ে নিচ্ছে। তাহলে এ সময় শিক্ষার্থীরা পড়বে, নাকি চাকরি করবে? আমাদের দেশে উচ্চতর শিক্ষা শেষ করতে করতেই অধিকাংশ শিক্ষার্থী ২৭-২৮ বছরে পা দিয়ে ফেলে। যেমন, এসএসসি পাস ১৬ বছরে।

এরপর এইচএসসি আরও দুই বছর, অর্থাৎ চাকরির বয়স শুরু। কিন্তু এইচএসসি পাস শিক্ষার্থীকে কে চাকরি দেবে? এরপর গ্র্যাজুয়েশনের জন্য ভর্তিযুদ্ধ। পর্যাপ্ত আসনসংখ্যা না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী প্রথম বছর ভর্তি হতে পারে না। সেখানে এক থেকে দেড় বছর শেষ। এরপর গ্র্যাজুয়েশনের লম্বা সেশনজট আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক চিত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের জটে থাকছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। অন্যদের কথা আর না-ই বললাম।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জটে পড়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। এসব শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা ও ফলাফলের দাবিতে রীতিমতো আন্দোলনে নামতে হচ্ছে। আন্দোলন করতে গিয়ে পঙ্গু হওয়ার ঘটনাও আছে। পুলিশের মার খেতে হচ্ছে অনেক শিক্ষার্থীকে। এটা শুধু বাংলাদেশেই সম্ভব। যেখানে পরীক্ষার দাবিতে আন্দোলন করা লাগে।

যাহোক, চার বছরের অনার্স শেষ হতে ৬-৭ বছর লাগছে। এরপর মাস্টার্স। এক বছরের কোর্সটি নির্ধারিত সময়ে কোন বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে শেষ হয়— এটি এখন রীতিমতো ধাঁধা। পড়ালেখা শেষ হলে চাকরির জন্য হাতে থাকে মাত্র ২-৩ বছর।

যেখানে একজন মানুষের ১২টি বছর পাবার কথা ছিল; অথচ চাকরির যোগ্যতা অর্জনের পর যোগ্যতা শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রায় পুরো সময় লেখাপড়ার পেছনে ব্যয় হয়ে যায়। লেখাপড়া শেষ করতে গিয়ে ২৭-২৮ বছর বয়সেও একজন শিক্ষার্থী চাকরিজীবী হয়ে উঠতে পারে না।

যেখানে ১৮ বছরের মধ্যে শিক্ষাজীবন সম্পন্ন না করে ২৭-২৮-এ নিয়ে উচ্চতর শিক্ষা সম্পন্ন করা হয়, সেখানে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ১৮ থেকে ৩০ রাখা কি হাস্যকর নয়? ১৮-৩০ এ বয়সটায় যদি একজন শিক্ষার্থী লেখাপড়াই করবে, তাহলে চাকরি করবে কখন প্রশ্ন রয়ে যায়।

আবার যখন ২৭-২৮ বছরে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করে চাকরিতে প্রবেশের জন্য পা বাড়ায়, তখন তার কাছে যোগ্যতা হিসেবে চাওয়া হয় অভিজ্ঞতা। আর সরকারি চাকরির জন্য আলাদা পড়াশোনার প্রয়োজন পড়ে, তাহলে একজন শিক্ষার্থী ২৭-২৮ বছর শেষ করে কোন শিক্ষায় শিক্ষিত হলো— যা সামান্য চাকরির জন্য যথেষ্ট নয়? এমন শিক্ষা গ্রহণ করার কি আদৌ প্রয়োজন আছে?

চাকরিতে সুযোগ না পেয়ে যখন একজন শিক্ষার্থী কোনো সাধারণ পেশা যেমন- কৃষিকাজ, দিনমজুরি, রিকশা চালানো ইত্যাদি করতে যায়, তখন সমাজ তার দিকে শত ধিক ছুড়ে দেয়। যে কাজ একজন অশিক্ষিত লোক করতে গেলে কেউ এমন করে না। ফলে কি হয়? একজন শিক্ষার্থী না হতে পারে চাকরিজীবী, না হতে পারে দিনমজুর। ফলে একজন শিক্ষিত লোক হয়ে যায় পঙ্গুর চেয়েও অধম।

একজন পঙ্গু অন্যের দুয়ারে হাত পাততে পারে। কিন্তু একজন শিক্ষিত বেকার তা করতে পারে না। দিন শেষে আত্মহত্যার কাতারে নতুন নতুন সংখ্যা যোগ হয়। অনেকেই প্রস্তুতির জন্য চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ বছর পর্যন্ত করার দাবি করছে। কিন্তু সেটা দিতে নারাজ কর্তৃপক্ষ। অথচ এই ৩৫ তো চাইবার কোনো প্রয়োজন ছিল না যদি ১৮-এর পূর্বেই শিক্ষাজীবন সম্পন্ন হতো।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, একজন মানুষের ৪০-এর পর থেকে শারীরিক সক্ষমতা কমতে থাকে। ৩০-এ গিয়ে একজন মানুষ সমাজকে কতটুকুই দিতে পারে? অথচ একজন শিক্ষার্থীকে যদি ১৮তেই শিক্ষাজীবন থেকে কর্মজীবনে যাবার সুযোগ দেয়া হতো, তাহলে সে কি সমাজকে আরও বেশি কিছু দিতে পারত না? সে কি দেশকে উন্নতির পথে নিয়ে যেতে পারত না? তাই ৩৫-এর দরকার নেই। ১৮-৩০-এ সময়টার ওপর শিক্ষাব্যবস্থার যেন হস্তক্ষেপ না পড়ে— এটাই কাম্য। আমাদের দাবি, শিক্ষার সীমা ১৮ বছর হোক।

এরপর চাকরির জন্য বাছাইকৃত ব্যক্তিকে কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করা হোক। তাহলেই নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে সমাজ অনেক কিছু পেতে পারে। নয়তো নতুন প্রজন্মই হয়ে যাবে সমাজের সবচেয়ে বড় বোঝা।এবার দেখা যাক বিশ্বের অন্যান্য দেশে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা কত। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো এত কম বয়স বেঁধে দেয়নি বিশ্বের কোনো দেশ।

তথ্যমতে, প্রতিবেশী দেশ ভারতে রাজ্যভেদে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ থেকে ৪৫ বছর। পশ্চিমবঙ্গে ৪০ বছর। দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ শ্রীলঙ্কায় সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়স ৪৫ বছর। এছাড়া তাইওয়ানে বয়স সর্বোচ্চ ৩৫ হলেও সরকারি চাকরিতে যোগ দেয়ার সুযোগ থাকে।

ইন্দোনেশিয়ায় ৪৫ বছর। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে ৩৫ বছর। সুইডেনে ৪৭ বছর পর্যন্ত থাকে। ইউরোপের দেশ ফ্রান্সে ৪০ বছর বয়স হলেও কেউ সরকারি চাকরি পেতে পারেন। ইতালিতে ৩৫ বছর পর্যন্ত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ৫৯ বছর বয়সেও একজন নাগরিক সরকারি চাকরিতে যোগ দিতে পারেন। কানাডায় সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ ৪৭ বছর হলে শেষ হয়ে যায়।

সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোন দেশ বা নীতি অনুসরণ করে, তা খুঁজে পাইনি। রাষ্ট্রে কর্তাব্যক্তিদের কাছে এর ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু তাদের ব্যাখ্যা আর বেঁধে দেয়া অযৌক্তিক নিয়মের ফাঁদে পিষ্ট হয়ে বেকারত্বের অভিশাপ মাথায় নিয়ে ধুঁকছে দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী। এ যাবৎকালে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কিন্তু কোনোটিই কর্তাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি বা আমলে নেননি। এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে যে বিষয়টি, আজ সেটি নিয়েই বলা যাক। শিক্ষার্থীদের একটি পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয়েছে যে, এইচএসসি পর্যন্ত সিলেবাস পরিবর্তন করে সার্বিক বিষয়ে জ্ঞানার্জনের ব্যবস্থা করা।

এরপর চাকরির জন্য পরীক্ষা নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাছাইকৃতদের শিক্ষানবিস সময়কালের আওতায় কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। যেমন : যে ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, তাকে বুয়েটে পড়ানো হবে এবং তার কর্মক্ষেত্রে ইন্টার্ন করানো হবে। এতে সে হাতে-কলমে শিখতে পারবে। একইসঙ্গে পারিশ্রমিক হিসেবে যে অর্থ পাবে, তাতে তার পরিবারের খরচ মেটানো যাবে।

একইভাবে ডাক্তার, প্রশাসক, ম্যাজস্ট্রেট, শিক্ষক ইত্যাদি বিষয়ে পড়ানো এবং প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এক্ষেত্রে যারা ভবিষ্যতে শিক্ষকতা করতে আগ্রহী, তাদের পড়াশোনার পাশাপাশি বস্তিবাসী ও ছিন্নমূল মানুষের শিক্ষায় নিয়োজিত করে পারিশ্রমিক হিসেবে অর্থ প্রদান করলে একদিকে যেমন অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আওতায় আনা সম্ভব; আবার নির্ধারিত কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের আগেই শিক্ষার্থীরা অর্থ উপার্জন করে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারবে।

এমনকি যারা রাজনীতিবিদ হতে চায়, তাদের ‘রাজনীতি বিজ্ঞান’ পড়ানো হবে। এতে দেশে দক্ষ রাজনীতিবিদ তৈরি হবে। ফলে নোংরা রাজনীতিচর্চা বন্ধের পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত হবে।

অন্যদিকে বুয়েটে পড়ালেখা করে পুলিশ, বিজ্ঞানে পড়ে সাংবাদিক, মেডিকেলে পড়ে মুদি দোকানি আর আইনে পড়ে প্রাইমারি শিক্ষক হওয়ার মতো ঘটনা ঘটবে না। এতে বুয়েট-মেডিকেলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মমুখী শিক্ষাদানে ভূমিকা রাখবে এবং সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় বন্ধ হবে। বাংলা কিংবা ইতিহাসের ছাত্র দিয়ে গবেষণাগার পরিচালিত হবে না।

লেখক : শিক্ষার্থী


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.