মিজানুর রহমান।।
পূর্ব পাকিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশি রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় জাতিসংঘের ত্রাণকার্য পরিচালনায় পদে পদে প্রতিবন্ধকতা ছিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের। পূর্ব পাকিস্তানের শান্তিকামী জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া ওই যুদ্ধে প্রায় কোটি শরণার্থী সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। দেশের ভেতরে যারা ছিলেন তাদের উল্লেখযোগ্য অংশের দিন কাটছিলো অনাহারে-অর্ধাহারে।
সংকটময় সেই মুহূর্তে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র সরকার এবং দেশটির স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ১০ কোটি ডলারের ত্রাণকার্য পরিচালনা করে। যদিও ভারতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের সুরক্ষাসহ মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের জন্য যা যা করণীয় তার সবই করেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, এতে মুখ্য ভূমিকা ছিল তার। তবে সেদিন দিল্লির আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিশ্বের অনেকেই শরণার্থীদের প্রতি সহায়তার হাত প্রশস্ত করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রও তার বাইরে ছিল না। উল্লেখ্য, পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক গণহত্যা, খুন-ধর্ষণসহ পাকিস্তানিদের বর্বর অত্যাচার তথা একতরফা যুদ্ধ সত্ত্বেও তাৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের নেতৃত্বাধীন মার্কিন সরকারের সঙ্গে ঘাতক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সম্পর্কের চিড় ধরেনি। তিনি শেষ পর্যন্ত ইয়াহিয়ার সমর্থক ছিলেন।
এ নিয়ে বিস্তর সমালোচনা রয়েছে। তবে স্বাধীনতার পরপরই মার্কিন সরকার বাংলাদেশকে স্বীকার করে নেয় এবং ১৯৭২ সালের আজকের এই দিনে (৪ঠা এপ্রিল) বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়।
বিরক্তি নিয়ে ইয়াহিয়ার ত্রাণকার্যে সম্মতি: মার্কিন নথি বলছে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে ত্রাণকার্যে সম্মতি দিয়েছিলেন। তার একগুঁয়েমি সত্ত্বেও কীভাবে পূর্ব পাকিস্তান এবং ভারতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের উপযুক্ত পরিবেশে স্থানান্তর (সি-১৩০ বিমান পরিচালনা) ক্যাম্প নির্মাণ, কলেরাসহ অন্যান্য রোগ-বালাই’র হাত থেকে সুরক্ষায় তাদের খাদ্য-বস্ত্র, চিকিৎসা সহ মৌলিক বিষয়াদি নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দিয়ে গেছে তার বিস্তারিত রয়েছে মার্কিন গোপন নথিতে। ১৯৭১ সালের ১৭ই আগস্ট থেকে ২৩শে আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা এবং ইসলামাবাদ সফর করে যাওয়া উচ্চ পর্যায়ের মার্কিন প্রতিনিধিদলের সফর বিষয়ক ওই গোপন রিপোর্টটি (নথি) অবমুক্ত বা ডিক্লাসিফাইট ঘোষণা হয়েছে ২০০৫ সালে।
তাৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর ওই রিপোর্টটি পাঠানো হয় ১৯৭১ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর। অবমুক্ত হওয়া নথিতে ’৭০-এর ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি জান্তাদের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে এ অঞ্চল যে ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল তা তুলে ধরা হয়েছে। ১২ পৃষ্ঠার ওই নথিতে শরণার্থীদের রক্ষায় ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ অন্যদের সহায়তার বিষয়টিও স্থান পেয়েছে।
মার্কিন নথিতে জীবন বাঁচাতে ত্রাণকার্য পরিচালনা বিশেষত: যুদ্ধকবলিত পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আটকে পড়াদের মানবেতর জীবনযাপনের কথা রয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আমাদের মূল্যায়নে সম্মত হন যে, সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে মারাত্মক খাদ্য ঘাটতি দেখা দেবে, যদি না খাদ্যের বৃহৎ আমদানি কার্যকরভাবে বিতরণ করা যায়। যদি দুর্ভিক্ষ এড়ানো না হয়, তবে পূর্ব পাকিস্তানে তার রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। রিপোর্টে প্রকাশ, তাই ইয়াহিয়া খান খাদ্য মজুত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সরকারি সরবরাহ ডিপো থেকে টেকসই বিতরণকে প্রধান কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেন।
তখনো বেশির ভাগ ডিপোতে মাত্র তিন/চার সপ্তাহের খাদ্য মজুত ছিল। এমনকি রেশন কমিয়ে এবং চট্টগ্রাম ও খুলনার সমুদ্র বন্দরে মজুত হিসাব করেও সংকট কাটার কোনো ইঙ্গিত ছিল না। মার্কিন রিপোর্টে তখন বলা হয়, তাৎক্ষণিক কাজ হচ্ছে ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে ডিসেম্বরের মধ্যে সমুদ্র বন্দরগুলো থেকে বিভিন্ন এলাকায় খাদ্য পৌঁছানো। রিপোর্টে বলা হয়, তাদের সহায়তায় পরিচালিত জাতিসংঘের ত্রাণ মিশনের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করতেন ইয়াহিয়া খান। পূর্ব পাকিস্তানে ত্রাণ সহায়তার জন্য তিনি বিরক্তি নিয়ে জাতিসংঘ সদর দপ্তর প্রেরিত ৩৮ সদস্যের গ্রুপকে অনুমোদন দেন। ইয়াহিয়া বিশ্বাস করেননি যে, জাতিসংঘ তার কার্যাদি সঠিকভাবে সম্পাদন করতে পারবে।
যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত ছিল যে, পূর্ব পাকিস্তানে ত্রাণকার্য জাতিসংঘের মাধ্যমেই পরিচালিত হবে, তাই ইয়াহিয়া খান জাতিসংঘের ত্রাণ মিশনকে গ্রহণ করেছিলেন। রিপোর্টে বলা হয়, তিনি জাতিসংঘের ১১৭ জন অতিরিক্ত ফিল্ড কর্মীকে গ্রহণ করবেন বলে মনে হচ্ছে, যদি আমরা (যুক্তরাষ্ট্র) আবার তাকে এ জন্য অনুরোধ করি। রিপোর্টে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানে খাদ্য, পরিবহন, বণ্টন এবং ত্রাণ কার্যক্রমের বিভিন্ন দায়িত্বে আটজন কর্মকর্তা যে যার মতো করে কাজ করছিলেন। তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় ছিল না, বা সামগ্রিক দায়িত্বে কেউ ছিলেন না।
ইয়াহিয়া খান এ নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়লেও তিনি তা প্রথমে পাত্তা দিতে চাননি। অবশ্য পরে তিনি তা মেনে নিতে বাধ্য হন। একজন সচিবকে পূর্ব পাকিস্তানের খাদ্য ও ত্রাণ সমন্বয়কারীর দায়িত্ব দেন। মার্কিন রিপোর্টে একজন বাঙালি বেসামরিক গভর্নরের ত্রাণকার্যে সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, ইয়াহিয়া খান ডাঃ আবদুল মুতালিব মালেককে পূর্ব পাকিস্তানে নিয়োগের ঘোষণার মধ্যদিয়ে এ বার্তা দিতে চান যে, তার নীতি হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তান সরকারকে বেসামরিকীকরণ।
মিস্টার মালেক তার একজন অনুগত এবং বিশ্বস্ত বাঙালি কর্মকর্তা ছিলেন। সেই সময়ের অবস্থা তুলে ধরে মার্কিন রিপোর্টে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানে খাদ্য ও ত্রাণ সমন্বয়ে একমাত্র বিকল্প ছিল নৌ-পথ। যুদ্ধকালে ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সড়ক ও রেলপথ নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু মুক্তিবাহিনী চট্টগ্রাম উত্তর থেকে রেল ও সড়ক পরিবহন আটকে দিয়েছিল। তারা জীবন-পণ লড়াইয়ে ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধে রেলের পরিবহন ক্ষমতা স্বাভাবিকের চেয়ে কমে ২০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা হয়েছিল।
মার্কিন রিপোর্টে এটা জোর দিয়ে বলা হয় যে, পূর্ব পাকিস্তানে যে অবস্থা বিদ্যমান তাতে খাদ্য ও ত্রাণসামগ্রীর চলাচল নদীপথেই হতে হবে। যদিও নৌ-যোগাযোগ উন্নয়নে ইয়াহিয়া খান নিজের অজ্ঞানতা এবং অবহেলার জন্য অনুশোচনায় ভুগছিলেন। সেই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে ২৯টি উপকূলীয় জাহাজ ছিল, যার ২৫টি ছিল মার্কিন সহায়তা বা অর্থায়নে কেনা। সমুদ্র থেকে উপকূলীয় নদী বন্দরগুলোতে খাদ্য পরিবহনে এগুলো ব্যবহৃত হচ্ছিলো। ইয়াহিয়া খান কম পানিতে চলাচল উপযোগী বোট, বার্জ এবং নদী পারাপারের ফেরি চেয়েছিলেন বলে মার্কিন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।
রিপোর্ট মতে, ত্রাণ কর্মসূচির বাস্তবায়নে নানা কারণে সেই সময়ে ধীরগতি ছিল। ত্রাণ কার্যক্রমের নিরাপত্তা ও স্বাতন্ত্র্যতার প্রশ্নে পাকিস্তান সরকার এবং মার্কিন অবস্থানে ফারাক ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য ছিল কোনো অবস্থাতেই ত্রাণ কার্যক্রমকে জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে নেয়া যাবে না। খাদ্য এবং ত্রাণ পরিবহনকে সাধারণ এবং সামরিক কার্গোগুলোর সঙ্গে গুলিয়ে বা মিলিয়ে ফেলা যাবে না। ত্রাণ পরিবহনে নিযুক্ত যানগুলো কেবলমাত্র ত্রাণ সামগ্রীই পরিবহন করবেন। এমনকি যদি ত্রাণ যথাস্থানে পৌঁছে দেয়ার পর (ফিরতি পথে) খালি আসতে হয় তাও আসবে।
কোনো অবস্থাতেই ত্রাণ পরিবহন কাজে নিয়োজিত যানে পাকিস্তানি সৈন্যদের রসদ বা খাদ্য পরিবহন করা যাবে না। ওই নথিতে এটা উল্লেখ করা হয় যে, মার্কিন মিশনের ঢাকা সফর এবং সরজমিন পর্যবেক্ষণের আগে ত্রাণ আর সেনা রসদ একসঙ্গেই পরিবহন করা হতো। ইয়াহিয়া খান এবং তার গভর্নর টিক্কা খান উভয়েই বিশ্বাস করতেন ত্রাণ পরিবহন এবং বিতরণে সামরিক নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলে রিপোর্টে প্রতীয়মান।
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের তৎকালীন কো-অর্ডিনেটর ডিজাস্টার, রিলিফ ফর ইস্ট পাকিস্তান মুরিস জে উইলিয়ামের নেতৃত্বে আগস্টে ঢাকা সফর করে যাওয়া মার্কিন প্রতিনিধি দলের রিপোর্টে এ-ও বলা হয়, জাতিসংঘ মিশনের প্রধান কাজ হবে ত্রাণসামগ্রী পরিবহনে নিযুক্ত যানের ওপর জাতিসংঘের ফ্ল্যাগ বা প্রতীক সাঁটানো। মানবিক ত্রাণ কার্যক্রমকে অবশ্যই নিরপেক্ষ এবং যুদ্ধের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে।
রিপোর্টে এই বলে সতর্ক করা হয় যে, পাকিস্তান সরকার, মুক্তিবাহিনী (রিপোর্টে তাদের বিদ্রোহী হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়) এবং ভারত সরকার-এই তিনপক্ষ যদি জাতিসংঘকে গ্রহণ না করে তবে ত্রাণ মিশনে ব্যর্থ হবে। রিপোর্টে এ-ও বলা হয়, গভর্নর টিক্কা খান মার্কিনিদের দৃষ্টিভঙ্গিতে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, তবে তিনি তা উড়িয়ে দেননি। টিক্কা খান বিশ্বাস করতেন যে, জাতিসংঘ ত্রাণ পরিবহনের নিরাপত্তায় ব্যর্থ হবে। মার্কিন কর্মকর্তা তার রিপোর্টে বলেন, আমরা পাকিস্তান সরকার এবং জাতিসংঘ কর্মকর্তা উভয়ের কাছে দৃঢ়তার সঙ্গে এই বার্তা দিয়েছি যে, ত্রাণবাহী জাহাজে কোনো মিশ্রণ চলবে না। ত্রাণ এবং অ-ত্রাণমূলক কার্গো আলাদা হবে।
ত্রাণবাহী জাহাজে ফিরতি পথে পাটও বহন করা যাবে না, কারণ পাট রপ্তানিতে বিদ্রোহীদের (বাঙালি মুক্তিকামী জনতা) বাধা রয়েছে। ত্রাণসামগ্রী পরিবহন ও বিতরণের জন্য পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ বা এসকর্টের প্রস্তাবও নাকচ করা হয় বলে রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। মার্কিন রিপোর্টে বলা হয় পূর্ব পাকিস্তানে ত্রাণকার্য জটিল জায়গায় পৌঁছেছে। এ অবস্থার উত্তরণে অবশ্যই জাতিসংঘকে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। যদিও এতে পাকিস্তান রুষ্ট হবে। কিন্তু এটা আমাদের করতেই হবে।
মার্কিন ত্রাণ সহায়তার বিস্তারিত: স্টেট ডিপার্টমেন্টের ডিক্লাসিফাইড বিভিন্ন নথি ঘেঁটে এটা প্রতীয়মান যে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার একাত্তরে ভারতে শরণার্থী সংকট এবং পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধকালীন উদ্বাস্তু সংকট মোকাবিলায় নানাবিদ মানবিক কর্ম পরিচালনায় সহায়তা করেছে।
“ভারত: রিফিউজি ১৯৭১”- শীর্ষক এক মার্কিন দলিলে দেখানো হয়েছে যে, এতে যুক্তরাষ্ট্র মোট ১০২.৩ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে। আর এতে অন্যান্য রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা ছিল ১৯১.২ মিলিয়ন। তবে এ সংকট মোকাবিলায় ভারত একাই (নিজস্ব তহবিল) ব্যয় করেছে ৩৩৫ মিলিয়ন ডলার। ওই দলিলে ভারতে আশ্রয় নেয়া বাঙালি শরণার্থীদের জাতিসংঘ এবং দিল্লির সঙ্গে সমন্বয় করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে সহায়তা দিয়েছে তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানে পাক বাহিনীর আক্রমণের ৪ দিনের মাথায় মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের অধীন অফিস অব দ্য রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেশন (ওআরএম) পূর্ব পাকিস্তানে শরণার্থী সংকট হতে পারে মর্মে তা মোকাবিলায় পরিকল্পনা হাতে নেয়। পরবর্তীতে সংকট দৃশ্যমান হলে পরিকল্পনায় সংযোজন ঘটে। তাৎক্ষণিকভাবে এটা বিবেচনায় নেয়া হয় যে, কেয়ার, ক্যাথলিক রিলিফ সার্ভিস, চার্চ ওয়ার্ল্ড সার্ভিস এবং লুথেরান ওয়ার্ল্ড সার্ভিস এবং চার স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান যাদের ভারতে সেবাকর্মের অনুমোদন রয়েছে তাদের কাজে লাগানোর।
একই সঙ্গে পররাষ্ট্র দপ্তর এটা মনস্থির করে যে, তারা বড় ত্রাণকার্য জাতিসংঘ এবং এর অধীন সংস্থাগুলোর মাধ্যমেই ভারতের শরণার্থী অঞ্চল এবং পূর্ব পাকিস্তানে পরিচালনা করবে। সেই সময়ে জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান-এর একটি অনুরোধও ছিল পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থী সংকটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক সহায়তা প্রদানের। দলিল বলছে, বিভিন্ন সময়ে মাার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দিল্লি এবং জাতিসংঘের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সহায়তা করেছে, তার মধ্যে মোটা দাগে যে কর্মগুলো ছিল- তা হলো শেল্টার বা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে সহায়তা, কলেরা মহামারি প্রতিরোধে ১০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন এবং সহায়ক সরঞ্জামাদি প্রদান।
ত্রিপুরার ঘিঞ্জি পরিবেশ থেকে শরণার্থীদের মাার্কিন বিমানে করে আসামে বসবাসের উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তরে সহায়তা, শিশু এবং মায়েদের উচ্চ পুষ্টিমাণের খাদ্য সরবরাহ, কম্বল প্রদান এবং সরবরাহ কর্মে সহায়তা ইত্যাদি। মার্কিন নথি বলছে, শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় ভারত সরকারের ওপর চাপ কমাতে সর্বোতভাবে পাশে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট প্রশ্নে নিক্সন প্রশাসন সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে থাকলেও মানবিক সংকট মোকাবিলায় ওয়াশিংটন তথা স্টেট ডিপার্টমেন্ট জাতিসংঘ এবং দিল্লির সঙ্গে সমন্বয় করে যে কোনো কাজে সক্রিয় থেকেছে। আর বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের অধিকার প্রশ্নে মার্কিন কংগ্রেস ও সিনেটের অনেকে কেবল সমর্থনই দেননি, তারা রীতিমতো সোচ্চার ছিলেন।
সেই সময়ে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে একজন বাঙালি কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, হার্ভার্ড থেকে আইনে ডিগ্রিধারী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা মনে করেন নিক্সন প্রশাসন প্রভাবিত হয়েছে কংগ্রেসে সিনেটর কেনেডি, স্যাক্সবে এবং চার্চের প্রতিক্রিয়া এবং সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়ের কারণে। তবে তিনি বলেন, আমরা জানি পাকিস্তান সরকার মার্কিন প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ তথা ভর করেছিলো, কিন্তু আমাদের ছিল কংগ্রেস। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সেই রিপোর্টে বাংলাদেশের প্রতি মস্কোর একনিষ্ঠ সমর্থন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তার বিষয়টিও স্থান পেয়েছিল।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
