এইমাত্র পাওয়া

যানজট সহনীয় হওয়ার ফর্মুলা দিলেন অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান

নিজস্ব প্রতিনিধি।।

স্বল্পমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ নিলে ঢাকা মহানগরীর যানজটের কিছুটা উন্নতি করে সচল করা যাবে। এ জন্য নিতে হবে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু পরিকল্পনা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তিন ঘণ্টা পর অফিস শুরু হলে ঢাকার যানজট পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হবে বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক এই সাধারণ সম্পাদক মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সময় ব্যবস্থাপনা করতে পারলে রাজধানী ঢাকার বর্তমান যানজটের ব্যাপক উন্নতি হবে।

তিনি বলেন, ঢাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্লাস শুরুর সময়ই সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শুরু হয়ে থাকে। ফলে সকালেই হয়ে থাকে ব্যাপক যানজট। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুরুর কমপক্ষে তিন ঘণ্টা পর অফিস-আদালত শুরু হলে ঢাকার যানজট অনেকটাই সহনীয় হয়ে যাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটির সাথে অফিস ছুটির সময়ের মধ্যেও একই ধরনের পার্থক্য থাকতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সপ্তাহে পাঁচ দিন খোলা না রেখে সপ্তাহে চার দিনে নিয়ে এলেও যানজটের লাগাম টেনে ধরা যাবে।

অন্য দিকে সরকারি-বেসরকারি ছুটির দিনগুলোতে অর্থাৎ শুক্র ও শনিবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা যেতে পারে। বর্তমানে ঢাকা মহানগরীর ব্যাংকগুলো শুরু হয় সকাল ১০টায়। একই ব্যবস্থাপনায় ঢাকা মহানগরীর সবগুলো অফিসকে নিয়ে আসা উচিত বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। ড. আদিল মুহাম্মদ খান একান্ত সাক্ষাৎকারে নয়া দিগন্তকে বলেন, ঢাকা মহানগরীতে এলাকাভেদে সপ্তাহে এক দিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। এই বন্ধের দিন সপ্তাহে দুই দিন করা হলেও যানজটের উন্নতি হবে। এতে ব্যবসায় সাময়িক ক্ষতি হলেও ব্যবসায়ীরা এবং মানুষ অভ্যস্ত হয়ে গেলে ব্যবসা আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।

মাঝখান থেকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা একটু বেশি বিশ্রাম নিতে পারবে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে দুই দিন ছুটি হলে অনেকেই ব্যবসাকে অনলাইন-ভিত্তিক করে ফেলতে পারবে। ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, এটা ছাড়াও লেন, পার্কিং এবং হকার ব্যবস্থাপনা করেও যানজট কমিয়ে আনা সম্ভব। এর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ কিছু রাস্তাকে ‘ওয়ানওয়ে’ করে দিলেও যানজটের উন্নতি হবে, যানবাহনগুলো এখনকার চেয়ে বেশি গতিতে চলাচল করতে পারবে। অন্য দিকে ঢাকায় নামাতে হবে পর্যাপ্ত এবং আরামদায়ক দ্বিতল বাস।

বিলাসবহুল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস চলাচল বাড়িয়ে দিলে আজ যারা নিজের গাড়ি কেনার চিন্তা করছেন অথবা একজন মাত্র ব্যক্তি গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামছেন তারা ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে বিলাসবহুল বাসে চড়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন। ফলে একই সাথে অনেক যাত্রী বহন করতে পারলে প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যাও কমে যাবে রাস্তায়। গণপরিবহন হিসেবে বাসকে প্রাধান্য দেয়া হলে দীর্ঘ সময়ের জন্য যানজটের উন্নতি হবে।

২০০৫ সালের ঢাকার স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানে বাসকে প্রাধান্য দেয়ার কথা বলা হলেও এখন বাস সার্ভিস অনেকটা অবহেলার নাম। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য এখনকার বাস সার্ভিস উপযুক্ত নয়। দূরের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলবাস চালু করলেও যানজটের উন্নতি হবে বলে মনে করেন ড. আদিল মুহাম্মদ। তিনি বলেন, কয়েকদিন থেকে শোনা যাচ্ছে, ঢাকায় ২৯০ কিলোমিটার সাবওয়ে নির্মাণ করা হবে। প্রকৃতপক্ষে এগুলো খুবই ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। সাবওয়ে নির্মাণের কাজ শুরু হলে ঢাকা শহরকে আরো বেশি অচল করে দেবে।

এর পরিবর্তে মনোরেলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। চালু করতে হবে কমিউটার ট্রেন সার্ভিস। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে গাজীপুর হয়ে নরসিংদী পর্যন্ত ট্রেন সার্ভিস চালু করতে পারলে ঢাকার অনেক মানুষ দিনে এসে আবার রাতে ঢাকা ছেড়ে চলে যাবে। ফলে তাদের পরিবারকেও ঢাকায় থাকতে হবে না। এ ধরনের রেল সার্ভিস চালু করতে পারলে কয়েক লাখ মানুষ স্থায়ীভাবে ঢাকার বাইরে বাসবাস করবে। এভাবে ঢাকায় যানজট কমিয়ে আনা যাবে।

ড. আদিল মুহাম্মদ বলেন, ঢাকার ফুটপাথের অবস্থা আরো উন্নত করে দিতে পারলে অনেকেই হেঁটে চলাচল করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। তারা গাড়ি অথবা রিকশা ব্যবহার করবে না, এতেও যানজটের উন্নতি হবে। এ ছাড়া স্বল্পগতির রিকশার পরিবর্তে বেশি গতির অটো সার্ভিস চালু করতে পারলে রিকশার কারণে সৃষ্ট জটও কমে যাবে। ড. আদিল মুহাম্মদ বলেন, ঢাকাকে যানজট মুক্ত করতে হলে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করলে যানজট পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

এক দশক আগেও রাজধানী ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। বর্তমানে তা সাত কিলোমিটারে নেমে এসেছে। সড়কে যানজটের কারণে প্রতিদিন রাজধানীবাসীর ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এখন এক কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা লেগে যায়। ঢাকার যানজটের কারণে বছরে অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে ৩৮০ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ।

ফলে ঢাকা পরিণত হচ্ছে একটি মৃত শহরে। মানুষের সাথে তাল মিলিয়ে বাড়ছে গাড়ির সংখ্যা; কিন্তু সে হারে রাস্তা বাড়ছে না। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, যানজটের মূল কারণ হচ্ছে মানুষ। ঢাকায় এলেই কাজ পেয়ে যাবো এই ধারণা পাল্টাতে হবে। আর যানজট কমাতে হলে ঢাকার জনসংখ্যা কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করতেই হবে, যেন বাধ্য না হলে কাউকে ঢাকায় থাকতে না হয়।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.