এইমাত্র পাওয়া

বাড়তি ক্লাসের নামে ১০ টাকার বেতন ৬০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

সরকারি স্কুলে ঢালাওভাবে সকল শিক্ষার্থীর অতিরিক্ত ক্লাশ জোরপূর্বক চাপিয়ে দিয়ে দশ টাকার বেতনের বদলে ৬০০ টাকা বেতন নিতে বাধ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে।

কিশোরগঞ্জের ভৈরব শহরের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যাপিঠ সরকারি কে.বি পাইলট মডেল হাইস্কুল। গতবছর স্কুলটি সরকারিকরণ করা হয়েছে। সরকারি হওয়ার পর করোনা মহামারির কারণে সরকারি নিদের্শনা অনুযায়ী সপ্তাহে একদিন ক্লাস হতো। কিন্তু স্কুলের প্রধান শিক্ষক ভালো রেজাল্টের অজুহাত দেখিয়ে সপ্তাহে আরও অতিরিক্ত পাঁচদিন ক্লাস বাধ্যতামুলক করেন।

অতিরিক্ত ক্লাসে নিয়ে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের অভিযোগ না থাকলেও প্রতিমাসে দশ টাকা বেতনের সাথে আরও অতিরিক্ত বেতন হিসেবে ৬শ টাকা পরিশোধে বাধ্যতামুলক করায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে গরীব ও অসহায় সাধারণ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের মাঝে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায় , প্রতিটি শ্রেণির তিনটি শাখায় ৬০ জন করে মিলে ১৮০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেছে। ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণিতে পড়াশোনা করেন প্রায় ৯ শতাধিক শিক্ষার্থী। এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর আর্থিক অবস্থা অনেক দুর্বল। তাদের সরকারি বেতন মাসে ১০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে ওই স্কুলে শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন বাবদ ৬০০ টাকা ও পরীক্ষা ফিস বাবদ ৫০ টাকা করে পরিশোধ করার জন্য আগামী ২২ জানুয়ারি সময় দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদেরকে।

তবে যারা ছয়শত পঞ্চাশ টাকা বেতন না দিবে তাদের টিসি দিয়ে বের করা এবং অ্যাসাইনমেন্ট খাতায় জমা না নেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের ভয় দেখানো কারণে এসব বিষয় নিয়ে ভয়ে শিক্ষার্থীরা সরাসরি প্রতিবাদ করতে পারছে না বলে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের দাবি।

৬ষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের মার্চ মাস থেকে মে মাস পর্যন্ত তিন মাসের সিট দিয়েছে এক্সট্রা ক্লাসের। প্রতি মাস শেষে এই সিটের মধ্য থেকে পরীক্ষা নেওয়া হবে বলা হয়েছে স্কুল থেকে। এই পরীক্ষার জন্য ৫০ টাকা ফি দিতে হবে এবং এক মাস ক্লাসের জন্য সাথে আরো ৬০০ টাকা দিতে হবে ।

সপ্তম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী বলেন, সকাল সোয়া ১০ থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত এর মধ্যে আমাদের তিনটা ক্লাস হয়। আর এই ক্লাসগুলো এক্সট্রা ক্লাস হিসেবেই করানো হয়। যদি কেউ এক্সট্রা ক্লাস করতে না আসে তাহলে স্যাররা বলে টিসি নিয়ে চলে গিয়ে অন্য স্কুলে চলে যেতে।

এছাড়া দশম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী বলেন, আমরা যদি এক্সট্রা ক্লাস না করি তাহলে আমাদের অ্যাসাইমেন্ট জমা নিবে না বলা হয়েছে। এমনকি এক্সট্রা ক্লাস শুরু হওয়ার পর যারা ক্লাস করতে আসেনি তারা শ্রেণি শিক্ষকের কাছে তাদের অ্যাসাইমেন্ট জমা নিবেনা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৬ষ্ঠ শ্রেণি পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক জানান, তার দুই সন্তান সরকারি কেবি পাইলট হাইস্কুলে পড়াশোনা করছে। রাজমিস্ত্রি স্বামীর পক্ষে সংসার চলানো যেখানে দায় সেখানে অতিরিক্ত ক্লাসের নামে ৬টাকা করে মাসিক বেতন দেয়া সম্ভব নয়। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় ও স্কুলের বেতন নিয়ে হিমসিম খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ভেবে ছিলাম বড় ছেলেকে যখন সরকারি স্কুলে ভর্তি করাইছি তাহলে কম টাকায় পড়াতে পারব। এখন দেখি মরার উপর খারার ঘা। অতিরিক্ত ক্লাস বাধ্যতামুক করার প্রতিবাদ জানান ভুক্তভোগী ওই অভিভাবক।

আরেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক জানান, তার স্বামী চা বিক্রি করে সংসার চালায়। প্রতিমাসে দশ টাকার বেতন ৬৫০ টাকা করায় সন্তানকে পড়ালেখা করানোই এখন দায়।

আরো একাধিক শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা জানান, স্কুলে অনেক শিক্ষার্থী আছে যাদের পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল। সরকারি স্কুলে মেধার ভিত্তিতে ভর্তি করেও সরকারি স্কুলে অতিরিক্ত টাকা গুণতে হচ্ছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের উপর জোরপূর্বক এক্সট্রা ক্লাস চাপিয়ে দিয়েছে এবং সরকারি বেতনের বাহিরে অতিরিক্ত বেতন নির্ধারণ করেছে ৬শ টাকা। যা সবার পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। অতিরিক্ত ক্লাসের নামে হয়রানি বন্ধের দাবি জানান তারা।

এই বিষয়ে ভৈরবে সরকারি কে.বি পাইলট মডেল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন, করোনার কারণে আড়াই বছর ছেলে মেয়েদের পড়ালেখার বিঘ্ন ঘটে। আর এই আড়াই বছর পড়ালেখা থেকে দূরে থাকাতে তাদের যে ঘাটতি হয়েছে এই ঘাটতিটা পূরণের জন্য ও পড়াশুনার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারি আইন মেনেই আমি আমার স্কুলের শিক্ষকদের নিয়ে স্কুলের ক্লাসসমূহের বাহিরে অতিরিক্ত সময়ে এই এক্সট্রা ক্লাসের ব্যবস্থা করেছি যেন ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার মান ও রেজাল্ট ভালো হয়।

শিক্ষার্থীদের ভালো রেজাল্টের জন্য এই এক্সট্রা ক্লাসটা পুরো বছরই চলবে বলে জানান। তিনি আরো বলেন, সরকার নির্ধারিত অনুযায়ী যে ফি ধার্য ধরা আছে তা আমরা নিচ্ছি না। সরকারি ফির অর্ধেকের চেয়ে আরো অনেক কম নিচ্ছি। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সপ্তাহে ৩ দিন ক্লাস করালে মাসে ১২শ টাকা ফি ধার্য করা আছে। আর আমি সপ্তাহে ৬ দিন ক্লাস করিয়ে পরীক্ষার ফিসহ ৬৫০ টাকা নির্ধারণ করেছি। তবে যারা ফি দিতে অক্ষম তারা অবহিত করলে ফি মওকুফ করা হবে বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এম আবু ওবায়দা আলী মুঠোফোনে জানান, আইনগতভাবে উনি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিতে পারে না। মনগড়া ভাবে সরকারি স্কুলে কিভাবে নেয়। কোন পরিপত্র আছে কিনা প্রধান শিক্ষককে দেখাতে বলেন। বিষয়টি ইউএনও মহোদয়কে অবগত করার পরামর্শ দেন তিনি।

সরকারি কেবি পাইলট মডেল হাইস্কুলের স্কুলের সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান সবুজ বলেন, যদি বেআইনি ভাবে অতিরিক্ত ক্লাসের নামে টাকা নেয় সেটা দুঃখজনক। দূর্বল শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিশেষ ক্লাস নিতে পারে। নিজের ইচ্ছাতে যদি কোন শিক্ষার্থী ক্লাস করতে চাই সেটা অন্য বিষয়। তবে কারো উপর চাপিয়ে দেয়া অন্যায়। এবিষয়ে প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে তিনি বলে জানান ।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.