এইমাত্র পাওয়া

মহামারি কখন কিভাবে শেষ হবে

ডাঃ মোঃতৌহিদ হোসাইন।।

করোনা মহামারী কখন কিভাবে শেষ হবে তা বর্তমান বিশ্ববাসীর কাছে মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন। করোনা মানুষের বানানো কোনো মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র নয় যে আগে থেকেই বলা যাবে কিভাবে কতক্ষণ পর কোথায় গিয়ে আঘাত হেনে সব ধ্বংস করে নিজেও শেষ হয়ে যাবে। তবে ভাইরাল প্যান্ডেমিক ইতিহাসের পাতা অধ্যয়ন করে এবং ভাইরাসের চরিত্র বিশ্লেষণ করে এ ব্যাপারে কিছুটা পূর্বাভাস দেয়া যায়।

টেক্সাস স্টেট ইউনিভার্সিটির ক্লিনিকাল ল্যাবরেটরি সাইন্সের অধ্যাপক কোভিড-১৯ শেষ হওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পূর্বেকার এবং বর্তমানে চলমান ভাইরাল মহামারীর চরিত্র বিশ্লেষণ করে মতামত ব্যক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে বহুধা বিভক্ত ধারণা দিচ্ছেন। মহামারীটি শেষ হবে কবে বলতে বোঝানো হচ্ছে কখন কোভিড-১৯ মানুষের এমন নিয়ন্ত্রণে আসবে, যখন এর উপস্থিতি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না।

যুক্তরাজ্য সরকার নভেম্বর, ২০২১ সালে এই প্যান্ডেমিক কবে শেষ হবে তার একটা লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। এতে ২০২২-২৬ সালের মধ্যে অতিমারী এই কোভিড-১৯ কে তিনটি সম্ভাব্য টাইম ফ্রেমের মধ্যে বেঁধে ফেলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে লক্ষ্যমাত্রাও ভ্যাকসিনেশন প্রোগ্রাম ও ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা, স্বাস্থ্যবিধি মানা বা না মানা, ভাইরাস শনাক্তকরণ, অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা ও নতুন ভ্যারিয়েন্টের উৎপত্তির ওপর নির্ভর করছে।

তিনটি টাইম ফ্রেমের প্রথমটি হলো অপ্টিমিস্টিক সিনারিও : এতে বলা হয়েছে, মহামারীটি ২০২২-২০২৩ সালের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে অর্থাৎ ভাইরাসটি সিজনাল ফ্লুতে রূপ নেবে।

দ্বিতীয়টি হলো মধ্যবর্তী টাইমফ্রেমের সিনারিও : এতে ধারণা করা হচ্ছে মহামারীটি ২০২৩-২০২৪ সালের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণে আসবে। এই টাইম ফ্রেমটাই বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হচ্ছে। বলা হচ্ছে, যদি আরো দুই বছরও করোনা থেকে যায়, তা হলেও এই সময়ে শুধু প্রতি শীতে দুর্বল ভাইরাল ঢেউয়ের মোকাবেলা করতে হতে পারে।

তৃতীয়টি হলো পেসিমিস্টিক বা সবচেয়ে খারাপ সিনারিও : এতে ধারণা করা হচ্ছে, এই মহামারী ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রলম্বিত হতে পারে। ফলে আবারো প্রয়োজনে লকডাউন-শাটডাউনের মতো নিষেধাজ্ঞার আওতায় চলে আসতে হতে পারে। তবে এর পক্ষে সবচেয়ে কম মত দেখা যাচ্ছে।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের ইমিউনোলজির স্বনামধন্য অধ্যাপক ডানি আল্টমান বলেছেন, ‘প্যান্ডেমিকের শেষ হওয়ার লক্ষণ হলো এর আরো নম্বর ১ এর নিচে নেমে আসা যাতে নতুন ভ্যারিয়েন্ট ফরমেশনের সম্ভাবনা কমে যাবে। কিন্তু এখনো আমরা বিশ্বের টিকা বৈষম্য ও অসচেতনতা দূর করতে পারিনি। অনুন্নত বিশ্বে ৪ শতাংশ লোককেও এক ডোজ টিকার ব্যবস্থা করতে পারিনি। আমি তো দেখছি ভাইরাস বনাম মানুষের একটি ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ যা ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করেই আগামী ১৮-২৪ মাস চালিয়ে যেতে হবে।’ ‘ভাইরাসের সাথেই আমাদের বসবাস’- এ ধরনের মনোভাব নিজেদের অক্ষমতা এবং পরাজয়ের মনোভাব।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে পরবর্তী ভ্যারিয়েন্ট যা স্বাভাবিক নিয়মেই আসছে তার চরিত্র কেমন হবে। গত দুই বছর ভাইরাসটি অনবরত নিজেকে খাপখাইয়ে নিয়েছে। এ সময়ে বেশির ভাগ মানুষ ছিল আন-ভ্যাকসিনেটেড। আগামী ছয় মাসের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষ ভ্যাকসিনেটেড হয়ে গেলে ভাইরাসটিকে মানবসমাজে প্রবহমান থাকতে হলে ভ্যাকসিন ইমিউন হতেই হবে। এ জন্যই আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগামী ভ্যারিয়েন্ট হবে অতিসংক্রামক এবং ওমিক্রনের চেয়েও বেশি অ্যান্টিবডি ফাঁকি দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন।

পরবর্তী ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন কেমন হবে এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির প্যাথলজি ও মলিকুলার মেডিসিনের অধ্যাপক কারেন মসম্যান বলেছেন, ‘গত দুই বছরে ভাইরাসের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে এই চরিত্রই খুঁজে পেয়েছি যে, ভবিষ্যৎ ভ্যারিয়েন্ট অবশ্যম্ভাবী তবে সব ভ্যারিয়েন্টই প্রভাব বিস্তার করার মতো নয়। একটি সফল ভাইরাস সেটিকেই বলব যেটা বেশি সংক্রমণশীল কিন্তু কম উপসর্গ সৃষ্টিকারী। আবার এটাও ঠিক যে অনেক মিউটেশন যুগপৎভাবে একটা সিভিয়ার ফর্মের ভ্যারিয়েন্টও তৈরি করে ফেলতে পারে। এটি সম্ভব হয় তখনই যখন ভাইরাসের র‌্যাপলিকেশন এবং মিউটেশনকালীন সময়ে নিজদের মধ্যকার ইন্টারঅ্যাকশনের কারণে অনাকাক্সিক্ষত একটি ভ্যারিয়েন্ট জন্মলাভ করে।

সম্প্রতি আমেরিকার ফ্রেড হাচিনসন ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টারের বিজ্ঞানী জেসি বøুম তার গবেষণাপত্রে আলোকপাত করেছেন। করোনার পরের রূপটি নিয়ে তার দু’টি আশঙ্কার কথা বলেছেন।

একটা হলো, ওমিক্রন নিজের রূপ সম্পূর্ণ বদলে নতুন চেহারা নেবে। ওমিক্রন বি.এ.১ এবং ওমিক্রন বি.এ.২ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি সাব-ভ্যারিয়েন্ট তৈরি করে নেবে এই ওমিক্রন। আরেকটি হলো, ওমিক্রন আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে যাবে। তার বদলে সামনে চলে আসবে করোনার সম্পূর্ণ নতুন কোনো ভ্যারিয়েন্ট।

প্রায় একই মত পোষণ করেন ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের গবেষক লুসি থ্রোনেরও। ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের গবেষক মাইকেল চানের মতে, ‘এখন পর্যন্ত এমন কোনো অথেন্টিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, পরের ভ্যারিয়েন্টটি খুব দুর্বল কিছু হতে চলেছে। এমন হতেই পারে পরের রূপটি নাক ও গলায় অন্যভাবে সংক্রমণ ঘটাল, শরীরের কোষের অন্যভাবে ক্ষতি করল।’

মিসিগান ইউনিভার্সিটির অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও ইনফেকশাস ডিজিজ এপিডেমিওলজিস্ট ড. অব্রি গর্ডনের মতে, করোনা অন্য রেস্পিরেটরি ভাইরাসগুলোর মতোই শীতকালে একটু প্রকোপ বেশি এবং গ্রীষ্মকালে কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখিয়ে বছরের পর বছর চলতে থাকবে। এভাবেই কোভিড ইনফেকশন-কোভিড ইঞ্জেকশনে ইমিউনিটি তৈরি হয়ে একপর্যায়ে ভাইরাসটি দুর্বল হতে বাধ্য। এ ব্যাপারে প্রায় সবাই একমত যে ভাইরাসটির বর্তমান প্যান্ডেমিসিটি যখন দুর্বল এন্ডেমিসিটিতে রূপ নেবে তখনই ধরে নেয়া হবে পৃথিবীবাসী কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে।

হোয়াইট হাউজ চিফ এডভাইজার ড. অ্যান্থনি ফাউসি অন্য অধিকাংশের সাথে একমত যে, কোভিড-১৯ পৃথিবী থেকে কখনোই একেবারে বিদায় হবে না। যেমন বিদায় করা সম্ভব হয়নি ইনফ্লুয়েঞ্জার জীবাণু। ইনফ্লুয়েঞ্জাকে এন্ডেমিক স্টেজে রাখতে এর ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পর থেকে অদ্যাবধি প্রতি বছর নতুন নতুন ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে একে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। বছর বছর নতুন ভ্যাকসিন প্রয়োগ করার কারণ মূলত দু’টি। প্রথমত, প্রতি বছর ভ্যাকসিন প্রয়োগের ফলে যে ইমিউনিটি তৈরি হয়, ছয় মাস পর থেকেই তা কমতে থাকে এবং পরের বছর তা আর কোনো কাজেই আসে না।

দ্বিতীয়ত, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস ক্রমাগতভাবে বারবার জেনেটিক মিউটেশন হয়। এই জেনেটিক পরিবর্তন মূলত ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সারফেসে থাকা হিমএগ্লুটিনিন (এইচএ) এবং নিউরামিনিডেজ (এনএ) নামক এন্টিজেনিক প্রোটিনে ঘটে থাকে।
এক কথায় এন্টিজেনিক ড্রিফট বৈশিষ্ট্যের কারণেই যেমন তা দিয়ে ক্রস প্রটেকশন হয়, আবার ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্তও হয়। তবে আক্রান্তের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মৃদু উপসর্গযুক্ত হয়ে থাকে। অতএব বলা যায়, বছর বছর যে নতুন ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন লাগে ভাইরাসের জেনেটিক বৈশিষ্ট্য তার প্রধান কারণ। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে মিউটেশনে এর স্পাইক প্রোটিনে ছোটখাটো পরিবর্তন হয়। ফলে এখানেও কিছু ক্রস প্রটেকশন পায়। এখানেই ইনফ্লুয়েঞ্জা ও করোনাভাইরাসের বড় মিল ও অমিল। ইনফ্লুয়েঞ্জার হয় ড্রিফটিং-শিফটিং আর করোনাভাইরাসে হয় নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্ট। সুতরাং উভয়ের ক্ষেত্রেই সামান্য ব্যতিক্রম নিয়ে একই ঘটনা ঘটছে এবং ভবিষ্যতে ঘটবে বলেই মনে হয়।

ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসে অ্যান্টিজেনিক শিফট জাতীয় পরিবর্তনের কারণে ১৯১৮ সালে বড় ধরনের মহামারীর পর গত ১০০ বছরে চারটি প্যান্ডেমিক ফ্লুর মতো ঘটনা ঘটেছিল কিন্তু কোনোটাই আগের মতো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি ভ্যাকসিন প্রয়োগের কারণে। সর্বশেষ ২০০৯ সালে উত্তর আমেরিকায় মানুষ ও পাখিদের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস সোয়াইন ফ্লু আকারে দেখা দিয়েছিল কিন্তু বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। অন্য দিকে করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে ঘনঘন মিউটেশন হয়ে স্পাইক প্রোটিনে পরিবর্তন হয়ে নানা ভ্যারিয়েন্টে রূপান্তরিত হচ্ছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, ১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জার এইচ১এন১ ভাইরাসের ঢেউয়ের সাথে করোনা ওয়েভের চরিত্রের যথেষ্ট মিল রয়েছে। এরপর ১৯৫৭ সালে (এইচ২এন২)এবং ১৯৬৮ সালে (এইচ৩এন২) ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস এন্টিজেনিক শিফটিংয়ের কারণে গত শতাব্দীতে চার-পাঁচ প্যান্ডেমিক আকার ধারণ করেছিল। করোনার এন্ডেমিক হওয়ার পর মাঝে মধ্যে নতুন ভ্যারিয়েন্টের উদ্ভবের কারণে প্যান্ডেমিক হয়ে মানবজাতিকে কষ্ট দেয়া বিচিত্র কিছু নয়।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান,
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, শের-ই-বাংলা নগর,


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.