নিউজ ডেস্ক।।
ইউক্রেনের বন্দরে আটকে থাকা বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘এমভি বাংলার সমৃদ্ধি’র কর্মকর্তা ও নাবিকদের নামিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম খান নয়া দিগন্তকে জানান, আলভিয়া বন্দরে আটকে পড়া বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজের ২৮ নাবিককে উদ্ধার করে নিরাপদ শেল্টারে নেয়া হয়।
নিহত থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুরের লাশ জাহাজের ফ্রিজারে সংরক্ষণ করা হয়েছে বলেও জানানো হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএসসির নির্বাহী পরিচালক ড. পীযূষ দত্ত জানান, যুদ্ধের ডামাঢোলে জাহাজটি ইউক্রেন না পাঠানোর সুযোগ ছিল না।
চার্টারার যদি যেতে চায় আইনগতভাবে না পাঠানোর সুযোগ নেই। ক্যাপ্টেনের পারফরম্যান্সে আমরা সন্তুষ্ট। তারা জীবনবাজি রেখে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন ক্ষয়ক্ষতি কমানোর। তিনি বলেন, বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজে রকেট হামলায় থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমান মারা গেছেন। জাহাজের বাকি ২৮ জন নাবিক-ক্রু অক্ষত আছেন। তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার আগে বন্দরের তীর থেকে কাউকে সেফটি ও সিকিউরিটি নিশ্চিত করতে হবে।
এটা ইউক্রেন সরকার, আমাদের সরকার, দূতাবাস কিংবা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকেও হতে পারে। যেকোনো এক জায়গা থেকে পেলেও আমরা সে ক্ষেত্রে জাহাজের নাবিক-ক্রুদের নামার অনুমতি দেবো। এ দিকে নিহত ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমান আরিফের (২৯) ক্ষতবিক্ষত লাশ জাহাজের ফ্রিজেই সংরক্ষণ করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে বিএসসির মহাব্যবস্থাপক ক্যাপ্টেন মো: মুজিবুর রহমান নয়া দিগন্তকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, অনেকটা সরাসরি তার ওপর বিস্ফোরণ ঘটেছে বিধায় তার দেহ বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাহাজে বাকি ২৮ নাবিক অক্ষত ও সুস্থ আছেন। আমরা তাদের কিভাবে নিরাপদে আনা যায়, বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করছি।
তাদের মধ্যে দু’জন নারী ক্যাডেটও আছেন। জাহাজের ক্যাপ্টেনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের পরবর্তী করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাদের কিভাবে নিরাপদে জাহাজ থেকে নামানো যায় সেই চেষ্টা আমরা নিচ্ছি। তাই কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগ হচ্ছে। ইউক্রেনের পাশের দেশ পোল্যান্ডে আমাদের দূতাবাস জাহাজ ক্যাপ্টেনের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে বলেও তিনি জানান। এত বড় একটা দুর্ঘটনায় আটকে পড়া জাহাজটির কর্মকর্তাও নাবিকদের মনোবল বেশ কমেছে বলেও তিনি জানান। জাহাজে ৩০ দিনের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি, খাবার ও পানি রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে রেশনিং করলে হয়তো আরো কিছুদিন বেশি চলবে।
গত বুধবার স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ৯টা) বিএসসির মালিকানাধীন ‘এমভি বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজে রকেট হামলা হয়। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জাহাজটি গত ২২ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে পৌঁছে। দেশটিতে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরু হয়ে যাওয়ায় ২৯ জন জাহাজী কর্মকর্তা-নাবিকসহ সেখানেই আটকা পড়ে জাহাজটি। ইউক্রেন থেকে সিরামিকের কাঁচামাল নিয়ে তাদের ইতালিতে যাওয়ার কথা ছিল।
বিএসসি সূত্র জানিয়েছে, বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজটি যেখানে নোঙ্গর করে আছে সেখান থেকে মূল সাগরে যেতে ৬০ নটিক্যাল মাইল পথ পার হতে হয়। সেজন্য স্থানীয় পাইলট দরকার, যে পথ দেখিয়ে জাহাজটিকে বের করে নেবে।
কিন্তু যুদ্ধের মধ্যে তা পাওয়া যাচ্ছে না। বিএসসির বক্তব্য : এ দিকে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) পক্ষ হতে বলা হয়েছে, এমভি বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজটি ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর বিএসসির বহরে যুক্ত হয়। যুক্ত হওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরে সাধারণ পণ্য পরিবহন করে আসছে।
এর ধারাবাহিকতায় ডেনিস-ভিত্তিক চার্টারার ডেল্টা কর্প-এর সিঙ্গাপুর অফিস জাহাজটি পণ্য পরিবহনের জন্য ভাড়া নেয়। যার কারণে ভারত থেকে স্টিল কার্গো নিয়ে তুরস্কের বিভিন্ন বন্দরে ডিসচার্জ করে। সর্বশেষ বন্দর ছিল তুরস্কের ইরাগলি, যেখান থেকে কার্গো ডিসচার্জ সম্পন্ন করে গত ২১ ফেব্রুয়ারি পণ্য বোঝাইয়ের জন্য ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরের উদ্দেশে রওনা হয় এবং ২২ ফেব্রুয়ারি আউটার এ্যাংকরেজে পৌঁছায়। পরদিন স্থানীয় সময় রাত ৯টায় পাইলটের মাধ্যমে একত্রে ২১টি জাহাজ কনভয় আকারে ইনার এ্যাংকরেজে পৌঁছায়।
২৪ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সময় ভোর ৫টা নাগাদ রাশিয়া আক্রমণ করলে লোডিং অবিলম্বে বাতিল করে জাহাজটি সেইল আউট (বন্দর ত্যাগ) করার জন্য চার্টারার এবং বিএসসি থেকে মাস্টারকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়। কোন বন্দরে প্রবেশ করলে বন্দর ত্যাগের অনুমতি ও বন্দর নির্ধারিত পাইলটের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ওই সময় বন্দর পাইলট প্রদান ও অপারেশন কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। যার ফলে জাহাজের নাবিক প্রায় ৬০ নটিকেল মাইল চ্যানেল যার মধ্যে সাতটি বিপজ্জনক বাঁক দিয়ে পাড়ি দেয়া পাইলট ছাড়া নেভিগেশন নিরাপদ মনে না করায় পরের দিন সকালের জন্য অপেক্ষা করেন।
পরের দিন সকালে চ্যানেলে রাশিয়া কর্তৃক মাইন বসানো হয়েছে মর্মে মাস্টারের কাছে সংবাদ থাকায় তিনি সেইলিং বাতিল করেন এবং জাহাজটি ওই স্থানে অবস্থান করছিল। গত ২ মার্চ স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা নাগাদ জাহাজের ব্রিজে রকেট হামলা হয় এবং ব্রিজে আগুন ধরে যায়। সবার সম্মিলিত চেষ্টায় আগুন নেভানো সম্ভব হয়; কিন্তু থার্ড ইঞ্জিনিয়ার বরগুনা জেলার বেতাগী থানার হোসনাবাদ গ্রামের হাদিসুর রহমান মৃত্যুবরণ করেন।
অন্যান্য ক্রুরা নিরাপদে আছেন। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জাহাজে বিদ্যুৎ, খাদ্য, পানীয়, বাংকার (জ্বালানি) পর্যাপ্ত পরিমাণ মজুদ থাকায় বাইরের চেয়ে নিরাপদ বিবেচনায় জাহাজে অবস্থান শ্রেয় হওয়ায় ক্রুরা জাহাজে অবস্থান করছেন।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
