বিচার চেয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি: প্রধান শিক্ষক

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

বিচার চেয়ে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হচ্ছেন ‘মায়াদ্বীপ জেলেশিশু পাঠশালা’-এর প্রধান শিক্ষক পাখি ও তার পরিবার। আসামিরা সব জামিনে বেরিয়ে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা সাজিয়েছে। বৃহস্পতিবার (১০ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টায় নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই জানান পাখি ও তার পরিবার।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত ২২ জানুয়ারি সোনারগাঁয়ের নুনেরটেকের মায়াদ্বীপে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সুবর্ণগ্রাম ফাউন্ডেশন পরিচালিত সুবিধাবঞ্চিত জেলে সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য অবৈতনিক স্কুল ‘মায়াদ্বীপ জেলেশিশু পাঠশালাটি বন্ধ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে স্কুলের প্রধান শিক্ষক মরিয়ম আক্তার পাখির বাড়িতে একদল দুষ্কৃতকারী হামলা করে।

এ ঘটনায় শিক্ষকের দেড় বছরের ছোট বাচ্চাটিও তাদের হামলার নৃশংসতা থেকে রেহাই পায়নি। পাখির মাকে মারধর করা হয় এবং তার দুইভাই শরিফ ও রাশেদকে নৃশংসভাবে পেটানো হয়। তারপর এই ঘটনায় সোনারগাঁ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন তারা। সেই মামলা তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে মাত্র একজন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়, তবে জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। তবে বর্তমানে পাখিরা গ্রামছাড়া।

ভুক্তভোগীরা একটা জায়গায় আত্মগোপন করে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন উল্লেখ করে বলা হয়, তারা এখন বের হতে ভয় পান। অথচ গ্রামে তাদের গবাদি পশুগুলো অনাহারে, অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। তাদের আয়ের প্রধান উৎস মুদি দোকানটি বন্ধ হয়ে গেছে এবং সুবর্ণগ্রাম ফাউন্ডেশনের স্কুলটি বন্ধ রয়েছে, যে স্কুলটিতে গ্রামের হত-দরিদ্র পরিবারের ছেলে মেয়েরা পড়াশোনার সুযোগ পায়। ঘটনার পর হাসপাতালে পাখিরা চিকিৎসা নিয়েছেন। এরপর তারা আর গ্রামে ফিরতে পারেননি।

ভয়ে সোনারগাঁয়ে সংবাদ সম্মেলন না করে নারায়ণগঞ্জে এসেছেন উল্লেখ করে বলা হয়, তারা সোনারগাঁয়ে সংবাদ সম্মেলন না করে ভয়ে নারায়ণগঞ্জে চলে এসেছেন।

‘কী ঘটেছিল সে রাতে’ বর্ণনা দিয়ে তারা বলেন, গত ২২ জানুয়ারি রাত ৯টায় সোনারগাঁ উপজেলার নুনেরটেক গ্রামের মায়াদ্বীপে ‘মায়াদ্বীপ জেলেশিশু পাঠশালা’র প্রধান শিক্ষক মরিয়ম আক্তার পাখির বাড়িতে হামলা করা হয়। হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হন স্কুলের প্রধান শিক্ষিক মরিয়ম আক্তার পাখি (২৬), তার ১৫ মাসের মেয়ে পারিশা আক্তার, মা নাসিমা বেগম (৫০), ছোট ভাই মো. শরিফ (২৪) ও মো. রাশেদ (২০)। একইসঙ্গে আসবাবপত্র ভাঙচুর করে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করা হয়। ওই দিন রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বারদী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাশেমের নেতৃত্বে আনোয়ার, মেহেদী, শাহাপরান, দ্বীন ইসলাস, ফয়সাল, রাকিব, রহিম আলী, রমজান, শরিফ, ফাহিম, মাসুদ, মঙ্গল আলী, ইউছুফ, অজ্ঞাত আরও কয়েকজনসহ প্রায় ২০-২২ জন সন্ত্রাসী লাঠিসোটা, দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক মরিয়ম আক্তার পাখির বাড়িতে হামলা চালায়। তারা সে সময় তাকে, তার দুই ভাই ও মাকে মারধর করে। পাখিকে ঘুষি দিতে গেলে তার ১৫ মাসের মেয়ে পারিশার মাথায় আঘাত লাগে। পরবর্তীতে তাদের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন আসলেও কাউকে ঘরের ভেতরে ঢুকতে দেয়নি সন্ত্রাসীরা।

তারা বলেন, তারা জীবনের নিরাপত্তার ভয়ে তাদের গ্রামের বাড়িতে ফিরতে পারছেন না। এদিকে বাড়িতে ফিরলে তাদের প্রাণে মেরে ফেলা হবে বলে হুমকি দিচ্ছে মাদক ও হুন্ডি ব্যবসায়ী সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় গত ২৩ জানুয়ারি সোনারাগাঁ থানায় একটি মামলা হয়েছে। এই মামলায় এই পর্যন্ত মাত্র একজন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

সুবর্ণগ্রাম ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ২০০৭ সালে নুনেরটেকের মায়াদ্বীপে ‘মায়াদ্বীপ জেলেশিশু পাঠশালা’ স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন উল্লেখ করে তারা বলেন, ওই স্কুলে কৃষক, জেলে ও নিম্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা পড়াশোনা করে। এই স্কুলটি সম্পূর্ণ অবৈতনিক একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পরবর্তীতে ২০১০ সালের জুন থেকে স্থানীয় প্রভাবশালী ওসমান মেম্বার, মো. হাশেম, জাকারিয়াসহ আরও অনেকে অবৈধভাবে বালু কাটার ফলে চরের তিন ভাগের এক ভাগ নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। তখন থেকে গ্রামবাসীদের নিয়ে চর রক্ষায় ‘মায়াদ্বীপ রক্ষা আন্দোলন’ নামে একটি আন্দোলন গড়ে তোলে। ফলে কিছুদিনের জন্য বালু কাটা বন্ধ হয়। এতে বালু সন্ত্রাসীদের ক্ষোভের মুখে পড়ে নিরীহ গ্রামবাসীসহ স্কুলের প্রধান শিক্ষক পাখি। যার প্রেক্ষিতে ২০১২ সালে ২ বার মাঝ নদীতে স্কুল শিক্ষক মরিয়ম আক্তার পাখির ওপর হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। ২০১৩ সালে ২৫ জুলাই তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে নদীর মাঝখান থেকে অপহরণ করা হয়।

ভুক্তভোগীদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা বলেন, বর্তমানে হামলার ঘটনায় মামলা করায় প্রধান শিক্ষক মরিয়ম আক্তার পাখিকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে হামলাকারীরা। হামলাকারীদের হুমকির কারণে ভয়ে বাড়ি ফিরতে পারছেন না তারা।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সুবর্ণগ্রাম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা, সংস্কৃতিকর্মী ও কবি শাহেদ কায়েস।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও শিল্পী রফিউর রাব্বি, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ভবানী শঙ্কর রায়, মায়াদ্বীপ জেলেশিশু পাঠশালার প্রধান শিক্ষক মরিয়ম আক্তার পাখি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী সোনারগাঁ শাখার সভাপতি লেখক শংকর প্রকাশ, সাংবাদিক মাহফুজুর রহমান, সাংবাদিক আব্দুস সালাম, কবি ও সাংবাদিক নাফিজ আশরাফ, সাংবাদিক বিল্লাল হোসেন রবীন, সাংবাদিক ও লেখক আফসার বিপুল, সংস্কৃতি ও মানবাধিকার কর্মী ধীমান সাহা জুয়েল, সাংবাদিক ফখরুল ইসলাম চৌধুরী, সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী শিমুল, শুক্কুর আল মাহমুদ প্রমুখ।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.