শিক্ষা বোর্ডে রূপ নিচ্ছে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ

নিউজ ডেস্ক।

দেশের চিকিৎসা শিক্ষার সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে ‘রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ’কে রূপান্তর করে ‘বাংলাদেশ অ্যালাইড হেলথ শিক্ষা বোর্ড’ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে ‘অ্যালাইড হেলথ শিক্ষা বোর্ড আইন ২০২১’-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে।

এই আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ‘অ্যালাইড হেলথ শিক্ষা বোর্ড’ হলে বন্ধ হবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালিত ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা নার্সিং ও মেডিক্যাল টেকনোলজি কোর্স। দেশের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত সহযোগী কার্যক্রম এক ছাতার নিচে পরিচালিত হবে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল তৈরিতেও এই বোর্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

জানা গেছে, প্রস্তাবিত বাংলাদেশ অ্যালাইড হেলথ শিক্ষা বোর্ড বাস্তবায়নে গত অক্টোবরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সভা হয়। সভায় বোর্ডের আইনের কিছু ধারার সংশোধিত খসড়া প্রাপ্তি সাপেক্ষে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়।

সভায় জানানো হয়, সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের ‘লিভ টু আপিল’ নাম্বার ২১৪৩/১৬-এর পরিপ্রেক্ষিতে অ্যালাইড হেলথ শিক্ষা বোর্ড আইন ২০২১-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সোলতান আহমদের সভাপতিত্বে সভায় উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব (আইন-২), জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব, বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন বিশেষজ্ঞ, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের প্রতিনিধি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে ১৯৬২ সাল থেকে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ মেডিক্যাল টেকনোলজি কোর্স, মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট কোর্সসহ চিকিৎসা শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন কোর্স পরিচালনা করছে। ২০০৫ সালে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মেডিক্যাল টেকনোলজি কোর্স পরিচালনা শুরু করলে জটিলতা সৃষ্টি হয়।

জটিলতা নিরসনে ২০০৭ সালে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের মেডিক্যাল টেকনোলজি কোর্স স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘ওয়ান আমব্রেলা’ ধারণার আওতায় পরিচালনা এবং রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদকে শিক্ষা বোর্ডে রূপান্তরিত করার সুপারিশ করে। কিন্তু এ সুপারিশ উপেক্ষা করে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কোর্স পরিচালনা অব্যাহত রাখে। এরই মধ্যে ২০১২ সালে নার্সিং কোর্স পরিচালনা শুরু করলে জটিলতা আরও বেড়ে যায়।

এ পরিস্থিতিতে ২০১৩ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শূন্যপদে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে যারা পাস করেছেন, তারা এ ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন না বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। এতে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পাস করা শিক্ষার্থীরা হাইকোর্টে মামলা করলে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।

২০১৬ সালে নভেম্বরর মাসে মামলাটি সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ স্থানান্তর হয়। সর্বোচ্চ আদালত ২০০৭ সালে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশের আলোকে ‘ওয়ান আমব্রেলা’ ধারণা (কনসেপ্ট) বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। কিন্তু তিন বছরেও সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় লিভ টু আপিল দাখিলকারীদের পক্ষ থেকে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের আদেশে এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগ গড়িমসি শুরু করে। এতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়াধীন প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টরা এবং অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।

তারা সংক্ষুব্ধ হয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। এ অবস্থায় মেডিক্যাল টেকনোলজি এবং নার্সিং কোর্স পরিচালনাসংক্রান্ত জটিলতার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এলে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে জটিলতা নিরসনের নির্দেশ দেন।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইন মন্ত্রণালয়, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, নার্সিং কাউন্সিল, রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের ঊর্ধŸতন কর্মকর্তাদের নিয়ে ২০১৯ সালে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠিত হয়। কমিটি তাদের সুপারিশে সুপ্রিমকোর্টের মামলার নির্দেশনা অনুযায়ী মেডিক্যাল টেকনোলজি এবং নার্সিং কোর্সসহ চিকিৎসা শিক্ষাসংক্রান্ত সব কোর্স ‘ওয়ান আমব্রেলা’ ধারণার আওতায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালনা করার মতামত দেয়।

সেই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মেডিক্যাল টেকনোলজি ও নার্সিং কোর্স বন্ধ করাসহ কোর্স পরিচালনা আইন বাতিলের মতামতও দেয় কমিটি। এই মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে বন্ধ হয়েছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের মেডিক্যাল টেকনোলজি ও নার্সিং কোর্স। এমনকি বন্ধ হয়েছে কোর্স পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও এ সম্পর্কিত আইন।

পরিচায় প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের এক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে জানান, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক শিক্ষা বোর্ডের খসড়া আইনের অধ্যায় ৩ এবং ২৮ ধারাটি (পেনশন ও আনুতোষিক) আইনে সংযোজন করার বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিবের মতামত চাওয়া হয়েছে। সেখান থেকে মতামত পাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।

এ বিষয়ে কথা হয় সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিলকারী বেকার অ্যান্ড প্রাইভেট সার্ভিসেস মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, ‘সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদকে বোর্ডে রূপান্তরের সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই।

আমরা মনে করি বোর্ড গঠন করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। আদালত এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সব নির্দেশনা অবিলম্বে^ বাস্তবায়ন করতে হবে।’


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.