এইমাত্র পাওয়া

শিশুশ্রমিক আসিফ এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র

তানভীর তানিম।।

‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’— কথাটিকে আরও একবার প্রমাণ করলেন আসিফ আলী। অভাবের সংসারে কখনো হয়েছেন হোটেল বয়, কখনো দোকানের কর্মচারি, আবার কখনো-বা দিনমজুর। কিন্তু কোনোকিছুই তাকে দমাতে পারেনি।

ঢাবি, রাবি, জবিসহ আসিফ এবার সুযোগ পেয়েছেন দেশসেরা ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে। আসিফের মায়ের সঙ্গে বাবার সংসার ভেঙে যাওয়ার পর মা আবারও বিয়ে করেন। সত্ বাবা নেশা করতেন। একদিন মাকে মারধর করে বাসা থেকে চলে গেলেন। সেই থেকে লাপাত্তা তিনি; তখন আসিফ ক্লাস থ্রি’তে। দাদা ইটভাঙার কাজ করতেন।

পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালে তিনিও মারা গেলেন। মা তখন ধার-দেনা করে একটা ছাগল কিনলেন। দাদি মরিচ, ডাল তুলে দেওয়ার বিনিময়ে কেজিপ্রতি ৫-১০ টাকা পেতেন। এভাবে খুব ছোটবেলা থেকেই অভাব ছিল তার নিত্যসঙ্গী। ক্লাস সিক্সে ভর্তি হয়ে পেটের দায়ে হোটেলে কাজ করা শুরু করেন আসিফ। কাজ বলতে হোটেল বয়ের কাজ। দিনে ৫-১০ টাকা করে দিত। সাথে খাওয়া ফ্রি।

গ্রামের মেম্বার তিন হাজার টাকার বিনিময়ে একটা কার্ড করে দিয়েছিলেন। ৩০ কেজি চাল পাওয়া যেত প্রতি মাসে। খরচ পড়ত কেজি প্রতি ১০ টাকা। কিন্তু সবজির সমস্যা থেকেই গেল। এমনও দিন গেছে, শুধু নুন দিয়ে ভাত খেয়েছেন। সপ্তম শ্রেণিতে ওঠার পর গ্রামের এক চাচার সবজির দোকানে কাজ নেন আসিফ। সপ্তাহে দুই দিন হাটবার—রবি আর বুধ। এই দুই দিন বাজারে ভিড় থাকায় স্কুলে যাওয়া মানা। হাটবারে মালিক দুই বেলা খাওয়া, ১০০ টাকা আর বাড়ির জন্য সবজি দিতেন। প্রতিবছর ঝড়-বৃষ্টিতে ঘরের টিনের চালা উড়ে যেত। পানিতে তখন বই, কাপড়-চোপড় সবকিছু ভিজে একাকার হতো। এসবের মাঝেই এসএসসি পরীক্ষায় পেলেন জিপিএ ৪.৮৯।

রাজশাহী বোর্ডে ২৫১তম হয়ে মেধাবৃত্তি পেলেন। দোকানে কাজ করার সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসটাই ছিল আসিফের মূল অনুপ্রেরণা। ২০১৯ সালে ১০ জানুয়ারি। জয়পুরহাটে কলেজের এক বন্ধুর বাবার জানাজায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়। তার বাবা রিক্সা চালাতেন। ঘুড্ডি থেকে বৃত্তি পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। সেই ভাইয়া তাকে অনুপ্রেরণা দিয়ে বললেন, ‘তুমিও পারবে আসিফ’। ‘তার থেকে জানলাম, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য ঘুড্ডি ফাউন্ডেশন একটা পরীক্ষা নেবে। চান্স পেলে ঢাকায় চার মাস থাকা-খাওয়াসহ ভর্তি কোচিং ফ্রি’—বলছিলেন আসিফ।

রাজশাহীতে ঘুড্ডি ফাউন্ডেশনের পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে মনোনীত হয়ে চূড়ান্ত পরীক্ষা দিতে গেলেন ঢাকার মোহাম্মদপুরে। সব ধাপ অতিক্রম করে ফেরার পথে এসএমএস পেলেন, ‘ইউ আর ফাইনালি সিলেকটেড’ লেখা বার্তা। ভর্তি পরীক্ষার ফর্ম পূরণের টাকা দিয়েছিল ‘মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’। সর্বমোট পাঁচ হাজার টাকা। বিইউপি, ঢাবি, রাবি, গুচ্ছতে শুধু পরীক্ষা দেওয়া হলো। ফলাফলে ঢাকা, বিইউপি, রাজশাহী, জগন্নাথ, খুলনা, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধা তালিকায় উত্তীর্ণ হলেন। ভর্তি হলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর-এ; সাত হাজার টাকার পুরোটাই দিল ঘুড্ডি।

কিন্তু রাজধানীকেন্দ্রিক জীবনযাপনের ইচ্ছায় পরবর্তী সময়ে জগন্নাথে চলে আসেন। ভর্তি হন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে। এখানে ভর্তির টাকাও দিয়েছিল ‘মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’।

আসিফ বলেন, ‘বর্ণতে কোচিং করার সময় পরিচালকের সাথে ভালো সম্পর্ক হয়। ভালো ফলাফলের জন্য আমাকে পছন্দ করতেন তিনি। দুশ্চিন্তা করতে দেখলে সাহস দিতেন। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে আমি জব করছি। স্টুডেন্টদের এক্সাম নেওয়া, কাউন্সিলিং, খাতা নিরীক্ষণ করা আমার দায়িত্ব। পাশাপাশি এ বছর হাতখরচ চালাতে ‘রাজশাহী পিউর ফুড’ নামের একটা পেজ চালু করেছি। যেখান থেকে স্বল্পমূল্যে রাজশাহীর আম, গুড় সরবরাহ করি। তবে এটা খুব একটা চলে না।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.